রাজনৈতিক পটভূমি
১৯৪০ সালে লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিলো। প্রস্তাবে বলা হয়েছিলো, কয়েকটি স্বশাসিত প্রদেশ নিয়ে একটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করা হবে যে রাষ্ট্রে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ পুরোপুরি সংরক্ষিত হবে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এ প্রস্তাবে পাঁচটি শর্ত আছে। ক. ইসলামি সংস্কৃতি-চর্চার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা, খ. হিন্দুদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে মুসলমানদের জন্যে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রগঠন: গ. এই নতুন রাষ্ট্রের জনগণের জন্যে অর্থনৈতিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণ: ঘ. জনগণের রাজনৈতিক অধিকার দান; ও ঙ. সম্পূর্ণ স্বশাসিত প্রদেশ গঠন।
কিন্তু এই শর্তগুলির প্রথম দুটি স্বীকৃত হলেও, অল্পকালের মধ্যে অন্য তিনটি শর্তকে অস্বীকার করার জন্যে একটি সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্র হয়েছে।
এ কথা সত্য যে, মুসলমানরা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ও ইংরেজিবিদ্যার প্রতি বিমুখতা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করার জন্যেই, উনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হয়েছে ও সামাজিক প্রতিপত্তি অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যহেতু হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে পরবর্তীকালে যে প্রতিযোগিতা চলে তা একান্তভাবেই অসম। ইংরেজরা এই বৈষম্যকে সাম্প্রদায়িক বিরোধ সৃষ্টির কাজে অত্যন্ত চতুর ও সফলভাবে ব্যবহার করেছেন ফলে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসেই এই সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি খুব জটিল আকার ধারণ করে। হিন্দু জাতীয়তা ও মুসলমানদের পশ্চিমী প্রীতি একই প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাবের এপিঠ ওপিঠ। শিক্ষা ও সম্পদের সুষম বণ্টনের সাহায্যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করে হয়তো এই প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে লড়াই করা যেতো। কিন্তু হিন্দু, মুসলিম কিংবা ইংরেজ এর কোনো শিবির থেকেই সে প্রচেষ্টা চালানো হয়নি। বরং হিন্দু জাতীয়তা ও মুসলিম জাতীয়তা সেকালের পরিপ্রেক্ষিতে নিতান্ত সত্য বলে মনে হয়েছিলো। বাংলাদেশের মুসলমানরা তখন পাকিস্তানের যে দাবি জানিয়েছিলেন এবং মুসলিম লীগকে ভোট দিয়ে জিতিয়েছিলেন, তার মধ্যে মিথ্যার কোনো স্থান ছিলো না। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারে প্রত্যাশায়ই তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির অধিকারী একটি মধ্যপ্রাচ্যের জাতির সঙ্গে ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা আশা করেছিলেন ইসলামের নামে তাঁরা সুবিচার ও ন্যায্য অধিকার লাভ করবেন এবং হিন্দুদের প্রত্যক্ষ শোষণ থেকে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হবেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির পরে হিন্দু-মুসলিম বৈষম্য অবশ্য দ্রুত কমে আসে। ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেখানে মাত্র কিঞ্চিদধিক দু হাজার মুসলিম ছাত্রছাত্রী প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছিলেন, ১৯৭০ সালে—৩০ বছর পরে—সেখানে এক পূর্ব বাংলা থেকেই প্রায় লক্ষ মুসলিম ছাত্রছাত্রী প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছেন। তা ছাড়া, চাকুরি ও ব্যবসাবাণিজ্য ক্ষেত্রে হিন্দু প্রতিযোগীর অভাবে অল্পকালের মধ্যেই মুসলমানদের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি পায় এবং হিন্দুদের প্রতি তাঁদের ঈর্ষা ও বিদ্বেষ মন্দীভূত ও দূরীভূত হয়। শিক্ষিত মুসলমানরা অপেক্ষাকৃত সম্মানজনক সামাজিক প্রতিপত্তি লাভ করেন এবং তার ফলে হিন্দুদের সঙ্গে তুলনা করে তাঁরা অতীতে যে হীনমন্যতায় ভুগতেন, তা-ও মুছে ফেলতে সক্ষম হন ৷ বরং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মুখে তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলমানদের শাসন ও শোষণের প্রতিই সচেতন ও বিরূপ হয়ে ওঠেন।
ধর্ম ও সংস্কৃতিচর্চার বিষয়েও হিন্দুদের অনুপস্থিতি মুসলমানদের একটি ঈর্ষামুক্ত উদার ও স্বকীয় দৃষ্টি লাভ করতে সহায়তা করে। বরং পরিবর্তিত পরিবেশে ধর্মের চেয়ে তাঁদের কাছে পার্থিব বিষয়ই বেশি প্রাধান্য লাভ করে। নব্যশিক্ষিত মুসলমানরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তথা বৃহত্তর জগতের সংস্কৃতিচিন্তার সঙ্গে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হয়ে ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি প্রশস্ত মানসিকতার অধিকারী হন। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হতে পারলো বলেই, একথা অনস্বীকার্য, সাম্প্রদায়িক চেতনা অল্পকালের মধ্যে কমে গেলো।
অপর পক্ষে, পূর্ব বাংলার জনগণ যখন তথাকথিত একটি স্বাধীন দেশের অধিবাসী হয়েও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন, তখন প্রথমে তাদের বিদ্বেষ এবং পরে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম পরিচালিত হলো পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। মুক্তবুদ্ধির আলোকে জনগণ দেখতে পেলেন হিন্দু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments