সাত বোন পারুল [দ্বিতীয় দফা]
[ ১৩৪৯ সালের পৌষ মাসে আমার সাত বোন পারুল শীর্ষক গল্পটিমোহাম্মদীতে প্রকাশ পেয়েছিল। আমাকে তখন আলাপে ও চিঠিতে বহুবার প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল এই মর্মে যে, এটা বাস্তব থেকে নেয়া কি না। তাহলেই হয়েছিল। আদালত পর্যন্ত ব্যাপারটা দৌড়ত না বটে, কিন্তু রুনু ঝুনু মুনু টুনু ভুলু লুলু বুলু—এই সাত বোনের গাট্টা খেয়ে মাথাটা আর আস্ত থাকত না। তবে একথাও ঠিক যে, এদের আমি ছাড়া ছাড়াভাবে এখানে-সেখানে দেখেছি, এবং এদের চপলতা ও স্বচ্ছ প্রাণময়তায় বারেবারে মুগ্ধ হয়েছি।]
দোরটা ভেজানো, সেটা ঠেলে মোনায়েম সন্তর্পণে ঘরে ঢুকলে। বাইরের ঘরটা নির্জন, কেউ কোথাও নেই। কিন্তু সে দু’পা এগিয়েছে কী অমনি অনেকগুলো সরুগলার বিকট রকমের একটা হুল্লোড় তার কানে এসে লাগল। কোনো সাড়া না দিয়ে সেই আওয়াজ লক্ষ্য করে মোনায়েম ভেতরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এসে যা দেখলে, তাতে সে চমকালে না বটে, তবু মনে-মনে বললে, বাপরে, এ কী দৃশ্য!
উঠোনটা সিমেন্ট করা। সে-উঠোনে কিছু-ভাঙা কালো রকমের দুটো চৌকি বিরাজ করছে এবং সে-দুটোকে ঘিরেই রুনুঝুনুদের পাঁচ বোন কোমরে আঁচল কষে মহাকলরবে একটা কৃচ্ছ্রসাধন-কর্মে ব্যস্ত। চৌকির পাশে বড় ধরনের একটা ডেকচি, তাতে গরম পানি ধুঁয়ো ছাড়ছে, এবং সে-পানি মগে করে তুলে তুলে চৌকিদুটোর ফাঁকে-ফাঁকে ফেলে দেয়া হচ্ছে। ওপরে কড়া রোদ, তার ওপর কেমন ভাপসা গরম, ওদের দেহ হতে ঘাম ঝরছে দরদর করে। নিশ্চয়ই ছারপোকার বিরুদ্ধে এ অভিযান।
মোনায়েম যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তখন ওদের মধ্যে একটা ছোটখাটো গেরিলাযুদ্ধ চলছে। মগ একটি কিন্তু তারা পাঁচজন, তাছাড়া তাদের মধ্যে কে যে সবচেয়ে সবজান্তা—সেটা চির অনিশ্চিত ব্যাপার। কাজেই—
কে যেন হঠাৎ মুখ তুলে চাইলে বারান্দার পানে, বোধহয় মুনুটা। তাকিয়েই হঠাৎ সে থম্ মেরে গেল, চোখদুটো গোল। ব্যাপার কী, মুনুটা দিনদুপুরে ভূতপেতনী দেখল না-তো? সবারই হাত থেমে গেল, চোখগুলো ছিটকে পড়ল বারান্দার দিকে—মোনায়েমের পানে।
মোনায়েম একটু হাসবার চেষ্টা করলে, হয়তো হাসল, তবে তার চোখে শুধু পলক পড়তে থাকল। কিন্তু কী আশ্চর্য, ওদের কারো মুখ থেকে ‘টু’ আওয়াজটি বেরুল না। শুধু করলে কী, আঁচল দিয়ে মুখ ও ভেজা হাত মুছে আস্তে-আস্তে সব বারান্দায় উঠে মোনায়েমকে ঘিরে দাঁড়াল, চোখগুলো তেমনি গোল। আর মোনায়েম। অভ্যর্থনার ঢং দেখে তার বুক ধড়ফড়িয়ে বাঁচে না এবং শঙ্কিত চোখদুটো শুধু এর-ওর পানে পাক খেয়ে মরছে। সব চুপচাপ, জিরো আওয়ারের মতো অমঙ্গলসূচক ভারি নিঃশব্দতা; মোনায়েম দম ফেঁপে মরে আর কী!
অবশেষে, অবশেষে টুনুর ঠোঁটটা একটু নড়ল। নড়লই শুধু, কথা বেরুল না। বেরুল হঠাৎ ঝুনুর মুখ দিয়ে তীরের মতো : রুনু বুলুরা—! শিগগির, শিগগির, এই নিচে—বারান্দায়!
মোনায়েম গলায় একবার হাত বুলালে, ঘাড়ে বার-দুই, তারপর ক্ষীণ গলায় বললে : আমি বসব!
সে দোরগোড়ায় পৌঁছতেই ঝুনু হেঁকে উঠল: একটা কথা মনুভাই। বাসায় গিয়ে যদি দেখেন যে আপনার ভেতরের পকেট খালি, তবে ভাববেন যে কাল আড়াইটের সময় আপনাকে আসতে হবে আমাদের সার্কাসে নিয়ে যাবার জন্যে, কেমন?
এ অদ্ভুত ভোজবাজি যে! তার কোটের পকেটটা বিলকুল খালি, সেখানে মনিব্যাগটা নেই। মোনায়েম এবার রেগে গরগর করে উঠল...
তক্ষুনি হাতল-ভাঙা একটা লকলকে চেয়ার এল, মোনায়েমও বসল। বসে হঠাৎ বেদনাদায়ক একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লে, ছেড়ে চোখদুটো ব্যথাতুর করে তুললে। মনে মনে ভাবলে, রকম-সকম তো সুবিধের ঠেকছে না। তার এই সাত মাস পরে এদের কাছে আগমন, তা নিয়ে (অভিজ্ঞতায় বলে) এরা নিশ্চয়ই একটা এলাহি কাণ্ড বাধিয়ে তুলবে। কাজেই একটা দুঃখময় সাংসারিক কথা তুলতে পারলে যদি রেহাই পাওয়া যায়। তাই আরেকটি গভীরতম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বেদনার্তকণ্ঠে কয়ে উঠল : উঃ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments