দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় : সময়ের কথা
লেখক: শহিদুল ইসলাম
এক. অবরুদ্ধ বাংলাদেশের প্রথম সূর্য ওঠার খরবটা পাই দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। এমনকি ২৫ মার্চ ১৯৭১, মধ্যরাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী সে বাংলাদেশকে দখল করার জন্য শানিত আক্রমণ চালিয়ে প্রথম রাতেই হাজার হাজার মানুষকে লাশে পরিণত করেছে, সে খবরও আমি পাই দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। প্রকৃতির অবধারিত নিয়মানুসারে সেই কণ্ঠটি চিরকালের জন্য নীরব হয়ে গেলো। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বসে আমার ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সূর্য ওঠার আগের ঘটনাটি সেলুলয়েডে বন্দী ছবির মতো আমার চোখে ভেসে উঠলো। সেদিনের ইতিহাস নিয়ে আমি অনেক লিখেছি। সেখানে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ আছে। কিন্তু তার বেশি না। তাই দেবদুলালহীন পৃথিবীতে আজ তাঁর কথা আরো বেশি করে মনে পড়ছে। উপাতার্থের বাড়ি থেকে আমাদের তিনজনকে (অজিত, মুজিবুর রহমান দেবদাস ও আমি) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনের আমাদের নিজ নিজ ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে তিনজন পাকিস্তানি সিপাই যখন বললো যে ঘর থেকে বের হলেই গুলি করা হবে। তখনো সূর্য আমাদের গোলার্ধে উঠে আসনি। ফর্সা হয়ে আসছে।
নিজ ঘরে বন্দী হলাম। সামনে-পেছনে রাইফেলধারী পাক সেনা। সাবধান না করে দিলেও বেরুবার কোনো রকম ইচ্ছা বা সাহস ছিল না। কি করি? বন্দী ঘরের তিন ব্যান্ডের ন্যাশনাল রেডিওর নবটা অতি সাবধানে অন করলাম। আকাশবাণী টিউন করাই ছিল। অতি সন্তর্পণে কাঁপা কাঁপা গলায়, কবিতার ভাষায় একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, 'পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।' এই দুটি বাক্য শোনার পরে আমার কি অনুভূতি হয়েছিল অনেক চেষ্টা করেও তা মনে করতে পারছি না। তবে মনে পড়ছে আনন্দ, মুক্তি-ভয়-মেশানো একটা অনুভূতি আমাকে কিছুক্ষণের জন্য অবশ করে দিয়েছিল। তারপর মনে হলো 'জয়বাংলা' বলে চিৎকারে ফেটে পড়ি। কিন্তু নিজ ঘরে বন্দী একজনকে সে উল্লাসের রাশ টেনে ধরতে হলো। সে উল্লাস শেয়ার করার মতো কেউ নেই। বার বার আকাশবাণীর সংবাদ পরিক্রমায় দেবদুলালের সুমধুর আবৃত্তি শুনি আর আনন্দ-উল্লাসের বহিঃপ্রকাশকে নিজের মধ্যে বন্দী করি।
দুই. তাই কলকাতায় পা দিয়েই এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে মনে হলো দেবদুলালের সঙ্গে দেখা করতেই হবে। কারণ তিনিই ছিলেন আমার বন্দী-জীবনের প্রথম বন্ধু, সাহসের জোগানদার। ২৬ মার্চ আমার রেডিওটা নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-বন্ধু-আশা সঞ্চারকারী। তাই এপ্রিলের বেশ সপ্তাহে ফলিত রসায়ন বিভাগের বন্ধু আনিসুর রহমান ও আমি একদিন গঙ্গার পাড়ে আকাশবাণী ভবনে উপস্থিত হই। গেটের দারোয়ানকে পরিচয় দিয়ে ঢুকি। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে গিয়ে তার অনুমতি নিয়ে ঢুকি এবং নিজেদের পরিচয় দিই। তার টেবিলের পাশে দরজার দিকে পেছন ফেরা আর এক ভদ্রলোক বসেছিলেন। দেবদুলাল তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। অনিমেশ সেন। করমর্দন করে তাকে বললাম 'আপনার বাবার কাছে আপনার কথা আমি শুনেছি। অতি সত্বর আমরা আন্তরিকতার সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। জানলাম অনিমেশ সেনই 'সংবাদ-পরিক্রমার' লেখক; আর পাঠক দেবদুলাল। কী অপূর্ব গলা। ভরাট মেলোডিয়াস! তবে প্রথমেই তাকে দেখে আমার বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি আবু বকর সিদ্দিকের কথা মনে হলো। ১৯৬৯ সালে বাগেরহাট কলেজে প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা নিতে গিয়ে সেখানকার বাংলার অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে পরিচয় এবং বন্ধত্ব। স্বাধীনতার পর তিনি ও হাসান আজিজুল হক-দুজনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। দেবদুলাল একজন পিওনকে চা-কচুড়ি আনতে বললেন। তারপর ২৬ মার্চ ভোরবেলায় আমাদের তিনজনের বন্দী হওয়ার কথা শুনলেন। তিনি ও অনিমেশ সেন যে এতোটা সময় দেবেন ভাবিনি। তাঁরা উভয়েই জানতে চাইলেন পাবনার জাঁদরেল উকিল কমলেশ সেনের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো কিভাবে? অনিমেশ সেন ও আমি উভয়েই পাবনার মানুষ। উভয়েই উচ্চ মাধ্যমিক করেছি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে।

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice