নিদারুণ ফাইনাল
‘লোভে পাপ’—কথাটা কী নিদারুণ হতে পারে, সেটা এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলাটা বড়-পর্দার প্লাজমা টিভিতে দেখতে গিয়ে শাকের মামা আর আমি খুব ভালো করেই উপলব্ধি করেছিলাম। আর সেই উপলব্দিকে শুধু সাদামাটা উপলব্ধি বললে খুব কমই বলা হয়। আমাদের বাংলা স্যারের ভাষায় যাকে বলতে হয় একেবারে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি।
মারাত্মক সেই উপলব্ধির ফলে পরের দুতিন সপ্তাহ আমার কাছে দুনিয়ার সব খাবার এমনকি মুক্তগাছার ‘মুক্তাগাছার বিখ্যাত সেই গোপাল পালের মডা’ পর্যন্ত করলার মতো তিতা-বিচ্ছিরি লেগেছে। ও-দিকে রাগে দুঃখে শাকের মামা তার নিজের মাথার লম্বা-ঘন-কালো চুল পটপট করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে মাথাটা প্রায় ‘জিদান-মার্কা’ করে ফেলেছে। মাঝে-মধ্যে আবার হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে অন্যদের মাথার দিকেও হাত বাড়িয়েছে। আমরা অনেক কষ্টে ওকে ঠেকিয়ে রেখেছি। নইলে এদ্দিনে হয়তো পাবনার হেমায়েতপুরের বিখ্যাত সেই জায়গায়ই ওকে পাঠিয়ে দিতে হতো।
ঘটনাটা খুলেই বলি তাহলে—
বিশ্বকাপ শুরুর দিন তিনেক আগে খবর পেলাম, সেজ খালু বাসার জন্য একটা প্লাজমা টিভি কিনেছেন। বিয়াল্লিশ ইঞ্চি পর্দা, ঝকমকে জীবন্ত ছবি, মাঠে বসে খেলা দেখার অনুভূতি, চার লক্ষ টাকা দাম ইত্যাদি-ইত্যাদি লিখে চিঠি পাঠিয়েছে মাসুল মামা। আর তার পরদিনই ‘ছোট মামার কাছে ফিজিক্স পড়তে যাচ্ছি’ বলে রবিন আর মনি ছুটল টাকার দিকে। আমার সেজ খালু মানেই ওদের ছোট মামা।
মনি-রবিনের কথা শুনে তো আমাদের দম আটকে যাওয়ার অবস্থা। আগে তো সেজ খালু আসার খবর পেলেই ওরা ‘ছোটমামা এলেই পড়া ধরবে’ বলে দুজনেই হাওয়া হয়ে যেত বিদ্যাগঞ্জ কিংবা সোহাগীর দিকে। সেজ খালু যতদিন থাকতেন ততদিন আর এখানে আসার নামও করত না। এখন কেন যে ওরা পড়তে গেল তা তো বুঝতেই পারছি। আসলে তো গিয়েছে সারা রাত বড়-পর্দায় খেলা দেখবে আর সারাদিন সেজ খালার হাতের পোলাউ-কোর্মা-রোস্ট-কাবাবা খাবে। দুজনেই যে ছোটখাটো সুমো কুস্তিগির হয়ে ফিরে আসবে সে বিষয়ে আমি বাজি ধরতে পারি।
ঢাকা যাওয়ার ইচ্ছা আমাদেরও কম ছিল না। একে তো প্লাজমা টিভি তার উপর সেজ খালার হাতের মজাদার খাবার, একসাথে দুই মওকা ছাড়ে কে! কিন্তু রবিন-মনি বাড়ি থেকে অনুমতি পেলেও আমাদের দুজনের অনুমতি মিলল না। বাড়ির বড়দের এই ‘এক-চোখা নীতি’তে শাকের মামা রেগে আগুন। বড়দের মুখে কিছু বলল না ঠিকই কিন্তু মনি আর রবিনকে ‘বিশ্বাসঘাতক, রাজাকার, মীর জাফরের বংশধর’ ইত্যাদি ইত্যাদি বলে সকাল-বিকাল নিয়মিত গালাগাল দিয়ে গায়ের ঝাল মেটাতে চেষ্টা করল।
তবে আমাদের ‘বিশ্বকাপ মিশন’ অর্থাৎ টিভিতে বিশ্বকাপ খেলা দেখা খুব যে খারাপ যাচ্ছিল তা বলা যায় না প্রথমে তো ভেবেছিলাম নানাবাড়ির ড্রয়িংরুমের মান্ধাতা-আমলের বিশ ইঞ্চি সাদা-কালো টিভিতেই খেলা দেখতে হবে। কিন্তু খেলার দিন মুক্তা মামা কিনে নিয়ে এলো একুশ ইঞ্চি সনি ভেগা রঙিন টিভি। কিন্তু সেই টিভি আমাদের খুব উদ্দীপ্ত করতে পারল না। মুক্তা মামা আমাদের দুচোখে দেখতে পারে না। ওর ধারণা ইবলিশের খাঁটি শিষ্যদের মধ্যে শাকের মামার র্যাঙ্কিং হচ্ছে দুই (মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের পরপরই)। আর ওর সাথে থেকে থেকে আমাদের নাম্বারও দশের মধ্যেই আছে। তাই আমাদের রেগুলোর চড়-থাপ্পড় থেকে শুরু করে জুতা-পেটা পর্যন্ত করতো পারলে অশেষ ছওয়াবের ভাগিদার হওয়া যাবে। তাই সেই টিভিতে খেলা দেখা তো দূরের কথা, মুক্তা মামা যে ওর ঘরেই আমাদের ঢুকতে দেবে না সে বিষয়ে আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত।
শেষে শাকের মামার মাথা থেকেই বের হলো এর সমাধান, এক দুর্দান্ত রাজনীতি। মুক্তা মামা ব্রাজিলের অন্ধ সমর্থক। রোনাল্ডো-রোনালদিনহো বলতে অজ্ঞান। ব্রাজিল-সমর্থক সেজেই ওর ঘরে ঢুকতে হবে। আসলে তো শাকের মামা ইটালি আর আমি আর্জেন্টিয়ার সমর্থক।
খেলা শুরুর মিনিট দশেক আগে গুটি-গুটি পায়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments