১৬ই ডিসেম্বরে স্মৃতি

আবাল্য, যখন থেকে হাফপ্যান্ট পরে পাঠশালায় যেতে শুরু করেছি, সে নৈসর্গিককাল থেকেই আমি গৃহকাতর। পাঠশালার লম্বা বেঞ্চে বসে আদর্শলিপির বড়ো বড়ো অক্ষরের ভেতর আমি গৃহকে দেখতাম, মাস্টারসাব যখন বানান শেখাতেন, ক এবং ত যুক্ত হয়ে কি হয়, বলতেন, তখন আমার সরল অগোলকদ্বয়ের মধ্যে গৃহের চিত্র ভাসতো। অবশ্য, আমার গৃহ যে কোনটি, তা আমি তখনো স্থির করে উঠতে পারিনি, কখনো মনে হতো মায়ের বাহুই আমার গৃহ, কখনো মনে হতো আমার বিছানা আমার গৃহ, কখনো শুধুমাত্র লালনীল নকশিকাঁথাটিকেই মনে হতো আমার গৃহ। সে থেকে আমি গৃহকাতর, এবং তারপরে যখন বড়ো হতে লাগলাম, ক্লাশ ফোরে ওঠলাম, তখন আমার গৃহবোধ ভূগোলবোধের সাথে সাথে বিস্তৃত হলো স্বদেশকে মনে হলো গৃহ। এবোধ আমাকে ভয়াবহ উল্লাস ও আনন্দ দিয়েছিলো, মাতাল করেছিলো, রবীন্দ্রনাথ সদরস্ট্রিটে প্রভাত-রৌদ্র রশ্মি দেখে যে উল্লাসবোধ করেছিলেন, তা আমার উল্লাস আর আনন্দের মতো। ফোরে, ভূগোলের ক্লাশে স্বদেশের সীমা মুখস্ত বলতাম গানের মতো, কিন্তু একদিন আমার সঙ্গীত প্রচণ্ড মর্মান্তিক ধাক্কায় শিউরে উঠলো। ফোরে যখন মাস কয়েক পড়ে ফেলেছি, ভূগোলের জ্ঞান বেশ হয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন বুঝতে পারি, পাকিস্তান বলে যেদেশকে আমি স্বদেশ ভাবি, যাকে নিয়ে আমি বিভোর হয়ে আছি, তা এক অদ্ভুত দেশ। আমার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠেছিলো। সেদিন যখন আমি বুঝলাম, পশ্চিম পাকিস্তান আমার সজল মেঘাকান্ত দেশ থেকে বারোশ মাইল দূরে। আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিলো একথা, বার বার আমি মনে মনে চীৎকার করেছি, না এ হতেই পারে না, হতে পারে না। পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম, আমি আমার কল্পনার শরীরে এটিই প্রথম আঘাত। এ আঘাতে আমি নতুন হলাম, মুহূর্তে আমার মনে স্বদেশের আয়তন তিন লক্ষ কতো বর্গকিলোমিটার থেকে যেনো চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইলে পরিণত হলো। সেদিনটি এবং পরের কয়েকটি দিন কাটলো আমার অস্থির শূন্যতার মধ্যে। যেনো কেউ আমার কোনো অতিপ্রয়োজনীয় অংগ কেটে নিয়েছে, যেনো কেউ আমার নাগরিকত্ব হরণ করেছে, আমাকে বিতাড়িত করেছে গৃহ থেকে বিমর্ষ হয়ে রইলাম। ক্রমে আমার কল্পনা থেকে মৃত পাতার মতো ঝরে গেলো পশ্চিম পাকিস্তান, চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইল হলো আমার স্বদেশ, ভূগোলে কল্পনায়, জাগরণে স্বপ্নে।

ক্রমে অনেকের মতো অজান্তে এবং জ্ঞাতসারে স্বদেশকে আমি নিজের জন্যে অপরিহার্য করে তুলেছি। অপরিহার্য, অবিচ্ছেদ্য, যাকে বাদ দিল আমি বাঁচতে পারি না। উনিশ শো একাত্তরের পঁচিশে মার্চ আমাকে সে সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলো। আমি, সকলের মতো হয়ে উঠলাম স্বদেশে উদ্বাস্তু। কবিতায় যে চেতনাকে আধুনিক কবিরা অনেকদিন ধরে প্রকাশ করে আসছেন, আমি নিজেও অনেক সময় যে শিকড়হীনতা বোধ করেছি চেতনায়, তা দেখা দিলো বাস্তবে। স্বদেশ ব্যতীত কেউ বাঁচতে পারে না, গাছের যেমন মৃত্তিকা, মানুষের তেমন স্বদেশ। তবু সকলের স্বদেশ না হলেও চলে কেউ কেউ হতে পারেন যে কোন এলাকায় সুখী, কেউ কেউ সুখী বোধ করেন বিশ্ব নাগরিক হয়ে। কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব নয় আমি ন্যুঅর্কে গেলে বাঁচবো সাতদিন, জাপানে তিনদিন। হয়তো একদিন না আমি চিত্তে লালন করেছিলাম শিল্পকলা, আর বেছে নিয়েছিলাম এরকম এক মাধ্যমকে যা একমাত্র সার্থক হতে পারে স্বদেশে। আর কোনোখানে নয়। আমার দুঃখ আমি সদ্য যাত্রা শুরু করেছি, প্রথম পদক্ষেপই এখানে পতিত হয়নি মাটিতে, সে সময় আমি গৃহহীন হয়ে পড়লাম সাহিত্যকে কবিতাকে করে নিচ্ছিলাম আমার নিবারণের প্রাণ বায়ু, তা রচিত হচ্ছিলো বাঙলা ভাষায়। তাই আমার জন্যে স্বদেশহীনতার অর্থ হলো মৃত্যু। গ্রীস থেকে নির্বাসিত হয়ে জীবস্মৃত হয়ে পড়েছিলেন অমিত শক্তিধর লেখকেরা, প্যারিস বা লন্ডন তাঁদের বাঁচাতে পারেনি। আর সবাই কাজনজাসিক নয় যে নির্বাসিত হয়েও সাধনা করবেন স্বভাষার,

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice