একুশের সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা
সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা ৬ দশক আগের গোপন দলিলে উল্লেখ আছে, সে সময়ের ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেটের মতে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন জোরদার করতে ছাত্র সমাজকে তখন খেপিয়ে তুলেছিল কমিউনিস্টরাই। বায়ান্নর ১৫ মার্চ ঢাকার মার্কিন কনসাল এই মর্মে একটি বার্তা ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। কমিউনিস্টরা ছিল ভাষা আন্দোলনের নাটের গুরু- এই মর্মে তার রিপোর্টে সত্যতা ছিল। এরকম অভিমত অনেকেরই। আবার অনেকের মতে, কমিউনিস্ট পার্টি একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার বিরোধিতা করেছিল? এসব কথা নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই। প্রশ্ন হলো, আসল সত্য কোনটি?
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে রক্ত ঝরেছিল ঢাকার রাজপথে। রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকতদের বুকের তাজা রক্তে সেদিন রচিত হয়েছিল আন্দোলনের এক অনন্য অধ্যায়, ইতিহাসের এক অমর গাঁথা। এরকম আরো রক্তঝরা গণসংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে বায়ান্নর আগে ও পরে। রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে শহীদের রক্তে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি আজো হয়ে আছে বাঙালির 'শহীদ দিবস'। দেশের জন্য আত্মদানের মহিমা, পুলিশের গুলিতে বুলেটে-ঝাঁঝরা হওয়া বুক, উড়ে যাওয়া মাথার খুলি, কুমড়ো ফুলের বড়ি রেঁধে ছেলের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকা পাড়াগাঁয়ের সেই দুঃখিনী মায়ের কোল খালি হওয়া চিরবিদায়ের বিরহ যন্ত্রণা- এগুলোই অমর একুশের প্রতিচ্ছবি। সাথে সাথে একুশ হচ্ছে মাথা না নোয়ানো অমিত সাহস, বীরত্ব এবং ছাত্র-জনতার একতাবদ্ধ দুর্বার প্রতিরোধের মহাকাব্যিক আখ্যান। গ্রীক ট্র্যাজেডির মতো যুগপৎ বেদনা ও বীরত্বের অমর গাঁথা।
একুশের সাথে আমার সরাসরি সংযুক্তির কথা দিয়েই না হয় শুরু করি। বায়ান্নতে বয়স আমার চার বছর ছুঁই ছুঁই অবস্থায়। মিছিলে যাওয়ার বয়স তখনো আমার হয়নি। তবুও সেই বয়সেই একুশের ছাপ এসে স্থায়ী স্মৃতিময় আসন করে নিয়েছিল আমার শিশু মনের কোমল অনুভূতিতে ও চেতনায়। সব বিষয় বুঝতে না পারলেও টের পাচ্ছিলাম যে, চারদিকে কেন যেন একটি চাপা গুঞ্জন। এদিকে-ওদিকে উত্তেজিত কথাবার্তা। বয়স্কজনদের বড় রাস্তার মাথায় গিয়ে খবরা-খবরের খোঁজ নিয়ে আসা। ঝাপ বন্ধ করে গলির মুখে দোকানীদের জটলা করা। শুধু একদিন নয়, পরপর কয়েকদিন ধরে এধরনের টান টান উত্তেজনা। কি যেন বড় কিছু ঘটে চলেছে দেশজুড়ে। সে অগ্নিঝরা দিনগুলোর খণ্ডচিত্র ও ইতিহাস রচনাকারী সেসব উত্তাল ঘটনাবলীর ছাপ অস্পষ্ট ছবির মতো আমার সেদিনের শিশুমনে স্থায়ী চিহ্ন রচনা করেছিল। কালক্রমে বয়স বেড়েছে। আরো কিছুটা বড় হয়ে কবে যে প্রথম একুশের প্রভাতফেরীতে পা মিলিয়েছি, শহীদ মিনারে ফুল দিয়েছি, সে কথা নির্দিষ্ট করে মনে নেই। কিন্তু বায়ান্ন থেকে আজ পর্যন্ত, এই ৬২টি বছর ধরে বাঙালি জাতীয়তাবোধ, গণমুক্তি ও প্রতিবাদ-বিদ্রোহের উদ্দীপক প্রেরণারূপে আমার আবেগ, অনুভূতি ও চেতনায় স্থায়ী আসন অধিকার করে আছে 'অমর একুশ'। আমার মতো আরো কোটি কোটি বাঙালির ক্ষেত্রেও তাই।
সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের আদর্শে আমার উদ্বুদ্ধ হওয়া ও একজন কমিউনিস্ট হয়ে ওঠার পেছনে অনেক উপাদান কাজ করেছে। তার মাঝে ছিল যুক্তি-তর্ক ও বিচার-বিবেচনার মস্তিষ্কজাত উপলব্ধি। একই সাথে আরো ছিল আমার আবেগ ও অনুভবের হৃদয় উৎসারিত অনুভূতি। যেসব অগণিত ঘটনাবলী আমার কমিউনিস্ট হয়ে ওঠাকে সম্ভব করেছে তার মাঝে একটি অনন্য প্রধান হলো বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি এবং বছর বছর সে দিবসটির মর্যাদাপূর্ণ উদ্যাপন।
রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি হয়েছিল ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠনটির পতাকার নিচে সমবেত হওয়ার মধ্যদিয়ে। তখন থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি আমার ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছিল, অন্যান্য বিষয়ের সাথে, রাজনৈতিক ইতিহাস পাঠের স্বাভাবিক ও অত্যাবশ্যক বিষয়। স্বাভাবিক ছিল এ কারণে যে, ছাত্র ইউনিয়নের জন্মের উৎস ছিল বায়ান্নর সেই ভাষা সংগ্রাম।
একুশের রক্তঝরা সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় জনগণের মাঝে যে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিবাদী চেতনার নব উন্মেষ ঘটেছিল। সে সংগ্রামে দেশের সাধারণ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments