কালচার
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি নাবল দেখে কামরুল হাসান পা-দুটো গুটিয়ে বসল, তারপর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে হঠাৎ বললে: বুঝেছ, কালচার জিনিসটার যেন একটা গন্ধ আছে যা নাকে এসে লাগে। আর সে গন্ধ রজনীগন্ধার বা হানাহানার গন্ধ নয়, অনেকটা যেন ভালো পাতিনেবুর গন্ধের মতো। আর রং? রংটাও বসরা গোলাপ, সূর্যমুখী-রক্তজবা ইত্যাদির মতো অমন চোখ-ধাঁধানো জলুস তীব্র গোছের নয়, অনেকটা যেন, চাঁদনিরাতের আকাশের বিচিত্র নীলিমার মতো।
বলে কামরুল চোখ বুজল, বুজে আরেকটা কড়া টান দিলে সিগ্রেটে। আসর আজকে জমল না; অসময়ে হঠাৎ বর্ষার জন্যেই এল না কেউ। তবু কামরুলের ভাগ্য ভালো যে, রাসেল (অর্থাৎ রসুল) এসেছে। রসুলের নাম রাসেল হয়েছে তার ঘোরতর চার্চ-প্রীতি থেকে। এবং এ-চার্চ-প্রীতি ধর্মের মাহাত্ম্য বা চার্চ-গৃহের সৌষ্ঠব কারুকার্য থেকে উদ্বুদ্ধ হয় নি, হয়েছে চার্চগামিনীদের আকর্ষণে। কালো হাঁদা ভোঁদা যত নেটিব খ্রিস্টান মেয়েরা রোববার দিন যখন দল বেঁধে যাবে চার্চে, রাসেলও চুল শট করে ধোয়া সুটটি পরে গদগদ ভক্তের মতো গিয়ে যোগ দেবে আসরে এবং এর ব্যতিক্রম হবে না কখনো। হাঁদা ভোঁদা মেয়েদের মধ্যে কোনটি যে তাকে ভেড়া করেছে তা জানা যায় নি আজ পর্যন্ত, এবং সেও এ প্রসঙ্গটা চাপা রাখে বরাবর। কারো কারো মতে সে বাছাই ছাঁটাই করছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত একাজে সক্ষম হতে পারে নি এই কারণে যে, ওর চোখে ওরা সবাই সুন্দরী, কেউ কারো চেয়ে কম নয়।
রাসেল কালচারের ব্যাখ্যা শুনলে, শুনে নীরবই থাকল। বড়-বড় কথা শুনবার তার ভয়ানক শখ কিন্তু আবার সেসব কথা শুনলে ভেতরটা একবার কেঁপে ওঠে। কাঁপলে ও তবু শোনে, শোনে প্রগাঢ় ধৈর্য নিয়ে। ধৈর্যের সে বিরাট পাহাড়।
এমন অদ্ভুত জিনিস এই কালচার যে, চুলমাত্র এধার-ওধার হলে সেটা হয়ে যাবে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু। ... ঝোপের আড়াল দিয়ে একজোড়া চোখ দেখা যাচ্ছে, আর সে-চোখ রাসেলের। রাসেলও হয়তো ধরা পড়ে গিয়ে বজ্রাহতের মতো স্তম্ভিত, তাই নড়তে পারল না একচুল।
কামরুল একটু পরে আবার মুখ খুলল, খুলে বললে: মনীষী পাস্কাল বলেছেন যে, ক্লিওপাট্রার নাকটা যদি একটু ছোট কি একটু বড় হত, তবে দুনিয়ার ইতিহাস লেখা হত অন্যভাবে। —ও রাসেল?
—বল। ক্ষীণকণ্ঠে রাসেল উত্তর দিলে।
—কালচার আর ক্লিওপাট্রার নাকের সাথে সাদৃশ্য দেখছ?
—না। একটু থেমে আরো ক্ষীণকণ্ঠে রাসেল উত্তর দিলে।
—এমন অদ্ভুত জিনিস এই কালচার যে, চুলমাত্র এধার-ওধার হলে সেটা হয়ে যাবে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু। বুঝলে?
—ভয়ঙ্কর ডেলিকেট তো, ইস্! রাসেলের চোখে বিস্ময় এবং কিছু একটা বলতে পেরেছে বলে ভেতরটা স্ফীত। আর শুনে কামরুল হাসল, হেসে আবার চোখ বুজল। তার কথা শেষ।
পরদিন রোববার। যথাসময়ে রাসেল চার্চে হাজির। ওটাকে চার্চ না বলে গুদামঘর বললেই ভালো। শুধু যোগচিহ্নের মতো একটা লোহা খ্রিস্টধর্মের ইঙ্গিত হিসেবে রয়েছে ওর শীর্ষে (তা-ও একটু বাঁকা হয়ে)।
গতকালের কালচার শব্দটা আজও রাসেলের মাথায় ঘুরছে, এবং থেকে-থেকে সে শিউরে উঠে ভাবছে, ইস্ কী ডেলিকেট। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। চিন্তার গতি আর এগোতে চায় না, ওটুক বলেই হঠাৎ যেন হারিয়ে যায় শূন্যে। এদিকে কত মেয়ে আসছে কেউ তাকাচ্ছে না তার পানে, এবং কেউ তাকাচ্ছে কি না-তাকাচ্ছে—তা লক্ষ্য করবার অবসর আজ তার নেই, সে কালচার নিয়ে আত্মস্থ। তবু শত কালচার ভেদ করে একটি কথা বারবার উঁকি মারছে মনের কোণে, আর সে-কথাটি হল এই, এতদিন ধরে তার যাতায়াত এই চার্চে, এবং এ-গতায়াতের ফলে কী লাভ করেছে সে? লাভ করেছে শুধু স্থূল দেহ পাদরিটির চুরোটের ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায় খয়েরিবর্ণ-হয়ে ওঠা দাঁতগুলোর বিগলিত বিকাশ। কিন্তু ঐ অতগুলো মেয়ে, আশ্চর্য অতগুলো মেয়ে? আশ্চর্য, ওদের দাঁত দেখলে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments