স্বগত
কত গভীর রাতে আফজল রাতের নিঃশব্দতায় কান পেতে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। এবং কখনো- কখনো মনে হয়েছে রাতের উত্তুঙ্গ শিখরে দাঁড়িয়ে তারাময় দেয়ালে হেলান দিয়ে সে চেয়ে রয়েছে নিশ্ছিদ্র অতল অন্ধকারের পানে, তারপর মনটা শূন্য হয়ে উঠে ঐ অন্ধকারের, যে-অনুবন্ধী অন্ধকার চিহ্নশূন্য অথচ অবান্তর নয়, সে অন্ধকারের ক্ষুদ্রতম কণাতম অংশই যথেষ্ট তার সীমাহীনতার প্রমাণ দিতে সে অন্ধকারের মতোই হয়ে উঠেছে।
অথচ তারাময় দেয়ালে হেলান দিয়ে অন্ধকারের পানে সে চেয়ে দেখছে। পেছনে তাহলে বিন্দু-বিন্দু যে-আলোর কণা ছড়িয়ে ছিল, তা কি মহাআলোর বিনয়? থেকে-থেকে কাঁটার মতো বিদ্রোহী মনোভাব খুঁচিয়ে উঠেছে। কী একটা সংগ্রাম। সংগ্রাম!
এবং অনেক রাত ঠেকেছে বিভীষিকাময়।
অথচ সে-বিভীষিকায় নেশা।
শারদীয় রোদ নীল আকাশের তলে ঝকঝক করছে। আফজল চেয়ে দেখল নবাগতার পানে। গতকাল সায়ন্তন নিষ্প্রভ আলোতে তাকে কেমন নিষ্প্রভ মনে হয়েছিল, অথচ আজ সকালের নির্মল উজ্জ্বল সূর্যালোকে তার দেহের ও মুখের রক্ত কী উজ্জ্বল কী প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে।
নবাগতা হাসল আর বলল—আমাকে তোমার মনে আছে?
—কিছু-কিছু। সেই কবে দেখেছি—
—হ্যাঁ, তখন তুমি বেশ ছোট ছিলে। একটু থেমে নবাগতা আবার হাসল, হেসে বলল—ছেলেবেলায় তুমি দেখতে কিন্তু ভারি মিষ্টি ছিলে—
তারপর আফজলের শৈশবকাল নিয়ে অনেক আলাপ হল। বলতে-বলতে নবাগতা একবার জানলা দিয়ে উজ্জ্বল সবুজগাছের পানে তাকাল, তাকিয়ে হঠাৎ কেমন স্তব্ধ হয়ে উঠল।
আফজল একবার আড়চোখে ওর পানে তাকাল। ওর মুখের পার্শ্বচিত্র শুধু দেখা যাচ্ছে। তাতে কেমন যেন কাঠিন্য। কিন্তু সে-কাঠিন্যের কথা ভুলে যেতে হয় তার চোখের পানে চেয়ে। অতীতের কোন স্পষ্ট দৃশ্যে তার মন হারিয়ে গেছে, তাই মনে হচ্ছে যেন তীক্ষ্ণ এবং সুচাগ্র-নিবদ্ধ হয়ে ওঠা চোখের তারা ভাসছে শুভ্র শূন্যতায়।
জীবন হল মঞ্চ: শুধু পরের কাছে নয়, নিজের অন্তরে যে-দর্শক আছে তার জন্যে। তার জন্যে যেন অভিনয় না হলে নয়।
তারপর সে চোখ হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। নবাগতা ফিরে তাকাল আফজলের পানে, তাকিয়ে আস্তে হেসে বলল: ছেলেবেলায় মনে হত বছরগুলো কত দীর্ঘ, অথচ এখন মনে হয় তার ঠিক উল্টো, শুধু ছেলেবেলায় মানুষের কাছে জীবনটা অতি বড় ঠেকে, তারপর থেকে সে-ধারণা ভাঙতে থাকে, তাও ক্রমশ। কারো কারো বা হঠাৎ যেমন আমার। যেদিন আমার জীবনে বিয়ের বাজনা বেজে উঠল সেদিনই যেন স্বচ্ছ পরিষ্কার দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম কী সংকীর্ণ এই আমাদের জীবন। মানুষের যৌবনে প্রৌঢ়ত্বের ছায়া, প্রৌঢ়ত্বে বার্ধক্যের। আর বার্ধক্যে? মৃত্যুর। হয়তো।
কেমন-কেমনভাবে খাপছাড়া ধরনে ও কথাগুলো কইল। আফজল বললে না কিছু, শুধু চেয়ে দেখল নীল আকাশে চিল উড়ছে। আর মনে মনে ভাবল যে, লক্ষ-লক্ষ বছর আয়ু পেলেও এ-জীবনের পূর্ণ বিকাশ হয় কি না সন্দেহ। ভেবে তক্ষুনি আপন মনেই হাসল, ভাবল, সে কী কথা?
কারণ গত সন্ধ্যায় সে নবাগতার মুখের পানে চেয়ে অকারণে ভেবেছিল যে অধিকাংশ মুহূর্তেই শুধু পুনরাবৃত্তির একঘেয়ে কাহিনী।
হয়তো নবাগতার মুখ তখনো নিষ্প্রভ দেখাচ্ছিল বলেই তার মনে অমন কথা জেগেছিল। আর সে বললে: যতদিন পর্যন্ত না মানুষ তার জীবন সম্বন্ধে ভাবা বন্ধ করবে ততদিন মানুষের মুক্তি নেই। বলে ভাবলে যে, এটা সে কী বললে যার কোনো অর্থ নেই। জীবনের মুক্তি কী? এবং স্বজীবনের কথা ভাবা ছেড়ে দিলে কোন সে-মহৎ কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করবার বাসনা সে রাখে।
সে ভাববে না কিছু। তাই জানলা দিয়ে তাকাল নারকেল গাছগুলোর পানে, দেখলে সরু-সরু পাতায় সূর্যালোক রুপালি রেখার মতো ঝলসাচ্ছে, আর পেছনে স্বচ্ছ আকাশটা কত গভীর নীল।
নবাগতাও কিছু বললে না। হয়তো এই জন্যে যে, অর্থহীনতার স্তূপ এ মানব সমাজের অন্যতমা কণা সে, এবং আমরা একথা মানি যে, নিজের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments