-
পয়লা মে-র ভোর।
জেলখানার গম্বুজের ঘড়িতে বাজল তিনটে। এই প্রথম আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। এখন আমি পূর্ণ সচেতন। খোলা জানলা দিয়ে বিশুদ্ধ-হাওয়া আসছে, মেঝেয় পাতা গদির চারদিকে খেলে বেড়াচ্ছে, হাঁ, অনুভব করতে পারছি খড়গুলো লাগছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, আমার দেহের-প্রতি জায়গায় যেন হাজার বেদনা জড়িয়ে আছে। হঠাৎ জানালা খুলে দিলে যেমন সব স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি স্পষ্ট বুঝলাম আমার অন্তিমকাল এসেছে। আমি মরছি।
অনেক দেরি করে এলে মরণ। একসময়ে আশা ছিল, বহু বহুদিন পরে তোমার সঙ্গে হবে আমার পরিচয়। স্বাধীন মানুষ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কত কাজ করতেও তো চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম ভালোবাসতে। ভেবেছিলাম ঘুরে বেড়াব পৃথিবীতে, আনন্দে গান গাইব। তখন
-
উর্দু থেকে অনুবাদ: কমলেশ সেন
আমি যদিও কৃষক নই, কিন্তু কৃষকদের মধ্যে থাকার সুযোগ আমার জীবনে অনেক ঘটেছে। আমার শৈশব এবং কৈশোর কৃষকদের মধ্যেই কেটেছে। কৃষকদের প্রতিদিনকার জীবনের সঙ্গে জড়িত যে-সব কাজ—যেমন হাল চালানো, নিড়াই করা ধান বোনা, ফসল তোলা, এসব তাদের কাছে থেকেই আমি জেনেছি। খেতে-খামারে যারা কাজ করে, তাদের প্রতি যে ভালোবাসা, সেই ভালোবাসা আমাকে ভারতীয় কৃষকরাই শিখিয়েছে। প্রকৃতির প্রতি যে ভালোবাসা এবং স্বতন্ত্র পরিবেশে থাকা এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার যে বাসনা আমার অধিকাংশ গল্পে আপনারা পেয়েছেন, তা আমি কৃষকদের কাছ থেকেই পেয়েছি। তাদের সঙ্গে থাকার জন্যেই, তাদের ওপর যে সমস্ত অত্যাচার চলে, তা আমি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছি।
-
বাড়ি? বাড়ি আমার বরিশার জেলার মূলাদি গ্রামে। মূলাদির নাম শোনেন নি?
হ্যাঁ, শুনেছি বৈ কি, উত্তর দিলাম আমি।
ছোটো বেলাতে সখ ছিল মিলিটারিতে যাব। শেষ পর্যন্ত সাংসারিক প্রয়োজনে সেই মিলিটারিতেই ঢুকতে হলো। সৈনিকের জীবনটা ভালোই লাগছিল আমার। বছর কয়েক পরে আমাকে স্পেশিয়াল ট্রেনিং-এর জন্য কোয়েটায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে আমি প্যারাট্রুপারের ট্রেনিং নিচ্ছিলাম। একটা শত্রু-অধিকৃত অপরিচিত এলাকায় কি করে ধ্বংস কার্য চালাতে হয় এই ট্রেনিং-এর মধ্য দিয়ে তারই শিক্ষা দেওয়া হয়। এ লাইনে যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁরা বলেন, একজন দক্ষ প্যারাট্রুপার বহু অসাধ্য সাধন করতে পারে। কথাটা যে কত বড় সত্য, আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা বুঝতে পেরেছি। এই ট্রেনিংটা
-
বিচিত্র এক জীবন। আমাদের এই বাংলাদেশে যারা শিল্পপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে এমন একটি জীবন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আমি হাজী মহম্মদ ফকীরচাঁদের কথা বলতে যাচ্ছি। নিঃস্ব নিরক্ষর এক এতিম, ভাগ্য যাকে কোনো দিক দিয়েই কোনো ভাবে অনুগ্রহ দেখায়নি। সে ছেলে কেমন করে একান্ত ভাবে নিজের বুদ্ধি ও নিষ্ঠার জোরে ব্যর্থতার বাধা ডিঙ্গিয়ে অবশেষে সাফল্যের মঞ্জিলে এসে পৌঁছাল আমাদের এই ব্যবসা বিমুখ বাঙ্গালি সমাজে তা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তরূপে পথ নির্দেশ করতে পারে।
পিতার নাম আলিজান ব্যাপারী। তাঁর আদি নিবাস রহমতগঞ্জে, পরে উর্দু রোডে চলে আসেন। গরীব মেহনতী মানুষ। মৌলভী বাজারে তাঁর পৈত্রিক ফলের ব্যবসা ছিল। ফকীরচাঁদ যখন
-
বাবা খুব ভোরে উঠতেন। উঠে গান বাজাতেন আর পড়ার টেবিলে বসতেন। সেই ছোটবেলা থেকেই আমাদের ঘুম ভাঙতো গানের সুরে। আর বাবা যে পড়ার টেবিলে বসতেন এটা আমাদের কাছে ছিল নিত্যদিনের অভ্যাসের মতো। তাঁর লেখালেখি বা তিনি যে বরিশাল উদীচীর সভাপতি—এটা খুব স্বাভাবিক ছিল আমাদের কাছে। তিনি একাধারে একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন দক্ষ সংগঠক। তবে আমার কাছে তিনি শুধুই ‘বাবা’। আর বাবার সঙ্গে একদম ছোটবেলা থেকে যেতাম উদীচীতে। বিজ্ঞজনদের কথা শুনেই আমার বড় হওয়া। কি বুঝতাম জানি না। তবে বাবার সঙ্গেই থাকতাম। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যখন বাবার হাত ধরে হেঁটে শহিদ মিনারে যেতে পারতাম না, তখন যে ভ্যানে বাদ্যযন্ত্র থাকতো সেই ভ্যানে
-
রেবতীমোহন বর্মণআর আমাদের ভিতরে নেই। ৬ মে (১৯৫২) তারিখে তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহরে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। সুদীর্ঘ বারো বৎসর কাল দুরারোগ্য কুষ্ঠ-ব্যাধির সহিত সংগ্রাম করে শেষ পর্যন্ত এই ব্যাধির হাতেই তিনি নিজের জীবনকে সঁপে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
তাঁর মৃত্যুতে আমরা যে শুধু একজন বিশিষ্ট বিপ্লবীকে হারালাম তা নয়, মার্কসবাদের একজন একনিষ্ঠ ছাত্রও আজ চিরদিনের মতো আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে তাঁর আরো অনেক অবদান দেওয়ার ছিল, কিন্তু দুষ্ট ব্যাধি তা থেকে আমাদের বঞ্চিত করে দিল।
তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় একজন সুলেখকও ছিলেন তিনি। কিন্তু এই পরিচয় তাঁর একমাত্র পরিচয়
-
আবাল্য, যখন থেকে হাফপ্যান্ট পরে পাঠশালায় যেতে শুরু করেছি, সে নৈসর্গিককাল থেকেই আমি গৃহকাতর। পাঠশালার লম্বা বেঞ্চে বসে আদর্শলিপির বড়ো বড়ো অক্ষরের ভেতর আমি গৃহকে দেখতাম, মাস্টারসাব যখন বানান শেখাতেন, ক এবং ত যুক্ত হয়ে কি হয়, বলতেন, তখন আমার সরল অগোলকদ্বয়ের মধ্যে গৃহের চিত্র ভাসতো। অবশ্য, আমার গৃহ যে কোনটি, তা আমি তখনো স্থির করে উঠতে পারিনি, কখনো মনে হতো মায়ের বাহুই আমার গৃহ, কখনো মনে হতো আমার বিছানা আমার গৃহ, কখনো শুধুমাত্র লালনীল নকশিকাঁথাটিকেই মনে হতো আমার গৃহ। সে থেকে আমি গৃহকাতর, এবং তারপরে যখন বড়ো হতে লাগলাম, ক্লাশ ফোরে ওঠলাম, তখন আমার গৃহবোধ ভূগোলবোধের সাথে সাথে বিস্তৃত
-
লেখক: মুহম্মদ সবুর
টমাস জন বাটা জানতেন যুদ্ধংদেহী পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে থাকা পূর্ব পাকিস্তানে তাদের প্রতিষ্ঠানটি জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে কঠিন অবস্থান নিয়েছে ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটি এবং এর প্রধান কর্মকর্তা। সে এক বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান। পাকিস্তান সরকার বা সেনাবাহিনী ঘুণাক্ষরে টের পেলে অবস্থা হবে ভয়াবহ। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবন রক্ষাই হয়ে পড়বে কঠিন, প্রতিষ্ঠানও হবে বেহাত। কিন্তু পিছু হটে যাওয়ার কোনো জো নেই। নীতিগত কারণে এই অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসা সম্ভবও ছিল না আর। বিজয় অর্জন পর্যন্ত অত্যন্ত গোপনে কাজ চালাতে হয়েছে। তবে সদাসতর্ক থাকার জন্য ঢাকা অফিসকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই '৭১ সালে। বিশ্ব মানচিত্রের
-
লেখক: সৈয়দ আবুল মকসুদ
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকেরা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একাত্তরের মার্চে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তাঁদের ভূমিকা ছিল অগ্রসৈনিকের। শুধু লেখালেখি নয়, তাঁরা রাজপথে মিটিং-মিছিল করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দেশের ভেতরে থেকে কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নিয়েছেন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যাঁদের পক্ষে ভারতে যাওয়া সম্ভব হয়, তাঁরাও সেখানে গিয়ে বিভিন্নভাবে সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের কবি-লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে তখন যোগ দেন ভারতের বাঙালি কবি-সাহিত্যিকেরা। তাঁরা বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বরতার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন।
কলকাতার উর্দুভাষী কবি-সাহিত্যিকেরা অনেকেই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের সঙ্গে সংহতি জানাতে এগিয়ে আসেননি। তবে কেউই আসেননি তা
-
দুনিয়ায় খুব কমই দেখা যায়, যে একজন আর একজনকে টেনে তুলছে ওপরে। এবং সে টেনে তোলা আরও মহত্ত্বর হয়, যখন যিনি টেনে তুলছেন, তিনি খ্যাতির শীর্ষদেশে সমাসীন যাকে টেনে তুলছেন, সে রয়েছে অখ্যাত, অবহেলিত। এমনি একটি কাহিনী দিয়েই আজ আমি নজরুল ইসলামের স্মৃতি-চারণ করছি।
১৯২১ সাল। দেশে তখন প্রবল অসহযোগ আন্দোলন। সে আন্দোলনে ভাসিয়ে দিলাম আমার আসন্ন বি. এ. পরীক্ষা। স্কটিশ হস্টেল ছেড়ে দিয়ে বাসা বাঁধলাম নন্দকুমার চৌধুরী লেনের একটি মেসে।
‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। একদিন তার কথা উঠতে পবিত্র বললেন, ‘ও কাজীটার কথা বলছিস? তা ওটাকে আনবো একদিন।’
আমি তো হাঁ! বড় বেশী
-
মুখ দিয়ে সবে কথা ফুটছে। তখন থেকেই আমাকে সব ব্যাপারে জ্ঞানী করে তোলার জন্য আমার ঠাকুর্দার মানে পিতামহের কী সাংঘাতিক গরজ! মুখে মুখে নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই তার উত্তর দিয়ে, আবার আমার মুখ দিয়ে তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে, পাখি পড়ানোর মতো শেখাতেন—
'তোমার বাড়ি কোন গ্রামে?’—চন্দ্রপাড়া। ‘কোন্ ইউনিয়ন?' -আশুজিয়া। 'থানা?’—কেন্দুয়া। ‘মহকুমা?’—নেত্রকোনা। 'জিলা?’—ময়মনসিংহ।
‘নেত্রকোনা' আর 'ময়মনসিংহ' কথা দুটো নিজেই বারবার আবৃত্তি করতাম। সেই এতটুকু বয়সেই এ-দুটো নামের প্রতি আমার প্রচণ্ড আকর্ষণের একটা গূঢ় কারণ ছিল। আমাদের গাঁয়ের আশপাশের বাজার গুলোতে হাটের দিনে তেল নুন কেরোসিন মাছ তরকারি পাওয়া যেতো, ছোট ছোট লিলি বিস্কুট কিংবা ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া তক্তা বিস্কুটও পাওয়া যেতো; কিন্তু শখের
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অমিত রঞ্জন দে (১)
- অরবিন্দ গুহ (১)
- আকবর উদ্দীন (১)
- আবুল হাসনাত (১)
- আমীন আহম্মেদ চৌধুরী (১)
- আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১)
- ইলিয়া এরেনবুর্গ (১)
- কবীর চৌধুরী (১)
- কাজী নজরুল ইসলাম (১)
- কাজী মোতাহার হোসেন (১)
- কামরুদ্দীন আহমদ (১)
- কৃষণ চন্দর (১)
- কে জি মুস্তফা (১)
- গোলাম মুরশিদ (১)
- গোলাম মোরশেদ খান (১)
- জওহরলাল নেহেরু (১)
- জর্জ হ্যারিসন (১)
- জসীম উদ্দীন মণ্ডল (১)
- জুলিয়াস ফুচিক (১)
- তপন কুমার দে (১)
- দাউদ হোসেন (১)
- ধীরাজ কুমার নাথ (১)
- ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১)
- পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- প্রক্রিয়াধীন (১৫)
- প্রতিভা বসু (১)
- বিজন চৌধুরী (১)
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (২)
- মন্মথ রায় (১)
- মালেকা বেগম (১)
- মুজফ্ফর আহমদ (১)
- যতীন সরকার (২)
- রণেশ দাশগুপ্ত (১)
- রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১)
- রিঙ্গো স্টার (১)
- শাহীন রহমান (১)
- শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১)
- সত্যেন সেন (৫)
- সন্তোষ গুপ্ত (৩)
- সহায়রাম দাস (১)
- সাদ্রিদ্দিন আয়নি (১)
- সিমিন হোসেন রিমি (১)
- সুপা সাদিয়া (১)
- সোমেন বসু (৪)
- হালিম দাদ খান (১)
- হাসান তারেক (২)
- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১)
- হুমায়ুন আজাদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.