সাহিত্যের বৈপ্লবিক গতিধারা
সাহিত্যের সংজ্ঞা
শিল্পী বললেই আমরা এক বিশেষ ধরনের লোককে বুঝি। কেউ পটুয়া, কেউ নট, কেউ গায়েন, কেউ বায়েন, কেউবা কবি। এরা এক বিশেষ ধরনের কাজ করে, যাকে আমরা বলি শিল্পকলা। এই শিল্পকলায় প্রকারভেদ আছে। কিন্তু সবাই এক ব্যাপারে পারদর্শী, তাই এক জাতের। এরা আমাদের মনে রঙ ধরিয়ে দেয়। আমাদের বাসনা, ভয়, ঘৃণা, আশা প্রমুখ আবেগকে সক্রিয় করে; আমাদের মানবীয় প্রবৃত্তিকে স্পর্শ করে, বইয়ে দেয় এক নতুন ধারায়। আমাদের সরু মোটা অনুভূতি নিয়ে এদের কারবার। পাথরে হোক, রঙে রেখায় অক্ষরে হোক, তারে বা টানা চামড়ায় অথবা কুমড়োর খোলে হোক, শিল্পীরা অভিন্ন এদিক দিয়ে যে এরা সবাই আমাদের প্রবৃত্তি, আবেগ ও অনুভূতিকে দোলা দেয়, ঘুম পাড়ায়, নাচায়, মাতায়, সক্রিয় করে। যে কোন ধরনের শিল্পকলার উৎকর্ষ নির্ভর করে প্রথমত এরা আমাদের আবেগ ও অনুভূতিকে কতোখানি স্পর্শ করতে পারলো তার উপর। আমরা স্পর্শমাত্র কতোখানি সামিল হতে পারলাম, তার উপর নির্ভর করে শিল্পকলার শিল্পীর সার্থকতা।
সাহিত্য এমনি একটি শিল্পকলা।
শিল্পী তাজমহল গড়ে, হয় সে স্থপতি। শিল্পী রেখা-রঙে কালিঘাটের পট আঁকে; নাম নেয় সে চিত্রশিল্পী। শিল্পী ভঙ্গী ও অঙ্গ সঞ্চালন ও আঙ্গুলের মুদ্রার মাধ্যমে জারী কথক নাচ নাচে, হয় সে নর্তক-নর্তকী। কণ্ঠে হোক যন্ত্রে হোক তাল-মান-লয়ে ধ্বনিতরঙ্গ তুলে সুর ও সঙ্গীত প্রবাহ বইয়ে দেয় ধ্রুপদ বা ভাটিয়ালীতে; শিল্পী হয় সুরকার। অঙ্গভঙ্গীকে ও চলাচলকে সংহত করে আবৃত্তির মাধ্যমে চরিত্র ও ঘটনাকে যাত্রায় এবং নাটকাভিনয়ে অবিকল হাজির করে শিল্পী; তাকে বলি অভিনেতা। আর শব্দ এবং পদবিন্যাসের মাধ্যমে রক্ত মাংসের মানুষকে তাদের পারস্পারিক সম্পর্কে ব্যক্ত ক’রে শিল্পী হয় কথাশিল্পী। সাহিত্য হচ্ছে শব্দ এবং পদ বিন্যাসের শিল্পকলা।
সাহিত্যের সাধনযন্ত্র কথা। থরে থরে স্তবকে স্তবকে সাজানো কথার পর কথা। কালিদাসের মেঘদূতে যেমন, নজরুল ইসলামের বিদ্রোহীতেও তেমনি। সেকসপীয়ারের নাটকে যেমন, গোর্কীর উপন্যাসেও তেমনি। মায়াকভস্কীর কবিতায়, পূর্ববঙ্গ গীতিকাব্যে কথাই শিল্পীর অবলম্বন। সুললিত, ঋজু, ঝিরিঝিরি বয়ে যাওয়া, মন্দ্রিত এবং ঘুম-ঘুম ও ব্যঞ্জনাময় কথার কথা সাজিয়ে কথাশিল্পী পঙক্তি থেকে শুরু করে মহাকাব্য লিখে বসে।
যার কথার উপর দখল নেই তার কথাশিল্পী হবার যোগ্যতা নেই।
অবশ্য কথাশিল্পী অন্যান্য শিল্পকলার সমঝদার হতে পারে, নিজের রচনার মধ্যে তার এই দখলকে সঞ্চারিত করতে পারে, এটাতো অহরহ চোখে পড়ে। সাহিত্য অন্যান্য শিল্পকলাকে আপনার অঙ্গীভূত করে নেয়। রোমাঁ রলাঁর উপন্যাস ‘জাঁ ক্রিস্তফে’ পাই সুরের আস্বাদ। ইস্কাইলাস ইউরিসাইডিসের নাটক হয়েছে ক্লাসিক বা ধ্রুপদী সাহিত্য। শকুন্তলা নাটকে দুষ্মন্তের সামনে যেন সত্যিকার শকুন্তলার আলেখ্য, এমন বর্ণনা। শব্দের পর শব্দ, ব্যঞ্জনবর্ণ এবং স্বরবর্ণের সঙ্গতি, অনর্গল নির্গত আলাপ, সমগ্র নিসর্গকেও মূর্তিমন্ত করে তোলে। আবার কারুর লেখায় চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে নগরীর মালা। মনে হয়, কথাশিল্পীর হাতে কম্পাস আর স্কেল রয়েছে। মার্কিন লেখক সিনক্লেয়ার লুইসের বই, ‘মেইন ষ্ট্রীটের’ কাঠামোতে স্থপতির হাত রয়েছে। ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব কারণে সাহিত্যের সংজ্ঞায় কথা ছাড়াও অন্যান্য শিল্প পদ্ধতির আমেজ এসে লাগে। শিল্পীর বিশেষ কৃতিত্ব কোন্ পদ্ধতিকে অবলম্বন করে, সেটা বলতে গিয়ে দ্বিধা জাগে। কিন্তু সঠিক জবাব বার করাও খুব কঠিন নয়। যে সাহিত্যে অন্যান্য শিল্পকলা শব্দ বিন্যাসকে ছাড়িয়ে যায়, তার উৎকর্ষ প্রকট হতে পারে অন্যান্য শিল্পকলা সম্পর্কে জ্ঞাতব্য বিষয়ের বিস্তারে; কিন্তু সেই কারণে সাহিত্যমর্যাদা যে বাড়বেই এ-কথা বলা যায় না। কথার প্রতিপত্তি অনস্বীকার্য। সাহিত্যকার প্রধানত শব্দশিল্পী। আর শব্দশিল্পী শিল্পী হিসেবে আমাদের মানবীয় প্রবৃত্তি, আবেগ, এবং অনুভূতির কারবারী, আমাদের মানবিকতা কথাকে আশ্রয় করে মেঘ দর্শনে ময়ূরের মতো আত্মপ্রকাশ করে তাকেই বলবো সাহিত্য।
সাহিত্য কি, এই প্রশ্নের জবাব উপরোক্ত সংজ্ঞায় সহজ ও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments