মানসিকতা
ক-দিন হল সামনের বাগান ও লনওয়ালা দোতলা বাড়ির মালিকরা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে। তাদের আগমনে খালি পড়ে থাকা মৃতপ্রায় সে বাড়িটা হঠাৎ প্রাণ পেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠল। শুধু প্রাণ তো নয়, দীপ্ত যৌবনেরও আবির্ভাব ঘটেছে বলা যেতে পারে। রাতারাতি আচমকা পরিবর্তন ঘটে গেল সে-বাড়িটায়। দরজা-জানলায় ঝুলতে লাগল রঙিন পর্দা, মোটা ও ভারি এবং আমেঝে পর্যন্ত ঝোলানো, আবার কোনোটা পাতলা ঝিরঝিরে। সিঁড়ি, রেলিং ও বারান্দার প্রান্তের ওপর-নিচ পূর্ণ হয়ে উঠল নানারঙা ফুল ও পাতাগাছের টবে-টবে। তাছাড়া কখনো পিয়ানোর ও রেডিয়োর আওয়াজে, কখনো উচ্চকলহাসিতে অহরহ মুখর হয়ে উঠল গোটা বাড়িটা।
মালিকদের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে সেলিমা উত্তরের গরাদ-দেয়া কিছু-ভাঙা জানলাটার পাশে কাজের ফাঁকে বারেবারে এসে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তার জন্যে এখন সে-বাড়িতে আকর্ষণের বস্তুর অভাব নেই, মাথায় ফেটি-বাঁধা বেয়ারা খানসামাদের সতর্ক সাবধানী ছুটোছুটি থেকে শুরু করে সুদৃশ্য সব মোটরের নিঃশব্দ আনাগোনা—সবকিছু আকৃষ্ট করে, কিন্তু চরম আকর্ষণ হল তিনটে মেয়ে। এখন কার্তিকের মাঝামাঝি, শীত পড়তে আরম্ভ করেছে। তাই যখন-তখন ওই মেয়েরা দোতলার খোলা বড় বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, দাঁড়িয়ে হয়তো রোদ উপভোগ করে, আর কথা কয় ও হাসে। যদিও তারা সেলিমার কাছে দুর্দমনীয় আকর্ষণ এবং যে-আকর্ষণের জন্যে তাকে দিনের মধ্যে ঘুরে-ফিরে বারেবারে এসে দাঁড়াতে হয় জানলাটার পাশে, তবু তারা আবার তার অন্তরে সৃষ্টি করে একটা অস্পষ্ট জ্বালা, যে-জ্বালা কখনো-কখনো এত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তার অসহ্য ঠেকে। মেয়েদের ফুলন্ত সজীবতা, গায়ের উজ্জ্বল রং, তাছাড়া চমকপ্রদ শাড়ি-ব্লাউজ পর্যন্ত তার মনে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু আজ সকালে সেলিমার মন অপেক্ষাকৃত শান্ত। জানলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সে, ওধারে সামনের বারান্দায় দুটি মেয়ে রেলিং ধরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে কেবলি কথা কইছে, অথচ তার মনে এতটুকু জ্বালার স্পর্শ নেই: আজ তার অন্তরভরে কী একটা অস্পষ্ট সুরের গুঞ্জন।
এ-গুঞ্জনের কারণ গতকালের একটি বিচিত্র ঘটনা।
কল্পনা-স্রোতে বাধা দিয়ে হঠাৎ সে অদ্ভুত কাজ করল। ধীরে-ধীরে আবছা অন্ধকারে আম্মার পা-দুটো খুঁজে নিল, তারপর তাতে মাথা রাখতেই তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে লাগল এবং রাতের মতোই নীরব থেকে সে কাঁদতে থাকল অঝোরে। ভালোই-তো। শান্তি ঝরছে, শান্তি!—
তখনো সন্ধ্যা হয় নি, এ-জানলায় এমনিভাবে সে দাঁড়িয়ে আর ওই মেয়েরা চমকপ্ৰদ শাড়ি পরে নিচে বাগানের কেয়ারি দেখে-দেখে মন্থর গতিতে পায়চারি করছে। তাদের পানে চেয়ে সেলিমা মগ্ন হয়ে ছিল, হঠাৎ এক সময়ে সাইকেল-বেলের শব্দে চমকে উঠল, ওধারে চেয়ে দেখলে যে সুন্দর চেহারার একটি ছেলে সাইকেলে করে এদিকে আসছে। এমনি কত লোক আসে-যায়, হেঁটে, সাইকেলে, মোটরে। সেলিমা চোখ সরিয়ে নিল তক্ষুনি। ছেলেটি যখন ঠিক জানলার সামনে তখন আবার অকারণে সে তাকাল তার পানে এবং এবার তাকিয়ে হঠাৎ বিস্মিত হল: ছেলেটি কেমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার পানে। তারই পানে। ওধারে সুন্দর বাড়ি, বাগান আর চমকপ্রদ শাড়িপরা মেয়েরা। এক পলক। বুকটা একটু কাঁপল, তারপর দৃষ্টি নত করল সেলিমা। আবার যখন সে চোখ তুলে তাকাল তখন ছেলেটি বাঁকের ওধারে অদৃশ্য হয়ে গেছে আর বাগানের মধ্যে মেয়েরা কথায়-কথায় উঁচু ও তীক্ষ্ণকণ্ঠে হেসে উঠেছে।
এই তো ঘটনা। তবু সেই যে বুকটা একটু কাঁপল, সে-কম্পন থেকে সেলিমার অন্তরময় জাগল কেমন একটা অস্পষ্ট সুর—যে-সুরে আজ সকালেও তার অন্তরটা গুঞ্জিত। ঘটনাটা সামান্য বটে, তবু বিচিত্রও কম নয়। মেয়েরা বাইরে থাকলে তো কথা-ই নেই, আর না-থাকলেও সে-বাড়ির সবকিছু এ-ধারের আস্ত শূন্য ইট বের হয়ে থাকা ঝুনো বাড়িগুলো থেকে ঢের আকর্ষণীয় বলে পথচারীদের পক্ষে সেদিকে না তাকানো দুষ্কর, আপনা থেকেই তাদের চোখ ঠিকরে পড়ে সেদিকে। কাজেই ছেলেটির ব্যবহারটা বিচিত্র বৈকি:
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments