কাজী নজরুল ইসলাম
বছর বিশ পঁচিশ আগে ‘সীমান্ত গান্ধী’ বলে খ্যাত আবদুল গফফর খান-এর ‘দেশ’ থেকে কয়েকজন আমার কাছে যখন আসেন, তখন স্বাভাবিকভাবে স্বাধীনতা মূল্য হিসাবে দেশবিভাগের প্রসঙ্গ ওঠে (সীমান্ত গান্ধী ১৯৪৭ সালে ক্ষুব্ধ হয়ে গান্ধীজীর কাছে অনুযোগ করেছিলেন যে পাঠানদের তিনি ঠেলে দিয়েছেন ‘নেকড়ে বাঘের মুখে’), আর কথায় কথায় আমার মনে আসে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায় মহাশয়ের ছড়া, “ভুল হয়ে গেছে বিলকুল / আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে / ভাগ হয়নিকো নজরুল!” ছড়া শুনে সীমান্তপ্রদেশের পাঠান স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যে বিমল আনন্দ পেয়েছিলেন তা মনে পড়ছে। অন্নদাবাবুর ছড়ার উদ্ধৃতিতে যদি ভুল করে ফেলে থাকি, তো তার দায় আমার স্মৃতিভ্রংশের।
এরই সঙ্গে মনে আসছে যা আমরা সবাই জানি, তবু বারবার তা স্মরণ করার দাম আছে। এই সেদিন নোবেলজয়ী অর্মত্য সেন-এর মুখে তা শোনা গিয়েছে, আর মনে পড়িয়ে দিয়েচে যে এখনও নানাভাবে আমাদের প্রায় ‘সর্ব কর্ম চিন্তা আর আনন্দের নেতা’ হলেন রবীন্দ্রনাথ, যিনি একই সঙ্গে দুই স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টা। দেশ ভাগ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু নজরুল ‘ভাগ’ হননি, একই সঙ্গে বাংলাদেশের আর পশ্চিমবাংলার হৃদয়ের সম্পদ হয়ে রয়েছেন। আর এটাই সঙ্গত—রবীন্দ্রনাথ যে ‘মহাভারতবর্ষ’-এর কথা বলেছিলেন, যা প্রকৃতপক্ষে সম্ভব হয়েছিল আমাদের এই সুপ্রাচীন দেশে পশ্চিম এশিয়া থেকে আসা ইসলামি তরঙ্গের অভিঘাতে। সেই মহাভারতবর্ষের দীপ্তি বিলীন হলে আমাদের ইতিহাসসঞ্জাত সত্তা বিকৃত হবে, ভবিষ্যত কলুষিত হবে।
সম্প্রতি ‘কবিতা উৎসব’ ইত্যাদি নিয়ে যে আলোড়ন দেখা গেল আর অনুরূপ কয়েকটি উপলক্ষ নিয়ে কাব্যামোদী মহলে প্রায় মাদকতার প্রকাশ (কিছু পরিমাণে সুসঙ্গত হলেও) ঘটিয়েছে, সেই ‘মচ্ছব’-এর চাপে আমরা যে একই সময়ে নজরুল জন্মের শতাব্দীপূর্তি পালন করছি, তা শুধু বিস্মৃত নয়, প্রায় যেন সজ্ঞানে অনাদৃত ও অবহেলিত হয়েছে। স্পষ্টোক্তি অবশ্যই কাম্য, আর শুধু নজরুল কেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে অতিভক্তির প্রাবল্যে ভেসে গিয়ে কঠোর সমালোচনা থেকে বিরত হবার লেশমাত্র বাধ্যবাধকতা নেই, তবে প্রয়োজনে একটু গভীর স্তরে, যথাযথ মর্যাদা দিয়ে আর স্থানকালপাত্র বিবেচনা করে সে কাজে নামা, আমার আশঙ্কা অমূলক হতে পারে, কিন্তু একটু যেন অস্বস্তি বোধ করেছি আর ভবিষ্যৎ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছি দেখে যে, নজরুল বিষয়ে একদা প্রচলিত ‘তলোয়ার দিয়ে দাড়ি কামানোর’ শ্লেষেরই এক অত্যাধুনিক অনতিসূক্ষ্ম পুনরুক্তি আজকের এই বিদগ্ধ অনীহা সৃষ্টি করেছে। ‘কারার এই লৌহকপাট’ (যা আজও মানবজীবনের অভিশাপ) ভাঙবার জন্য যদি ‘হৈদরী হাঁক’ দিতে হয় তো কবিতা কি বাতিল হওয়া অনিবার্য? কবি কি কখনও কম্বুকণ্ঠ হতে পারেন না, ‘নিবিষ্ট’ অনুভূতি প্রকাশ কি প্রায় স্বগতোক্তির ছাড়া সম্ভব নয়? ‘মহাকাল সিংহাসনে সমাসীন বিচারক / শক্তি দাও শক্তি দাও মোরে / কণ্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী/ নারী ঘাতী শিশুঘাতী কুৎসিত বীভৎসা প’রে / ধিক্কার হানিতে পারি যেন’ রবীন্দ্রনাথের এই উচ্চারণ কি ব্যর্থ, বর্জনীয়? বাইবেল্-এর কাহিনীতে Jericho নগরের প্রাকার অতিক্রমের জন্য কি প্রয়োজন হয়নি যথোপযুক্ত তৃর্য নিনাদ? অকালে জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকার অভিশাপ বহন করলেন যে বহু বিচিত্র প্রতিভাধর মানুষটি তার সমগ্র বিক্ষিপ্ত জীবন ও বিপুল কীর্তির কথা স্মরণ করেও এই একান্ত মরমী অর্থাৎ দুঃসাহসিক ও নিয়ত সংগ্রামী বিপ্লবপ্রয়াসী ব্যক্তিত্বের গুণগানে যদি আজ কুণ্ঠা আসে তো প্রত্যবায় ঘটবে, বাঙালির সীমিত আকাশে এক দ্যুতিময় জ্যোতিষ্কেরই (ধূমকেতু নয়) অসম্মান করা হবে।
নজরুল কিছু পরিমাণে এই অসম্মান অনুমান করেই লিখে গেছেন, “পরোয়া করি না বাঁচি কি না বাঁচি / যুগের হুজুগ কেটে গেল / মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি / রযেছে সোনার শত ছেলে / বড়ো কথা বড়ো ভাব আসে নাকো / মাথায় বন্ধু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments