বংশীধারী

৬৮-৬৯এ সারা পূর্ব বাংলা জুড়ে পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহী অভ্যুত্থান হয়েছিল তা যেই মুহূর্তে জয়ী হলো প্রায় সেই মুহূর্তেই পড়ে গেলো। আইয়ুব খাঁ গেলো কিন্তু ইয়াহিয়া খাঁ এলো। আবার জারী হলো নতুন করে সামরিক শাসন। সভাসমিতি সমাবেশ মিছিল বিক্ষোভ বন্ধ করে ইসলামাবাদের হুকুমনামা জারী হলো। পূৰ্ব বাংলায় গণবিক্ষোভগুলো বরাবরই কালবৈশাখীর মতো এসে দপ্ করে থেমে গিয়েছে। ঝড় থেমে গেলে মনে হয় ঝড় কখনোবা ওঠেনি। আবার আচমকা গণবিক্ষোভ হবেই, কিন্তু যখন হবে তখন হবে। প্রকৃতি কিন্তু দেখতে না দেখতে একটা ঝড় তুললো আচমক৷৷ টর্নাডো ঘূর্ণিঝড় একটা আগুনের হল্কার মতো ছিটকে বেরিয়ে ঢাকার গা ঘেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খানিকটা ছুঁয়ে চলে গেলো। শ’দুয়েক গ্রাম ভেঙ্গে গুড়িয়ে তছনছ হয়ে গেলো।

ঢাকা শহরে তরুণ তরুণীরা ইট আর পাথরের টুকরো ছুড়ে মিলিটারিকে ঘায়েল করেছিল দু’মাস আগে। তারা আওয়াজ তুলেছিল ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো।’ তারাই টর্নাডোতে ছেঁড়া গাঁগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকের শিবির বানালো। গাঁয়ের মানুষ বললো, “ভলান্টিয়াররা আইয়া পড়ছে। রক্ষা।” এই ‘ভলান্টিয়ারদের’ একজন কমল বাড়রী ঢাকার জগন্নাথ কলেজে পড়তে এসেছে ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ থেকে। সেই সূত্রে ঢাকার সমস্ত রকম আন্দোলনে জড়িয়েছে। জগন্নাথ কলেজেরই একদল ছেলের সঙ্গে এসেছে ত্রিমোহিনী গ্রামের স্বেচ্ছাসেবক শিবিরে। শিবির হচ্ছে একটা ভেঙ্গে পড়া চালাঘরের চালাটাকে কোনরকম ওপরে তুলে তার তলায় থাকার জায়গা।

কমল বাড়রী লম্বা, ঢ্যাঙা। বড় বড় চ্যাটালো পা। নদীতে শৈশব কৈশোর কেটেছে। দিনের বেশীর ভাগ সময় নদীতে ডুব দিয়ে থাকতো ৷ কালো গায়ের রং এইজন্যে কিছুটা সাদাটে। হাসলে সমস্ত দাঁত বেরিয়ে পড়ে। দাঁতগুলো সুগঠিত। লালচে মাড়ি। ছোট নাক। ছোট ছোট চোখ। ভুরু দু’টো আকর্ণ বিস্তৃত। চুল ঝাঁকড়া। তার সাথীরা বলে, ‘ডাকাইতের বংশ।’ কমল অবশ্য হেসে বলতো, “আমি আইছি গোপালগঞ্জের মাটি ফুইড়া, আমার বাপদাদা চোদ্দপুরুষ আসছে মাটি ফুইড়া। আমরা জাত চাষা।”

তাদের বংশে সে প্রথম কলেজে এসেছে। শুধু তাই নয়। তার বাবামা-ই তাকে পাঠিয়েছে ঢাকায় পড়তে, ফরিদপুর জেলায় এত কলেজ থাকতে ৷ তারা আবিষ্কার করেছে কমলের মাথা আছে। গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টারও তাই বলেছেন। মায়ের আছে আরেকটা সাধ। কমল বাঁশী বাজায়। রেডিওতে তার বাঁশী বাজতে পারে ঢাকায় থাকলে। কমলের বাঁশীর ঝোলাটিকে সঙ্গে দিতে তিনি ভোলেন নি।

ত্রিমোহিনী গ্রামের রিলিফ সেন্টারের চালার তলায় সাথীরা আবিষ্কার করলো, তার সবচেয়ে বড় গুণ, তার বাঁশীর আঙ্গুল আছে। তারা আবিষ্কার করলো, তার থলিতে লুঙ্গি আর গামছার সঙ্গে রয়েছে গোটা দশেক বাঁশী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর নজরুল ইসলামের গানের দু’টো স্বরলিপির বই। একদিন কমল বাঁশী বাজিয়ে শোনাল। বাঁশীর ফুটোগুলোতে ওর লম্বা লম্বা আঙ্গুলের খেলা সত্যিই দেখবার মতো। একটা ছোটখাট ভিড়ও জমে গেলো গ্রামের গুড়োগাড়াদের। সুরের চেয়েও কমলের আঙ্গুলের ওঠানামার ওরা তারিফ করলো। ওরা বোধহয় এই প্রথম লক্ষ্য করলো দশটা আঙ্গুলের মধ্যে আলগোছে ধরা থাকে বাঁশীটা। ক্ষুদে মেয়ে তর্জনী বাড়িয়ে গুণছিল, “এক দুই তিন...।” কমল বললো, “দশটাই লাগে। হারমোনি বাজাইতে লাগে পাঁচটা। বাঁশীতে লাগে দশটাই ৷”

দেখা গেল ত্রিমোহিনী গ্রামে কমল বাড়রী বাঁশীতে দশ আঙ্গুলের খেলা দেখিয়ে ভিড় জমিয়ে ফেলছে। এই ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা। ডাকাতের মতো ঝাকড়া চুল। কিশোর কিশোরীদের ভারী পছন্দ। ওরা নাম দিয়েছে, বংশীধারী। এক গ্রামীণ কিশোরী সঙ্গীসাথীদের বললো, “আঙ্গুলগুলান কী সোন্দর দেখ।” বাঁশী বাজাবার পর কোলের ওপর সেটাকে দু’হাতের আঙ্গুলে আলগোছে ধরে সে যখন আকর্ণ বিস্তৃত হাসি হাসতো, তখন কাচ্চাবাচ্চারা কাছে এসে ওর আঙ্গুলগুলোকে নাড়াচাড়া করে। এই আঙ্গুলগুলোকে যে প্রথম সোন্দর বলেছে সে কিশোরী গিয়ে অবশ্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। কমল তাকে কাছে ডেকে বললো, “আমার আঙ্গুলগুলান কামলার আঙ্গুল।

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice