লুৎফর রহমান
যশোর জেলের নিরাপত্তা বন্দীদের দোতলা ওয়ার্ডের নীচতলায় জানালার কাছে কি যেন ঘটেছে। দূর থেকে দালাল গোছের বিশেষ সুবিধাভোগী কয়েদীরা চীৎকার করছিল। ভরদুপুর। এইমাত্র ছোট যশোর জেলে চৌকার বারান্দায় ডিউটি জমাদার সফদর আলী জুতো-মোজা-জামা ছেড়ে দুই জবরদস্ত চেহারার কয়েদীকে দিয়ে হাত-পা টেপাচ্ছিল। সে আঁতকে উঠে দাঁড়ালো খালি গায়েই কাছে রাখা রুলটা হাতে নিয়ে। যারা পা টিপছিল তারা জমাদার সাহেবকে জামা পরিয়ে দিল।
একটা ছুটোছুটি হচ্ছিল চারদিকে। কিন্তু জমাদারকে বিস্মিত করে সেই দালাল কয়েদীরা কোত্থেকে দৌড়ে এসে সামনেই নিরাপত্তা বন্দীদের ওয়ার্ডের জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিল। তারপর জানালার নীচে বাইরে বসে পড়া এক ছোকরা কয়েদীকে টেনে তুলে তার নাকে মুখে থাপ্পর কষতে কষতে চীৎকার করে জিজ্ঞেস করলো, কি ছুঁড়ে দিয়েছিস তুই ভেতরে?
জবাবে সেই কয়েদী ছোকরা বললো, কিছুই দেইনি তো। এমনি দেখছিলাম, এরা কারা?
দালাল কয়েদীরা এবারে তাকে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে জমাদারের সামনে নিয়ে এল। বললো ঝুটবাত বলছে। আমরা দূর থেকে দেখেছি, কি যেন ছুঁড়ে দিল ভেতরে। ততক্ষণে কয়েকজন ওয়ার্ডার এসে পৌঁছেছে। দালাল ধরনের আরও কয়েকজন কয়েদী।
একজন বললো গতকাল এই ছোড়া চালান এসেছে রাজশাহী থেকে। খালাস পাবে।
জমাদার এবার প্রশ্ন করলো, তুই এখানে এসেছিলি কেন এক নম্বর ছেড়ে? নিশ্চয়ই কিছু ছুঁড়ে দিয়েছিস। শালা শুয়োরের বাচ্চা, হারামজাদা।
সেই ছোড়া তখনও বললো, কিছু দিইনি। দেখছিলাম এরা কারা!
জমাদার এই ধরনের কয়েদীর রগ জানে। সে দালালদের আর সেই কয়েকজন সিপাইকে বললো, ধোলাই।
তারপরেই দু’জন সিপাইকে নিয়ে নিরাপত্তা ওয়ার্ডের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
নীচতলায় তিনজন রাজবন্দী। সামনেই লুৎফর রহমানের মুখ ৷ জমাদার জিজ্ঞেস করলো, লুৎফর সাহেব চিঠিউঠি কিছু দিয়েছে?
লুৎফর রহমান বললেন, পাগল। সিপাই সাহেব তো আমাদের দরোজায় দাঁড়িয়েছিল ভেতরের দিকে। জিজ্ঞেস করুন ডিউটি সিপাইকে ৷
লুৎফর রহমানের রগও ভাল করে জানা জমাদারের। দু’বছর ধরে এই জেলে আছেন। দেশ ভাগ হবার পর পরই জেলে এসে রাজবন্দীর অধিকার চেয়ে ‘খানা ছেড়ে’ দেওয়ার জন্য ছ’মাসের সাজা হয়েছিল। জাঙ্গিয়া-কুর্তা পরতেন। এখন নিরাপত্তা বন্দী। সাদা পায়জামা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে। বছর তিরিশেক বয়স। রোগা লম্বা। কয়েকটা হাড়ের ওপরে একটা বড় মাথা নাকে ঠোঁটে বেপরোয়া বিদ্রোহীর ছাপ। দাড়ি কামানো। চুল ছোট। যশোর জেলা কৃষক সমিতির সম্পাদক ৪৬-৪৭ সালে তেভাগার সময় যশোর জেলায় বিশেষ করে নড়াইল মহকুমায় ছোট ছোট কৃষক অভ্যুত্থান হয়েছিল জোতদারদের বিরুদ্ধে ৷ দেশভাগের পরেও তার জের চলছিল। এছাড়া, সর্বোপরি লুৎফর রহমান কমিউনিস্ট। সুতরাং ঢাকায় পাকিস্তান সরকারের এজেন্টরা যাদের ধরার জন্য প্রথম লিস্ট করেছিল তাতে লুৎফর রহমান প্রথম পাঁচজনের মধ্যে ছিলেন।
সেই থেকে জেলে।
জমাদার জেল গেটে যাবার জন্যে উদ্যোগ করছে, এমন সময়ে হন্তদন্ত হয়ে স্বয়ং জেলার জনা বিশেক জেল সিপাইকে নিয়ে হাজির। ঘর তল্লাশী করা হলো। তন্নতন্ন করে। ঘরের বাইরে প্রায় শুকনো গভীর ফাটা ডালাগুলোকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখা হলো রুল দিয়ে।
জেলার সাহেব ও জমাদারের মধ্যে অতঃপর কথাবার্তা। রাজশাহী থেকে চালান আসা ছোকরা কয়েদীটাকে ধোলাই করে কিছু পাওয়া গেল? একজন জেল সিপাহী এসে বললো, ওকে আমরা পাঁচ-ছ’জন মিলে বুট দিয়ে মাড়িয়েছি। কিন্তু ও এই এক কথাই বলছে, কিছু দেয়নি। নিরাপত্তা বন্দীদের ওয়ার্ডের নীচতলায় ডিউটি সিপাহী বললো, লুৎফর রহমান সাহেবকে সে এই চেঁচামেচির মধ্যে একবার কলসী থেকে গেলাসে পানি ঢেলে খেতে দেখেছে।
রাজশাহী থেকে চালান আসা কয়েদীর নির্জন সেল-বন্দীর হুকুম হলো। লুৎফর রহমান সাহেবকে নিয়ে যাওয়া হলো জেল গেটে। জনা বিশেক জেল সিপাহীর আগে আগে লুৎফর রহমান জেলার সাহেবের পাশাপাশি হেঁটে চললেন। একটা পাঞ্জাবী চড়িয়ে নিয়েছেন আপাতত ৷ বলা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments