চাঁদের পাহাড়

ভিতিম-ওলো জাতীয় এলাকাটা হচ্ছে পূর্ব সাইবেরিয়ায়। দক্ষিণ ইয়াকুতিয়ার গায়ে লাগা এই বিরাট পাহাড়ে অঞ্চলটার উত্তরাংশ গায়ে গায়ে লাগান অজস্র পর্বতশ্রেণীতে ভরা। সাইবেরিয়ায় বোধহয় এর চেয়ে উচু পাহাড় আর নেই। দুর্গম বুনো জায়গাটা একেবারেই পাণ্ডববর্জিত। এই সেদিন পর্যন্ত জায়গাটা ছিল অনাবিষ্কৃত। পনের বছর আগে আমিই প্রথম মানচিত্রের এই ফাঁকা জায়গাটায় পা দিই। “প্রথম” মানে আবিষ্কারকদের মধ্যে প্রথম। এদেশের আদিবাসী তুংগুস আর ইয়াকুত্রা আগেই শিকারের সন্ধানে এ অঞ্চলের চারিদিকে ঘুরে বেড়িয়েছে। তুংগুস শিকারীদের কাছ থেকে নানা মূল্যবান খবর পেয়েছি। দূর দূর প্রান্তের সন্ধান তারা আমায় দিয়েছে। নদী, নদীর উৎস আর পর্বতমালার ম্যাপ ভাল করে এ'কে দিয়েছে। এখানকার খুব ছোট ছোট নদীও আগেই নামকরণ হয়ে গেছে। যাযাবররা প্রধানত নদীতীরেই ঘুরে বেড়িয়েছে। পাহাড়ের বেলা কিন্তু তা ঘটেনি। বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন তাইগার শিকারীরা কখনো তাদের চলাচলের পথ আর ছাউনীর জায়গার সঙ্গে সম্পর্কহীন অপ্রয়োজনীয় তথ্যের ভার স্মৃতির উপর চাপায় না। তার ফলে আমাকেই এই পাহাড়গুলোর—ওখানে যাকে বলে "গলেৎস"—নামকরণ করতে হয়েছে।

১৯৩৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি তখন তক্কো নদীর তীরে। ইয়াকুতিয়া ছেড়ে তক্কোর তীর ধরে ভিতিম-ওলো জাতীয় এলাকায় যাব বলে প্রস্তুত হচ্ছি। আমার বিরাট অভিযাত্রী দলের অল্প কয়েকজনকে কেবল সঙ্গে রেখেছি। বাকি সবাইকে আল্দান আর লেনা নদীর দিকে পাঠিয়ে দিয়ে আবিষ্কারের ক্ষেত্রটাকে অনেক ছড়িয়ে দিয়েছি।

ভীষণ শীত। আমাদের রসদও কম। কিন্তু তবু এই সময়েই পাহাড় পেরব বলে ঠিক করেছি। কারণ শীতকালে দূরন্ত নদী জমে যায় বলে ভীষণ গিরিবগুলো সহজেই বল্গা-হরিণের স্লেজে চড়ে পার হওয়া যায়।

আমার সঙ্গে যে তিনজন রয়েছে তারা প্রত্যেকেই নিজের নিজের কাজের জন্য অপরিহার্য। একজন হচ্ছে গাবিশেভ। লোকটি ইয়াকুৎ। আমাদের পথপ্রদর্শক আর বল্গা-হরিণগুলোর মালিক। আরেকজন হচ্ছে আলেক্সান্দ্রভ, ভূবিজ্ঞানী। আর আছে আলেক্সেই। সে হচ্ছে একাধারে সব: রাঁধুনে, স্বর্ণসন্ধানী আর শিকারী। তিনজনেই ঝানু তাইগা পর্যটক। সাইবেরিয়ার দুর্গমতম জায়গায় এরা আমার সঙ্গে ঘুরেছে।

যাত্রারম্ভের পর প্রায় ন'মাস কেটে গেছে। এখনও একটা দুর্গম পথ পার হতে হবে। সাতটা স্লেজ আর চারটে বাড়তি বল্ল্গা-হরিণের ক্যারাভানটা তক্কো উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভিতর দিয়ে বেশ দ্রুতগতিতেই এগিয়ে চলেছে, বরফ-জমা নদীর তীর ধরে। কিছু পরেই নদীর দুমড়োন মোচড়ান আঁকাবাঁকা গতি (তুংগুস ভাষায় "তক্কোরিকান" কথাটার মানেও তাই) বদলে গেল। নিজের নামটাকে অর্থহীন করে দিয়ে নদীটা সোজা খাতে বয়ে চলল। দিনের পর দিন মানচিত্রের গায়ে নতুন নতুন অংশ সংযোজিত হতে লাগল। বহুদিন ধরে প্রাণপণ খেটে আঁকা হয়েছে দক্ষিণে নদীর উৎসের দিকে এগিয়ে যাওয়া এই দীর্ঘ আর বিস্তৃত উপত্যকার মানচিত্র। হরিণের পায়ের খুটখাট আর স্লেজের একটানা আওয়াজে এ অঞ্চলের অসীম নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে আমরা প্রতিদিন এগিয়ে চলেছি সামনের কালো পাহাড়গুলোর দিকে। ঢেউয়ের মতো পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে নিচু ঢিবির পেছনে। ঢিবিগুলো "সস্কা" নামে পরিচিত।

লেনা মালভূমির দক্ষিণাঞ্চলে পৌঁছলাম। একঘেয়ে ফাঁকা জায়গা। মালভূমিটা নিচু। চারদিকে সারি সারি বন্ধুর সঙ্কা সবকটাই প্রায় সমান উচু ফারগাছের কালো রেখায় ভরা। দিন এখন ছোট। তাই দিন থাকতে থাকতেই যত তাড়াতাড়ি পারা যায় এগিয়ে চলেছি।

২১শে ডিসেম্বর সংস্কার বদলে দেখা দিল দীর্ঘকায়, ছাঁচলো মাথা ঢিবি। লালচে-ধূসর গাছগাছড়ায় ভরা। ঘন রঙের ফার আর দেবদারুর গায়ে তারা পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। তার মানে চূণাপাথরের ক্লান্তিকর মালভূমি ছেড়ে আমরা গ্র্যানাইট আর নীস অঞ্চলের কাছাকাছি এসে গেছি। এ অঞ্চলের প্রাচীন মাটি ভূত্বকের সাম্প্রতিক নড়াচড়ার ফলে এখানে উচু উচু ঢিবির সৃষ্টি করেছে। এ কথা আরো বোঝা গেল আমাদের ভূবিজ্ঞানীকে খাড়া হয়ে বসতে দেখে। এতক্ষণ সে গলায় টোপোগ্রাফিক প্লেনটেবলটা ঝুলিয়ে 'ভ' মুখ করে বসেছিল।

মেঘের ঘন পর্দাটা দক্ষিণে সরে গেছে। পাহাড়ে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice