সত্যেন সেন : মুক্ত প্রাণের সাধক
সত্যেন সেনের কোন্ পরিচয় অধিক প্রসারিত—একজন কমিউনিস্ট কর্মী কিংবা নেতা হিসাবে এবং কৃষক আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে; না সাহিত্যিক হিসাবে তাঁর পরিচিতি সমধিক—এ কথা বলা দুঃসাধ্য। তবে একটা বিষয়ে বোধ হয় নিঃসন্দেহ হওয়া যায়, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর প্রাণপুরুষ হিসাবেই তিনি বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র পরিচিতি লাভ করেছেন। 'উদীচী' সাংস্কৃতিক সংগঠনের শাখা বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই রয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকলেই সত্যেন সেন সম্পর্কে কম-বেশি জানেন। উদীচীর কথা উঠতেই সত্যেন সেনের নাম স্মরণে আসবে অবধারিতভাবেই।
একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসাবে তাঁর পরিচয়ের পরিধি খুব বেশি নয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যারা গভীরভাবে জড়িত তাদের সীমানায় তাঁর নামডাক দু-যুগ আগে শোনা যেত। তারপর যেমন হয়; ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে যান। প্রয়োজনের তাগিদে কেউ কেউ স্মৃতির ওপারের ধুলারাশি ঝেড়ে সযত্নে বের করে আনে। কোন প্রতিষ্ঠান ব্যতীত, হোক তা সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক—কারোর কর্মকাণ্ড কিংবা সুখ্যাতি ধরে রাখা এ দেশে অন্তত সম্ভব নয়। যেখানে প্রতিনিয়ত কাল প্রবাহে কোথাও চর পড়ে, ডাঙ্গা জেগে ওঠে—আর অন্য তীর ভেঙে পড়ে, জনপদ বিলীন হয় কালস্রোতে। এছাড়া একজন লেখক বেঁচে থাকেন পাঠকের হৃদয়েই। আজকের যুগে তথ্যপ্রবাহ চলতিকালের প্রয়োজনটুকু ছেঁকে তুলে বাকিটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়, সেখানে একজন রাজনৈতিক কর্মী ও সাহিত্যিক কিংবা শিল্পী যদি কোন প্রয়াস মিটানোর উপাদান হিসাবে অপরিহার্য হয়ে পড়েন, তখনই তাঁর ডাক পড়ে।
'উদীচী' সাংস্কৃতিক সংগঠনটি না থাকলে অহরহ সত্যেন সেন আমাদের স্মৃতিতে জাগরুক থাকতেন না, এটা সুনিশ্চিত। সত্যেন সেন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জীবনের যতটা সময় ব্যয় করেছেন, সাহিত্য কর্মে আত্মনিয়োগের কালটি সে তুলনায় খুবই সংক্ষিপ্ত। লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ কিশোর বয়স থেকেই; যেমন আগ্রহ নিয়ে স্কুলে পড়ার সময়েই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। যখন লেখার দিকে ঝুঁকে পড়লেন পরিণত বয়সে তখন তিনি আরও একটি কাজ করেছিলেন লেখক সৃষ্টিতে। তাঁর উৎসাহে অনেকে সাহিত্য রচনায়, প্রবন্ধ লেখায় এগিয়ে আসেন, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কর্মী আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্রদের তিনি সমভাবে উৎসাহ দিতেন। কেন সত্যেন সেন পরিণত বয়সে এসে কলম ধরেছিলেন? বার বার দীর্ঘ কারাবাসে শরীর অপটু, তারপরও একের পর এক লিখে চলেছেন উপন্যাস, গল্প। এমন কি ছোটদের জন্যও লিখেছেন। লিখেছেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই। তাঁকে কেউ লেখক বললে হেসে বলতেন, 'আমি কি কোন লেখক আদতে? আমার মতো লোকের তো কলম ধরাই উচিত নয়। তবে ধরি এই জন্য যে, আমাদের বিশ্বাসের কথা, অভিজ্ঞতার কথা আমরা ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। তাই আমাদের দুই ক্ষেত্রেই কাজ করতে হয়, মাঠের কাজ ও লেখার কাজ।'
সত্যেন সেনের এই কথার মধ্যদিয়ে 'কেন লিখি' সেই প্রশ্নের একটা জবাব বেরিয়ে আসছে। এর মধ্যে বিনয় আছে। তাঁর ঐতিহাসিক বই ও ঐতিহাসিক উপন্যাস তো এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকে পড়ছেন। 'মহাবিদ্রোহের কাহিনী' গ্রন্থটি প্রকাশ উপলক্ষে সত্যেন সেন ভূমিকায় বলেছেন, 'সিপাহী যুদ্ধের শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ১৯৫৭ সালে রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এটি ১৯৫৭ সালে নয়, ১৯৫৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
ব্রিটিশ আমল থেকেই তিনি ঢাকায় প্রগতিশীল লেখক সংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক কারণে আত্মগোপন ও পরে কারাবাস। আর তখন থেকেই সত্যেন সেনের শুরু লেখালেখির কাজ। পাকিস্তান আমলে বার বার জেল খেটেছেন। মাঠে কাজ করার সুযোগ সীমিত। তাই লেখায় আত্মনিয়োগ করার সময় এলো। লিখলেন সামাজিক উপন্যাস, রাজনৈতিক উপন্যাস, ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস। ১৫ বছরের মধ্যে ৩০টির মতো বই লিখেছেন। এর আগের লেখা একটি রোমান্টিক উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হলো '৫০-এর দশকে। নাম 'ভোরের বিহঙ্গী'। এটি একটি রোমান্টিক উপন্যাস। এই বইটির কথা উল্লেখ করলে একটু লাজুক হেসে বলতেন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments