ছায়া
—তোমার মুখে ও কিসের আভা?
থামের আড়ালে ছায়া: সে-ছায়ায় ময়লা ও জীর্ণ সবুজ আলখাল্লা গায়ে যে-বৃদ্ধ ফকির নিমীলিত চোখে নিশ্চল হয়ে বসেছিল সে এবার চোখ মেলে চাইলে, প্রথমে দেখলে দুটি জ্বালাময় তীব্র দৃষ্টি। তার সামনে উবু হয়ে যে ছেলেটি বসে তাকিয়েছিল তার পানে, তার কোমল মুখ রিক্ততায় প্রখর, ক্ষীণ দীর্ঘ দেহ দীনতায় চঞ্চল, আর জ্বালাময় তীক্ষ্ণ চোখদুটি পদ্মশূন্য ও ছোট। তার পরনের কাপড় ময়লা, কিছুটা ছেঁড়া, আর তার মাথার রুক্ষ লালচে চুলগুলো এলোমেলো, সেগুলো ছড়িয়ে রয়েছে কানের পাশে, ঘর্মাক্ত কপালের ওপর।
—তুমি কে?
ছেলেটির কাছ হতে সে-প্রশ্নের কোনো উত্তর এল না। তার পানে কতক্ষণ চেয়ে থেকে ফকির আবার প্রশ্ন করলে: কী চাও তুমি?
এবার ছেলেটির শুষ্ক নীরস ঠোঁট একটু নড়ল, একবার চোখের পাতা ফেলে সে কিছুটা রুদ্ধ ও কিছুটা কর্কশ গলায় বলে উঠল: আমি সত্য খুঁজতে বেরিয়েছি। একটু থেমে আবার বললে: তোমার সারা মুখে যে আভা দেখছি ও কিসের আভা ?
ফকির হাসল মধুরভাবে, স্নিগ্ধ নয়নে চেয়ে বললে: সেই সত্যের আভা।
—কী তোমার সত্য?
—খোদা।
—খোদা আমি মানি না। যা আমি দেখতে পাইনে, তা আমার কাছে মিথ্যে 1
ফকির আবার হাসলে, স্নেহ-কোমল দৃষ্টিতে ওর চোখের পানে চেয়ে বললে:
—যে-তারা তুমি দেখতে পাও না, সে-তারা তো তোমাকে আছে বলে মানতে হয়।
—কিন্তু তার জন্যে দ্বিতীয় বস্তুর সাহায্য লাগে।
—খোদাকে পেতে হলেও দ্বিতীয় বস্তুর প্রয়োজন। খোদা সত্য।
—যিনি সর্বসাধারণের নন, তিনি আমার কাছে মিথ্যে।
—ভুল বলছ তুমি; তিনি সকলের, সকল মানুষের।
সত্যের সন্ধানে ঘরছাড়া এক যুবকের বৈজ্ঞানিক যুক্তি বনাম বৃদ্ধ ফকিরের আধ্যাত্মিক দর্শনের সংঘাত এবং এক অবগুণ্ঠিতা নারী ও যুবকের বুকে আমূল বিঁধে থাকা ছোরার রহস্যময় ও ট্রাজিক পরিণতি...
ঠোঁটের প্রান্তে কেমন করে ছেলেটি হাসলে, বললে: মিথ্যে। তারপর ঠোঁটের যে প্রান্তে হাসি উঠেছিল জেগে, সেখানে হঠাৎ জাগল বিতৃষ্ণা ও কাঠিন্য, চোখের ধারটা কুঞ্চিত হয়ে উঠল; ফকিরের চোখের পানে সোজাসুজি চেয়ে তীব্র ও তিক্ত কণ্ঠে বলে উঠল: যেখানে তর্ক সেখানে সত্য নেই। সত্য তর্কের অতীত, ভাষার অতীত।
তারপর ছেলেটির চোখে কেমন ছায়া ঘনিয়ে এল, তার সঙ্কুচিত আঙ্গুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল, বিসদৃশভাবে কেঁপে উঠে ঋজু হয়ে বসে সে ব্যথিত চোখ মেলে এধার-ওধার চাইলে, চেয়ে হঠাৎ উঠে পড়ে ঝড়ের মতো সোজা বেরিয়ে গেল, কোনোদিকে আর তাকাল না, তার হাতে লাঠি, পিঠে পুঁটলি।
ঝম্ ঝম্ ঝম্। সোনার মতো সূর্যের আলোর তলায় কোমল সবুজ ঘাসের ওপর যে-তন্বঙ্গী মেয়েটি নাচছে, তার শাড়ির রং পলাশফুলের মতো রাঙা। রাঙা শাড়ির চওড়া পাড় আবার রুপালি, যে-পাড় মেয়েটির ক্ষীণ দীর্ঘ দেহ ঘিরে সাপের মতো জড়িয়ে রয়েছে, আর ঝলমল করছে সূর্যের আলোয়। ওপাশে যে-লোকটা বাঁশি বাজাচ্ছে তার উজ্জ্বল মুখে আনন্দের ছটা, বাঁশির সুরে উন্মাদনা। তার থেকে কিছু দূরে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে যে-মোটা লোকটা খাচ্ছে আর আপন মনে হাসছে, তার নাকে কেমন খুশির একটা অস্ফুট আওয়াজ হচ্ছে থেকে থেকে। এবার সে আড়চোখে তাকালে ঝোপটার পানে যেখানে সঙ্কুচিত দেহে উবু হয়ে বসে রয়েছে সেই ছেলেটি, তাকিয়ে অকারণে উঁচুগলায় হেসে উঠল। তারপর জিজ্ঞেস করলে: খাবে?
—না। মাথা নেড়ে ছেলেটি বললে; লোকটার হাসি দেখে সে বুঝি ভরসা পেল মনে, হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এল তার কাছে, মোটা ভ্রূর তলে তার পদ্মশূন্য চোখদুটো জ্বলছে।
—খাবে না বললে যে? ওদিকে ঝুঁকে একটা লালরঙের কাঠের বাক্স খুলতে খুলতে লোকটা বললে, তার চকচকে নাকের ডগায় সূর্যের আলো ঝিকমিক করছে।
—না, খাব না।
—কে তুমি? অত হ্যাংলা কেন, খাও না বুঝি কিছু?...
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments