স্বপ্নের অধ্যায়
প্রথমে ধরা পড়ে না কিন্তু সময় নিয়ে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে কিসের যেন অভাব এ পরিবারে : হয়তো প্রাণের, বাহ্যিক ঝংকারের। সবাই কথা কম কয়, সবারই যেন একটা আলাদা জগৎ আছে যার মধ্যে প্রত্যেকে মগ্ন এবং যার সম্বন্ধে তারা পরস্পর অজ্ঞ। আম্মা হয়তো নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসেই দেয়ালের পানে বা মেঝের পানে চেয়ে মুহূর্তের পর মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে থাকবেন, এবং একটু দূরে খাটের ওপর বসে বড়মেয়েটি আধা-চোখ বুজে মুরগির পালক দিয়ে কান খোঁচাতেই থাকবে, আম্মার পানে তাকালেও তার মনে কোনো প্রশ্ন জাগবে না। আব্বা হয়তো আপিস থেকে আসবেন, এসে চা-নাশতা খেয়ে বেলা গড়িয়ে এলে, সামনের মাঠটা গাঢ় সবুজ হয়ে উঠলে, বারান্দায় এসে আরামকুর্সিতে বসে গালের পাশে হাত রেখে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকবেন, হয়তো ঘাসের পানে অথবা কোথাও নয়। ছোট মেয়েটি কখন এসে একটা চক্কর দিয়ে যাবে, কিন্তু বাপের পানে তাকিয়ে বিস্মিত হবে না, মনে কৌতূহলও জাগবে না ।
বড় মেয়ে আনোয়ারাকে দেখে মনে হবে প্রাণেরই অভাব এ-বাড়িতে। সে দেখতে কেমন নির্জীব, দেহটা লম্বা আর ভারি। প্রথমে ছিল হাড়ের ভার কিন্তু ক্রমে ক্রমে সে কেবল মাংসল হয়ে উঠছে। নেশার মধ্যে দুটো নেশা : এক ঘুমানো। দ্বিতীয়ত, কান খোঁচানো ৷
আপনাকে ওরা সব অপছন্দ করে কেন? ... এর জন্য প্রস্তুত ছিল না মাজুভাই। একটা চকিত বিস্ময়ে তার দৃষ্টি ঠিকরে পড়ল মালেকার গম্ভীর মুখের ওপর। কয়েক মুহূর্ত তেমনি তাকিয়ে থেকে সে আস্তে চোখ সরিয়ে নিল কেবল, কোনো উত্তর দিল না। তার এ-নিরুত্তর নির্বাকতায় মালেকার হয়তো ভয় হল, কিন্তু লজ্জা হল না ।
প্রথমটির জন্য সময়-অসময় নেই, সুযোগ পেলেই তা ঘটতে পারে। স্কুলে যাবার আগে ও সে ঘুমোতে পারে, স্কুল থেকে এসেও ঘুমোতে পারে, আর রাতে পড়ে উঠে না-খেয়েই ঘুমোতে পারে। আর দ্বিতীয়টির জন্য তার মুরগির প্রতি লোভ, মুরগি জবাই হলে মাংসের থেকে তার পালকের প্রতি বেশি দৃষ্টি। সে পালক নিয়ে সাফ করে সরু করে কান খোঁচাবার মতো করে একটা ছোট পিজবোর্ডের বাক্সে জমা করবে। আর কান খোঁচাবার সময় কেউ যত প্রয়োজনীয় কথা বলুক না কেন, সে কেবল আবেশে চোখ বুজে মাথা কাত করে খোঁচাতেই থাকবে, উত্তর দেয়ার বা সে-কথায় কান দেয়ারও কোনো প্রয়োজন বোধ করবে না। তার যে আলাদা জগৎ সে-জগৎ হয়তো এমনি একটা পুলকে আর ঘুমে-তন্দ্ৰায় মেশানো অস্পষ্ট এক জগৎ।
কিন্তু কখনো-কখনো সে পরিষ্কার চেতনায় জেগে ওঠে, রান্নাবান্না দেখে, ছেঁড়া কাপড় খুঁজে নিয়ে সেলাই করে, রিঠা দিয়ে মাথা ঘষে, নারকেলের ছোবড়া দিয়ে দেহ পরিষ্কার করে। এ-সময়ে ভাইবোনদের প্রতিও নজর দেয়। কার কানের পিঠে ময়লা, কার খাওয়া কমে গিয়ে কোথায় উঠেছে তা লক্ষ্য করে, উপদেশ দেয়, যদিও সে উপদেশ কেমন কৃত্রিম শোনায় । তাছাড়া তখন হয়তো তার মনের কোথাও সামান্য সাড়া জাগে, একটু রং ধরে, জমাটবাঁধা নিথর মনে বসন্তের দমকা হাওয়ার মতো একটা ঝিরঝিরে চাঞ্চল্য আসে। কিন্তু সেটা সাময়িক।
তার ছোট কামালের মাথাটা অত্যন্ত বড়, মস্ত রুমি টুপিটাও সে মাথায় কেমন কষা হয়। আর মুখের রেখাগুলো কেমন ভোঁতা, থ্যাবড়ানো। সকালে দুলে-দুলে সুর করে কোরান তালাওয়াত হতে শুরু করে, পাঁচওক্ত নামাজ তার কোনো দিন বাদ যাবে না, স্কুলও কামাই হবে না। রোজকার নামাজে রুমি টুপিটা অবশ্য সে পরে না, শুধু দুই ঈদের নামাজের জন্য সেটা আলমিরায় তোলা থাকে। নিত্যকার নামাজ চলে গোলমতো একটা কাপড়ের টুপিতে, যা মাসে ছ'মাসেও একবার ধোয়া হয় না। তেলের দাগে ও হাতের ময়লায় তা কালো, তাছাড়া এক স্থানে তার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments