মাদ্রাসায় আমার শেষকটি দিন
[প্রাচীন কাল থেকে তাজিক সাংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে পারস্য ও ভারতে সাংস্কৃতির।
সাদ্রিদ্দীন আইনি (১৮৭৮-১৯৫৪) ছিলেন মহাপন্ডিত ও ধ্রুপদী কবি এবং তাজিক গদ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর রচনাবলী তাজিক জনগণের উপকথা বিশেষ।
বারো বছরের সাদ্রিদ্দীন বোখারায় আসেন জ্ঞান পিপাসার তাগিদে। কিন্তু মাদ্রাসার দুঃস্থ ছাত্রটির বেশির ভাগ সময় কাটত অন্য লোকের কাপড়জামা ধোওয়ায়, পড়াশুনোয় নয়। সুদীর্ঘ রাত্রে ঘুমের কথা ভুলে সে সাগ্রহে পড়ত হাফিজ, সাদি, কামল খুজান্তি এবং আহমেদ দানিশ এর মতো মহাকবিদের রচনা।
বিপ্লবের পর বোখারা আমিরের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাদ্রিদ্দীন আইনি, তাঁর নিজের ভাষায়, ‘অক্টোবর বিপ্লবের পাঠশালায় চল্লিশ বছর বয়সের পড়ুয়া হলেন,’’ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োগ করলেন সাহিত্য সেবায়। তাজিক সাহিত্যের বিষয়ে সমালোচনামূলক প্রথম বৈজ্ঞানিক লেখার স্রষ্টা তিনি।
তাঁর উপন্যাস—‘‘অনাথ’’, ‘‘ওদিনা’’, ‘‘বোখারার জল্লাদ’’, ‘‘একটি সুদখোরের মৃত্যু’’, ‘‘দোখুন্দা’’, ‘‘দাস’’ এবং তাঁর ‘‘স্মৃতিকথা’’র কয়েকটি খণ্ড খ্যাতিলাভ করেছে।
এ সংগ্রহে যে গল্পটি নেওয়া হয়েছে সেটি ‘‘ স্মৃতিকথা’’র প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত ‘মাদ্রাসায় আমার শেষকটি দিন’।]
১৯৯১ সালে স্কুল শুরু হবার কিছুদিন পরে মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মোল্লা আদুসালম তাঁর দলের পড়ুয়া লাতিফজান মাখদুম এবং কয়েকটি অন্তরঙ্গ সহপাঠীর জন্য একটি প্রীতি ভোজের বন্দোবস্ত করেন। রান্নাবান্না এবং পরিবেশনের ভার ছিল আমার উপর।
মোল্লা আবদুসালম থাকতেন মাদ্রাসার একটা সেরা কুঠরিতে ; এক খিলানের ঘরটি বড়োসড়ো, অন্যান্য কুঠরির মতো নয়। অগ্নিকুন্ড আর জলের কল ছিল দরজার পাশে। তাই আমরা সবাই বেশ কাছাকাছি ছিলাম, পোলাও বা চা বানাবার সময় কথাবার্তায় আমিও যোগ দিতে পারি।
বন্ধুদের সঙ্গে ঘরে ঢুকেই আমাকে চিনতে পারলেন লাতিফান মাখদুম। আবদুসালমকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ এই ছেলেটিই না বয়েতবারাকে হামবড়া মির্জা আবদুল ওয়াহিদকে হারিয়ে দেয়’’
‘হ্যাঁ’, বললেন আদুসালম।
‘এখানে পড়তে এসে ও ভালোই করেছে , ‘বললেন লতিফচান মাখদুম। পার্টিটা আমার খুব বালো লাগে, কেননা কথাবার্তা প্রধানত চলে কবিতা ও সাধারণভাবে সাহিত্য নিয়ে। অতিথিদের অধিকাংশই হয় কবি নয় কবিতারসিক। যাঁরা কবিতার বিষয়ে বিশেষ জানতেন না তাঁরা ভালো গল্প বলিয়ে, কোন সময়ে কী গল্প বলতে হবে সে বিষয়ে তাঁদের টনটনে জ্ঞান।
মজার মজার গল্প তারা করলেন, একে অন্যের স্টাইলে দ্বিপদী বানালেন, আগেকার কবিদের চার পদী শ্লোকের আবৃত্তি ও মহাজনপন্থা অনুসরণের যে ব্যর্থ চেষ্টা সমকালীনরা করেছে তার সমালোচনা চলল। সমকালীন কবিরা প্রায়ই মহাকবির অনুসরণ করে, কিন্তু মহাকবির প্রতি পদে সর্বদা থাকে খুব স্পষ্ট বক্তব্য। অনুসরণকারীরা শুধু রূপ নিযে ভাবে, বিষয়বস্তু ও মনন নিয়ে মাথা ঘামায় না।
অতিথিদের একজন, দপ্তরী মোল্লা নাজরুল্লা লুতঠি আমার মনে সবচেয়ে গভীর দাগ কাটেন। পরে শুনি দপ্তরীর কাজ তিনি ছেলেবেলায় করতেন, তারপর তালিম নিতে নিতে পড়াশুনো শুরু করেন, সাহিত্যে মন দেন। এখন তাঁর বয়স তিরিশের কাছাকাছি, মাদ্রাসায় পাঠ শেষ করছিলেন। যেমন জ্ঞান তেমন চেহারা : ফরসা রঙ, খায়েরি দাড়ি, বড়ো বড়ো কালো চোখ, বাঁকা ভোমা, টানা ভুরু। দোহারা ছিমছাম গড়ন, হাত আর পা সুগঠিত। দেখে মনে হয় জীবন্ত কবিতা।
লুতরি হস্তলিপিবিশারদ, এত সুন্দরতাঁর লেখা যে এমন কি যারা নিরক্ষর তারা পর্যন্ত অপরূপ শিল্পসৃষ্টি বলে এর তারিফ করত। বই নকল করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।
লুতফির কবিতা রূপের দিক দিয়ে সাধারণ, বক্তব্য তুচ্ছ। কিন্তু লোকটি এত অমায়িত, প্রত্যুত্তরে এত চটপটে ও সরস যে তাঁর কথাবার্তা শোনাটাই একটা আনন্দ। এমন সব দ্ব্যর্থক শব্দ তিনি ব্যবহার করতেন যেগুলি মনে হত সরল কিন্তু যাতে ছাপ থাকত ব্যঙ্গ বা প্রশংসার। তাছাড়া অন্যদের বক্তব্যের অর্থ যেভাবে তিনি করতেন তা স্বয়ং বক্তার কাছে অভিনব মনে হত।
অতিথিদের আর একজন হলে নাপিক মোল্লা রহমত। বাল্যকালে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments