টংক আন্দোলন (১৯৩৭-১৯৪৯)
ময়মনসিংহের উত্তরে গারো পাহাড়ের পাদদেশে ১৯৩৭ সাল থেকে শুরু করে সুদীর্ঘ বারো বৎসর টংক প্রথার বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী ও জঙ্গী সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল টংক প্রথা হচ্ছে কৃষকদের উপর এক প্রকার জঘন্য ও বর্বরতম সামন্তবাদী শোষণ। টংক কৃষকদের জমিতে কোন কর্তৃত্ব ছিল না। জমিতে ধান হোক বা না হোক টংক কৃষকদের জমির মালিক জমিদার ও অন্যান্যদের ধানে খাজনা দিতেই হতো। টাকায় খাজনা না দিয়ে এই প্রথার খাজনায় কৃষকরা মারাত্মক রকম শোষণের শিকার হতো। এই প্রথার বিরুদ্ধে এবং টাকায় খাজনা দেওয়ার দাবিতে টংক কৃষকের মরণপণ সংগ্রাম বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনে এক গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে।
শোষণে জর্জরিত হয়ে টংক কৃষকরা যখন মরণোন্মুখ কিন্তু প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষা ও পথ যখন তারা পাচ্ছিল না, তখন টংক কৃষকদের অনুরোধে আমি এই আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করি। কিভাবে এই আন্দোলনে আমি জড়িত হলাম, কিভাবে তা ব্যাপক কৃষকদের সংগ্রামে রূপান্তরিত হতো, কিভাবে এই সংগ্রাম বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে সশস্ত্র রূপ ধারণ করল, কিভাবে এই সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটলো তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও অভিজ্ঞতা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা আমি করছি। আমি ইতিহাসবেত্তা নই, এটা কোনক্রমেই গবেষণামূলক প্রবন্ধও নয়— নিজের জীবন সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার একটি অধ্যায়ের বিবরণ মাত্র। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই ঘটনার পারম্পর্য ও ধারাবাহিকতা এখানে রক্ষিত হয় নি।
টংক আন্দোলনে যোগদান১৯২৮-এর প্রথম দিকে আমি কলকাতার মেটিয়াবুরুজে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল যখন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত হয়, তখন ব্রিটিশ সরকার পাগলা কুকুরের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। টেরোরিস্ট-কমিউনিস্ট কোন বাছ-বিচার না করেই শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে তখন বিনাবিচারে আটক করা হয়। রাজনৈতিক এই পটভূমিতে ১৯৩০ সালের ৯ই মে আমি গ্রেপ্তার হয়ে যাই। বিভিন্ন জেল, ক্যাম্প ঘুরিয়ে এনে ১৯৩৫ সালে সুসং-এর নিজ বাড়িতে আমাকে নজরবন্দী করা হয়। আমাকে প্রতিদিন বিকেলে থানায় গিয়ে হাজিরা দিতে হতো। আমার থানায় যাওয়ার চৌহদ্দি ছিল অনেক বড়। এতে কিছুটা সুবিধাও ছিল। আমার বাড়ি থেকে মাত্র আধা মাইল দূরে ছিল কৃষকদের গ্রাম। সেখানে মুসলমান কৃষকরাই বসবাস করতেন। তাদের সাথে আমার আলাপ আলোচনা থেকে জানতে পারি যে, টংকের অত্যাচারে কৃষকেরা জর্জরিত। তারা অবিলম্বে ঐ প্রথার অবসান চান। আমি তাদের আশ্বাস দিয়ে বলি, “আপনারা যদি সবাই একজোট হয়ে আন্দোলন করেন, তাহলে নিশ্চয়ই টংক প্রথা উচ্ছেদ হয়ে যাবে।” এরই মধ্যে এক জমিদারের জনৈক রাজমিস্ত্রিকে ভিটা-মাটি থেকে উচ্ছেদ করা নিয়ে আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব বেধে যায়। এই দ্বন্দ্বের ফলে আমি এখানে রাজনীতি করছি, এই মর্মে জমিদার আমার নামে আইবি-তে দরখাস্ত দেয়। একদিন আমাদের গ্রামে বন্যার সময় হঠাৎ আমার সাথে ঐ জমিদারের দেখা হয়। তিনি বললেন, “দেখতো—আমি ব্যাপারটা কিরকম ম্যানেজ করলাম।” অর্থাৎ সাত দিনের মধ্যে তিনি রাজমিস্ত্রিকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন তা তিনি করেন নাই। তিনি জোর খাটান নাই। কারণ থানায় একটি শান্তি রক্ষার দরখাস্ত দেওয়া হয়েছিল। তিনি বললেন, “উত্তেজনার মাথায় তোমার নামে একটি দরখাস্ত দিয়েছিলাম। এখন বুঝছি এটা ঠিক হয় নাই। কিন্তু তীর তো ছেড়ে দিয়েছি— ফল ফলবেই। আইবি নিশ্চয়ই আসবে।” কিছুদিন পর আইবি এলো। আমি রাজনীতি করছি বলে জানাল এবং কিছু কাগজপত্র নিয়ে গেল।
আমি ধারণা করলাম, আমাকে আবার জেলে যেতে হবে। তাই চিন্তা করলাম যে জনতার মধ্যে প্রচার করে জেলে যাওয়াই ভাল। এই সময় নেত্রকোনার এসডিও পাট উৎপাদন কম করার জন্য একটি জনসভা ডেকে ছিলেন। আমি এসডিও সাহেবের জনসভায় বক্তৃতা করলাম এবং অভিযোগ তুললাম যে পাটের নিম্নতম দাম বাঁধা হয় না কেন ইত্যাদি। পাট
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments