বুলি তোমাকে লিখছি
আমি কখনো সমুদ্রে যাইনি। সমুদ্রের সেই উত্তাল তরঙ্গের বিপুল করতালির উপর ভাসতে ভাসতে কখনো সীমাহীন নীল দেখতে দেখতে নিজেকে বিস্মৃত হই নি। কখনো কখনো সাগরের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে ভালো লাগতো। হু-হু শব্দে ভেসে আসা বাতাসের বুকের গভীরে দাঁড়িয়ে এক-এক সময় বিহ্বল হতাম বটে কিন্তু সমুদ্রে নামতে আমার ভীষণ ভয়। আমি মাটির পৃথিবীর মানুষ—মাটির উপর যতক্ষণ থাকি ততক্ষণ ভরসা থাকে। তুমি তো জানতে বুলি, আমি খুব বেশী কিছু চাই নি। চক মিলানো বাড়ি, চমৎকার গাড়ি—চকচকে মেয়েমানুষ—কোনো কিছুই ব্যাকুল হয়ে কামনা করি নি।
কিন্তু মানুষের চাওয়া-পাওয়ার মাঝখানে কি কোনো নির্দয় সীমারেখা জোর করে টেনে দেওয়া চলে? না-কি অঙ্কের নির্ভুল হিসেবে জীবনের ছক-কাটা ঘরে সবকিছু একাকার করতে পারা যায়? হয়ত যায়, হয়তো বা যায় না। সে আমি কোনদিন খুব বেশী করে ভেবে দেখি নি। কিংবা বলা যায় ওই ভেবে দেখায় আমি কোনো ফল দেখতে পাই নি। অথবা দেখতে পেলেও কি।
আমি একজন সাধারণ মানুষ। অসাধারণ হবার চেষ্টা যে কখনো ছিল না—একথা ঠিক নির্দ্বিধায় বুকে হাত দিয়ে বলতে পারছি না। প্রথম দিকে যখন ঠিক জীবনকে বুঝতে পারি নি, তখন আকাশকুসুম অনেক কিছুই তো ভেবেছি। ওই দেখ, কথাটা এমন ভাবে বলছি যেন জীবনকে আমি কত চিনে ফেলেছি! তুমি হলে বলতে—আহা! কত যেন ন্যাকা! ন্যাকা! ন্যাকা কথাটা তুমি খুব ব্যবহার করতে। আর বলবার সময় বাচ্চা মেয়ের মতো মাথা দুলিয়ে এমনভাবে তাকাতে—যেন—সাংঘাতিক একটা কিছু বুঝে ফেলেছ তুমি।
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে তোমার মুখটা কিছুতেই মনে পড়ছে না। কখনো নাক, কখনো চোখ, কখনো চিবুকের নিচে শাদা কণ্ঠ—কখনো বা এক টুকরো হাসি—অথচ সব মিলিয়ে পুরো তোমাকে একসাথে স্মরণ করতে পারছি না। এই মনে করতে না পারায় আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে—মুঠোর মধ্য থেকে বিন্দু বিন্দু জল চুইয়ে পড়ার কষ্ট।
আজ এ মুহূর্তে পেছনে ফেলে আসা পুরো জীবনটাকে আমার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হয়। কোন পরম পুরুষের কাছ থেকে জেনে নিতে ইচ্ছে করে জীবনে যা ঘটে তার সবই কি সত্যি। নাকি কোন স্বপ্নের মধ্যে আমরা জেগে ছিলাম, আবৃত কুয়াশার অন্ধকারে পরস্পর পরস্পরকে জেনেছিলাম।
এখানে এই সাড়ে এগারোটার দুপুর ছুঁই ছুঁই রোদ্দুর এখন বাড়ির বাইরে এক চিলতে উঠানে গা বিছিয়ে তেজ নিচ্ছে। ঘরের ভেতর দোতলার একটা ঘরে আমি মেঝেয় শুয়ে লিখছি। কাকে? তোমাকে?
বুলি, আমার এ লেখা যদি তোমার হাতে পড়ে তাহলে তুমি কি ভাববে জানি না। অথবা তুমি কিছু ভাবলে আমার কি! কারো ভাবনার মধ্যে অন্তর্গত হয়ে বেঁচে থাকায় কি সুখ। সুখ কি শুধু বোধের মধ্যে, চৈতন্যের মধ্যে চোখ বুজে শুয়ে থাক। এ্যাকুইরিয়ামের সোনালি মাছ?
এখানে দুপুর গড়িয়ে যায়, বিকেল নামে তন্ময়। কাছের রাস্তায় গাড়ির শব্দ। সিঁড়ির পাশের ঘরে থাকি বলেই সারাক্ষণ ওঠানামার উড়ন্ত শব্দ ঝুলতে থাকে মগজের মধ্যে। ঘর বলতে বুঝি নিরাপদ আশ্রয়, নির্বিঘ্ন শান্তি।
তোমার ঠিক মনে আছে কিনা জানি নে—তুমি একদিন হাসতে হাসতে (মজা করে?) ঘর বাঁধার কথা বলেছিলে।
ঘর! দুপুরে কলেজের ক্লাস পালিয়ে তোমার সেই বান্ধবীর বাসায় এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেছিলে—জানেন, আপনার জন্য ইংরজির ক্লাস না করেই চলে এলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে তোমার ইংরেজির ক্লাস বিসর্জনের মতো চরম আত্মত্যাগের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়া আমার উচিত ছিল কিংবা একটি দূরন্ত চুম্বন। অথচ আমি কি বোকা। বলেছিলাম—‘না এলেই পারতে।’
ততক্ষণে আমার হাতে বেশ জোরে-সোরে একটা চিমটি কেটে বলেছিলে—‘আহা।’
তোমার কথা বলার ঢং-টা আমার ভাল লাগে নি। নিজেকে ভীষণ রকম ক্ষুদ্র আর অসহায় মনে হচ্ছিল। কেবলই জানতে ইচ্ছে করছিল—কি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments