ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা
১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটল। ভারতের রাজধানী দিল্লী শহর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্বাধীনে এসে গেল, আসলে এটা একটা আকস্মিক ব্যাপার নয়। বহুদিন আগে থেকেই ভারতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাকে এই অনির্বায পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল। যাদের দেখবার মত চোখ ছিল তারা দেখতেও পাচ্ছিলেন যে তার সর্বদেহে ক্ষয়রোগের লক্ষণগুলি ফুটে উঠেছে। এ এক বিরাট মহীরুহ, যার ভিতরকার সমস্ত সার পদার্থ একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাহলেও সাধারণের দৃষ্টির সামনে এতদিন সে তার প্রভুত্বব্যঞ্জক মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, অবশেষে সেই মহীরুহের পতন ঘটল; চমকিত হয়ে উঠল সবাই। দিল্লীশ্বরেরা জগদীশ্বরেরা শেষকালে এই হলো তার পরিণতি।
মুঘল সাম্রাজ্য সত্য কথা বলতে গেলে একেবারে বিনা বাধায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের খাস তালুকে পরিণত হয়ে গেল। বহুকাল আগে থেকেই ভারতের অপরিমিত ধনসম্পদের সত্য কল্পিত কাহিনী সারা বিশ্বময় প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল। তার মধুর গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ইউরোপীয় জলদস্যু ও বণিকের দল একের পর এক উন্মত্তের মত ছুটে আসছিল এবং তাদের পরস্পরের হানাহানির ফলে সমুদ্রের জল ও স্থলভূমি রক্তরাঙ্গা হয়ে উঠেছিল অবশেষে তার চূড়ান্ত অবসান ঘটল। ভাগ্যের নির্দেশে যারা আগে এসেছিল তারা পিছনে পড়ে গেল। আর ভাগ্যলক্ষ্মী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কণ্ঠে তাঁর জয়মালা পরিয়ে দিলেন।
চমকিত হয়ে উঠল সবাই। যারা ঘুমিয়ে ছিল তারা জেগে উঠল, যারা বসে ছিল তারা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল, কিন্তু এই পর্যন্তই, এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মত শক্তি তাদের ছিল কি? হয়তো তা ছিল, কিন্তু এই উন্নততর মারণাস্ত্রে সু-সজ্জিত শক্তির বিরুদ্ধে কে তাদের সংগঠিত করবে, কে তাদের নেতৃত্ব দেবে? তাদের নেতৃস্থানীয় অভিজাত শ্রেণীর প্রভুরা তখন মধুপানে মত্ত হয়ে বিলাস ব্যসনে ডুবে আছেন। কে জানে হয়তো তখনও তারা নিশ্চিত মনে সুখ-স্বপ্ন দেখছিলেন দিল্লী অনেক দূর।
প্রতিরোধ কি একেবারেই আসেনি? বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ কি ক্রমে ক্রমেই জমে উঠছিলো না? কিন্তু বিক্ষোভ যতদিন পর্যন্ত চাপা দেওয়া আগুনের মত ধুমায়িত হয়ে উঠতে থাকে, ততদিন ইতিহাসের দৃষ্টিতে তা ধরা পড়ে না। প্রথম প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ এল মুসলমান উলেমা সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে।
মূলত ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকেই বিদেশী ও বিধর্মীদের শাসন অসহনীয় বলে তাদের কাছে মনে হয়েছিলো। কিন্তু যে কোনো ধর্মই হোক, ধর্মীয় জীবন বৈষয়িক জীবন থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারেনা। ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে এ কথা আরো বেশী প্রযোজ্য।
প্রথম প্রতিবাদ তুললেন বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ। মুসলমানদের হাত থেকে বাদশাহী শাসন ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, কাজেই আঘাতটা মুসলমানদের বেশী করে বাজবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। তাই তাদের এই বিরোধিতা হয়তো এই ধর্মীয় নেতার অভিমতের মধ্য দিয়েই রূপ নিয়েছিলো।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ স্পষ্টই রায় দিলেন যে, ইসলাম তাঁর ধর্মীয় বিধান ও রাজনৈতিক ক্ষমতা, এই দুটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। কাজেই এই পরাধীন পরিবেশে ইসলাম কখনই সজীবতা ও স্ফুর্তি লাভ করতে পারে না। তার এই সূত্রটির যুক্তিযুক্ত রূপায়ণ ও অনুসরণের মধ্য দিয়ে তার শিষ্য প্রশিষ্যবর্গ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম করে এসেছিলেন। সেই দীর্ঘায়িত সংগ্রামের অতি সামান্য অংশই আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। আর তা খণ্ডে খণ্ডে ও বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল ধরে পরিচালিত হয়ে এসেছিলো। তাঁদের চরিত্র ও ভূমিকা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট নয়। এই জেহাদকে স্বাধীনতা সংগ্রাম আখ্যা দেওয়া চলে কি না এ বিষয়ে রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্-এর পুত্র ও তার পরবর্তী ধর্মগুরু আবদুল আজিজ তাঁর পিতার এই সূত্রটিকে কার্যকরী রূপে সম্প্রসারিত করলেন। তিনি বললেন, ভারতীয় মুসলমানরা এই পরাধীন অবস্থাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments