ব্ৰহ্মপুত্ৰ
উর্দু থেকে অনুবাদ: কমলেশ সেন
তোমার জ্বলে বাতি তোমার ঘরে সাথি। তোমার তরে রাতি আমার ভরে তারা।।
তোমার আছে ভাঙ্গা আমার আছে জল। তেমার বসে থাকা আমার চলাচল।
(রবীন্দ্র সঙ্গীত)
খোঁপায় সাদা গোলাপ লাগিয়ে এক গাঢ় বাসন্তী রঙের লাল আঁচলের শাড়ি পরে লতিকা সেন খোকনের দিকে হেসে এগিয়ে আসছিল। খোকন কাঠের ঘোড়ার ওপর বসেছিল, আর ঘোড়াকে চাবুক কশাতে কশাতে মনে মনে জোর ছুটে চলেছিল। মাকে যখন তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখল তখন কাঠের ঘোড়ার লাগাম সে খুব জোরে টানল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া উল্টে গেল। খোকন নীচে আর ঘোড়া তার ওপরে গিয়ে পড়ল।
খোকন কাঁদতে লাগল। লতিকা হাসতে হাসতে খোকনকে কোলে তুলে নিল। খোকন কাঁদতে কাঁদতে বলল, ঘোড়াটা ভীষণ পাজি। আমাকে নীচে ফেলে দিয়েছে।
লতিকা বলল, তুমি এতো জোরে বেচারীর লাগাম ধরে টেনেছ কেন? খোকন বলল, আমি যে মাকে দেখছিলাম।
লতিকা ওকে চুমু খেয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল, আচ্ছা, দেখ আমি বাজাবে যাচ্ছি, সোনামণির জন্যে কি নিয়ে আসব?
খোকন বলল, আমি বাঁশী নেব। ঘোড়ায় চড়ে বাঁশী বাজাব আর আমার ফৌজের আগে আগে যাব।
বলতে বলতে খোকনের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। ওর মাথায় চুল এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। ও কাঁদতে ভুলে গেল। চোখের জল এখনও ওর গালের ওপর ঝিকমিক করছিল। লতিকা রুমাল দিয়ে ওর চোখের জল মুছে দিল। দিয়ে ওর চুলের গুচ্ছে আঙুল চালিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিল।
লতিকা তুই কোথায় যাচ্ছিস?
কাকিমা লতিকাকে জিজ্ঞেস করলেন। হাত মুছতে মুছতে কাকিমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। কাকিমার অনেক বয়স হয়েছে। মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছে। মুখে ভাঁজ পড়েছে। দেখতে শুকনো শুকনো এবং রোগা। তার চেহারা যেন অনেক দুঃখের কথা জানান দিচ্ছিল। কিন্তু এ বয়সেও কাকিমার চেহারায় এক অদ্ভুত ধরনের সরলতা ছিল। অথচ যে বৃদ্ধ বয়সে মানুষ সব কিছু হারিয়ে বসে থাকে সেই বয়সেও তা কাকিমার মধ্যে অবশিষ্ট থেকে গিয়েছিল। আজকালকার ছেলেমেয়েদের চেহারায় এই সারল্য দেখা যায় না। কাকিমা কিভাবে এবং কি যত্নে এই সারল্যকে রক্ষা করেছো সেই গোপনীয়তা ফাঁস করেন না। কাকিমার বয়স হয়েছে আটষট্টি। এই লতিকাকে চুপ করে থাকতে দেখে তিনি আবার কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'কি, মিটিং এ যাচ্ছিস?” লতিকার হাসি খুব সুন্দর ছিল। কাকিমার হাসিও ছিল খুব সুন্দর। কি কাকিমা সি ছিল এমন এক হাসি, যেন মৃত্যুর পূর্ব-মুহূর্তে জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট হৃদয়ঙ্গম করতে চাইছে এবং হৃদযঙ্গম করে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসতে চাইছে। কাকিমার হাসিতে ছিল সেই অন্তরীক্ষের আকর্ষণ আর লতিকার হাসিতে ছিল ভোবের সেই উজ্জ্বলা— যে ঔজ্জ্বল্য বহু বহু দূর থেকে বা খুব, খুব কাছ থেকে এসেছিল, কেন সেই হাসি ঝলমল নক্ষত্রের মত ধীরে ধীরে অন্ধকারের পদা ধরে টানছিল আর সেই অসাধারণ মিষ্টি হাসি এক টুকরো হাসি যেন রেশমের ওপরে বেশম রেখে দিল। এই হাসি নিয়ে এসেছিল যেমন এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা তেমনি নিয়ে এসেছিল এক দৃঢ়তার অনুভব। এই হাসিতে ব্রহ্মপুত্রও ছিল, তুফানও ছিল— আর ছিল এক নৌকো, যে নৌকো ওপারে নিয়ে যেতে পারে।
কাকিমার ঠোঁট কাঁপছিল। একগুচ্ছ সাদা চুল হাওয়ায় উড়ে তাঁর গালের ওপর এসে পড়েছিল। তিনি এক অদ্ভুত বিনয়ের সঙ্গে লতিকাকে বললেন, তুমি মিটিংএ কি যাবেই যাবে?
লতিকা হাসল। হেসে সেই সাদা চুলের গুচ্ছটা খুব স্নেহের সঙ্গে তুলে কাকিমার কানের পেছনে দিয়ে দিল। তারপর আবদারের সঙ্গে বলল, কাকিমা, আটটার আগেই আমি ফিরে আসব। এলেই কিন্তু খাবার চাই। তখন কিন্তু সত্যিই খুব খিদে লাগবে।
কাকিমাকে এটুকু বলে লতিকা অন্ধকার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments