লোহা লাল হবার সময়
৬৮ সালের একেবারে শেষের দিকে সারা পাকিস্তানে গণতন্ত্রের দাবিতে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে যে মিটিং মিছিলের আন্দোলন শুরু হলো তা চরমে উঠলো ৬৯-এর জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারীতে গণ অভ্যুত্থানে। শহীদের রক্তের রেখায় বাংলাদেশের মানচিত্র আলাদা করে আঁকা হয়ে গেলো।
২০শে জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলের ওপর গুলী চললে আসাদ শহীদ হলো ৷
এই হত্যার বিরুদ্ধে ২৪শে জানুয়ারী হরতাল, মিছিল, জমায়েত করার জন্য সারা বাংলাদেশে সংযুক্ত ছাত্র সংগ্রাম কমিটি জনসাধারণকে আহ্বান করলো। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বশংবদ গভর্ণর মোনায়েম খাঁ ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রে কেন্দ্রে হরতালের বিরুদ্ধে হেঁটে হেঁটে বললেও ২৪শে জানুয়ারী সমস্ত দোকান পাট বন্ধ হলো। গাড়ীর চাকা ঘুরলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তরু আহমেদ কালো পতাকা সামনে নিয়ে রাস্তার পুলিশ বেষ্টনী ভেদ করলো। সেই যে বেষ্টনী ভাঙলো, তারপরেই লাখ লাখ লোকের ঢল নেমে এলো পল্টন ময়দানের দিকে। এই ঢলকে ঠেকাবার জন্যে সামরিক কর্তৃপক্ষ গুলী চালালো। কিশোর মতিউর রহমান শহীদ হলো ৷
গুলী চলেছে শুনে ঢাকা শহরের পনেরো লাখ বাসিন্দার মধ্যে প্রায় সাত-আট লাখ সকল বয়সের লোকে পল্টন ময়দান ভরে গেলো। আওয়াজ উঠলো, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না।’ মতিউরের লাশকে সামনে রেখে জানাজা পড়ে শুরু হলো লাখ লাখ লোকের মিছিল। আবার এক জায়গায় গুলী চললো। শহীদ হলো বালক রুস্তম। তাকেও কাঁধে তুলে নিল বিদ্রোহী বিশাল জনতা। উড়ে গেলো সামরিক কর্তৃপক্ষের সমস্ত বেষ্টনী। চললো আজিমপুরায় কালো নিশান দুলাতে দুলাতে—মিছিলে শোক আর ক্রোধের নিশানা হিসেবে।
সন্ধ্যের সময় যখন পল্টন ময়দান আর রমনার রাস্তাগুলো থেকে জনতা চলে গেলো, তখন কারফিউ জারী হলো। কারফিউ পুরনো শহরেও জারী হলো, কিন্তু সামরিক গাড়ীগুলো ঢুকলো না। নবাবপুরের চওড়া সড়ক থেকে জালের মতো যে রাস্তা অলিগলি বেরিয়েছে সেখানে বাড়ীঘর দোকান-পাট গমগম করতে থাকলো। হিসেবনিকেশ চলতে লাগলো বড় বড় বাড়ীগুলোর রকে। রিক্সাওয়ালারা আরোহী তুলে নিতে লাগলো ডেকে ডেকে।
একটা খবরের কাগজের অফিসে কর্মীরা সবাই সারারাতের বরাত নিয়ে পৌঁছেছে। কাগজটাকে জানপ্রাণ দিয়ে খেটে হরতালের সমগ্র খবর দিয়ে ভরে দিতে হবে। খুব ভোরে কাগজ ছাপা হয়ে গেলে কারফিউ-এর মধ্যেই হকাররা এসে নিয়ে যাবে হাজার হাজার কাগজ। কত রক্ত খরচ হলো, এই কাগজ থেকেই সকাল আটটার মধ্যে সারা শহর জেনে যাবে।
সামনের ঘরে টেলিফোন ধরে বসে আছেন বার্তা সম্পাদক। একটা রিক্সা এসে থামলো এই খবরের অফিসের সামনে। রিক্সা থেকে নামলো রেবেকা আর নিহাল। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।
অফিসের সামনের ঘরে ওরা ঢুকতেই বার্তা সম্পাদক বললেন, রেবেকা তুমি তাহলে আজ রাতে বাসায় ফিরছো না। নিহাল বললো, কেন ফিরবে না? আমি পৌঁছে দেব। আমি না হলে যে কোন রিক্সাওয়ালাও পৌঁছে দেবে।
রেবেকা বার্তা সম্পাদককে বললো, সত্যি বড় ভাই। আজ সমস্ত মানুষের মেজাজ পাল্টে গিয়েছে। এই ঢাকা শহরটাকে গত ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে যতখানি দেখলাম, তাতে মনে হলো, সমস্ত নোংরা কথাকে যেন কোন বিরাট ঝাড়ুদার ঝেটিয়ে সাফ করে দিয়েছে। মেয়েরা যতক্ষণ খুশী, যেখানে খুশী একা একা চলতে পারে। যেসব রিক্সাওয়ালা মেয়ে আরোহী নিয়েও খিস্তি খেউড় করতে করতে প্যাডেল মারে তারাও আজ ফেরেশতা হয়ে গিয়েছে। তবু নিহাল যাবে আমার সঙ্গে আমাদের বাড়ীর দরজা পর্যন্ত।
বার্তা সম্পাদক বললেন, সেটা হবার উপায় নেই। তোমার মা টেলিফোন করে বলেছেন, তুমি আমাদের অফিসে এলে আজ রাতে এখানেই থাকবার একটা ব্যবস্থা করে দিতে। সুতরাং একবার যখন এসে পড়েছ তখন তোমাকে ছাড়তে পারিনা। ওপরতলায় চলে যাও। সম্পাদকের ঘরের টেবিলে রাত্রে শোবে। দুটো কম্বল আর বালিশ বরং নিহাল এনে দিয়ে যাক ওর বাসা থেকে। ভাত আর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments