বই
ইউক্রেনের লোককথা
লোককথা কোনো জাতির প্রাণসত্তার বহিঃপ্রকাশ। মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, হাসি-রসিকতা ও জীবনদর্শন এই কাহিনিগুলিতে রূপকথার আবরণে ধরা থাকে। ইউক্রেনের লোককথাগুলোতেও তাই আমরা পাই কৃষক সমাজের চিরচেনা পরিশ্রম, প্রকৃতিপ্রেম, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও সরল মানবিকতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।
ভ্লাদিমির বইকো, যিনি একজন ভাষাবিদ্যার ডক্টর, সুদীর্ঘকাল ধরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই কাহিনিগুলো সংগ্রহ ও সংকলন করেছেন। ননী ভৌমিক এগুলো রুশ ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন এমনভাবে, যাতে মূল স্বাদের কোনো ক্ষতি না হয়। আর ব্লাদিমির গর্দিচুকের শিল্পকর্ম কাহিনিগুলোকে দিয়েছে প্রাণবন্ত ভিজ্যুয়াল মাত্রা।
সোভিয়েত ইউনিয়নের রাদুগা প্রকাশন ১৯৮৮ সালে বইটি প্রকাশ করে। এই সংকলন শুধু শিশু-কিশোরদের জন্য বিনোদন নয়, বরং যে-কোনো পাঠকের কাছে ইউক্রেনীয় সংস্কৃতি ও লোকজ কল্পনার এক অনন্য জানালা।
-
বহুকাল আগে নিঝুম বনের মধ্যে দেখা দিল এক সিংহ, এমন সে জাঁদরেল আর ভয়ংকর যে একবার গর্জন করলেই সমস্ত জন্তু-জানোয়ার ভয়ে কাঁপত বেতস পাতার মতো। আর যখন শিকারে বেরত, সামনে যে পড়ত, তাকেই কামড়ে কুটিকুটি করত। বনশুয়োরদের পালে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাইকে মেরে ফেলত, আর খাবার জন্যে রাখত কেবল একটাকে। ভারি ভয় পেয়ে গেল জন্তুরা, ভেবে পায় না কী করে। সবাই জুটল পরামর্শ করতে।
ভালুক তখন বললে: ‘শোনো, মশাইরা, এমন দিন যায় না যে সিংহ গোটা দশেক করে জন্তু না মারে, কখনো কখনো বিশটাও। আর খায় কেবল একটা-দুটো, বাকিগুলো খামকা মরছে, কেননা রোজ সে নতুন নতুন ধরছে, আগের দিনে মারা জন্তু
-
তীরের কাছে ভাসছিল মরাল। ঘাড় বাঁকিয়ে সে জল দেখছিল। কাছেই ছিল একটা বোয়াল মাছ। মাছটা জিগ্যেস করলে: ‘আচ্ছা বলো তো, নদী জমে গেলে তুমি কোথায় উড়ে যাও?’
‘তা জেনে তোমার কী লাভ?’
‘শীতকালে কোথাও পালিয়ে থাকতে চাই। নইলে জমা বরফের তলে তাজা বাতাস থাকে না, দম আটকে মরি।’
‘শীতকালে আমি উড়ে যাই গরম দেশে, বসন্ত পর্যন্ত সেখানে থাকি।’
বোয়াল বললে, ‘আমাকেও সেখানে নিয়ে চলো।’
‘তা বেশ! যদি চাও, একসঙ্গেই উড়ে যাব। সঙ্গী থাকলে ভালোই কাটবে।’
কথাবার্তাটা কানে গেল চিংড়ির। বললে: ‘আমাকেও সঙ্গে নাও।’
‘তা বেশ! তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে, আনন্দে কাটবে। শরৎ পর্যন্ত এখানে থাকব, বলব কখন উড়ে যেতে হবে।’
-
বনের পশুরা একদিন জুটে পরামর্শ করতে লাগল কাকে রাজা করা যায়, সবাই যাকে কেবল ভয়ই করবে না, ন্যায্য বিচারক বলে মান্যও করবে। কিন্তু রাজা ঠিক করা গেল না—জমায়েতে সবাই আসে নি: সবচেয়ে বড়োসড়ো বলবান জন্তুরাই হাজির ছিল না। তখন ঠিক হল আবার সবাইকে ডাকা হবে―ছোটো থেকে বড়ো পর্যন্ত সবাইকে, যাতে ব্যাপারটা চুকে যায়।
সব জন্তুই এল সেদিন। ছিল: হাতি, সিংহ, বাঘ, জলহস্তী, গণ্ডার, ভালুক, নেকড়ে, হরিণ, উট, শেয়াল, খরগোশ, বনশুয়োর, জেব্রা, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া, গরু, কুকুর, বেড়াল, মেরু-বেড়াল, ধেড়ে ইঁদুর, নেংটি ইঁদুর, যতরকম জন্তু ছিল দুনিয়ায়; বলতে-কি গাধাও বাদ যায় নি।
সবাই যখন জুটল, প্রথম কথা বলতে শুরু করল হরিণ:
-
এক-যে ছিল বুড়ো আর বুড়ি। বুড়ো হল কিন্তু ছেলেপুলে নেই ৷ কষ্ট হয়, দুঃখ, করে, ‘বুড়ো বয়সে কে আমাদের দেখবে? মরণকালে কে আমাদের পাশে থাকবে?” বুড়োকে বুড়ি বলে: ‘বনে যাও গো, আমার জন্যে একটা কাঠের পায়া আর একটা দোলনা বানিয়ে দাও; পায়াটাকে দোলনায় রেখে দোলাব। অন্তত খানিক মন-ভুলানি তো হবে।’
বুড়ো প্রথমটা গা করে নি, বুড়ি কিন্তু কেবলি মিনতি করে; শেষ পর্যন্ত বুড়ো শুনল তার কথা, বনে গেল। কাঠের একটা পায়া চেঁছে তুলল, দোলনা বানাল। বুড়ি পায়াটাকে দোলনায় রেখে দোলায় আর গুনগুন করে:
তেলেসিক, যাদু আমার,
রেঁধেছি তোর জইয়ের মাড়,
রেঁধেছি তুলতুলে খাবার,
তেলেসিক, যাদু আমার!
দোলাতে, দোলাতে, শেষে ঘুমিয়ে
-
অনেকদিন আগে, কেউ জানে না কবে, ভরত পাখি ছিল রাজা, আর মূষিকা ছিল রানী। নিজেদের মাঠ ছিল তাদের। গম বুনল তাতে। গম ফলার পর দানা ভাগাভাগি করতে লাগল। কেবল একটা দানা রয়ে গেল বাড়তি। মূষিকা বললে: ‘ওটা আমিই নিই।’
কিন্তু ভরত বলে: ‘না, ওটা আমার।’
‘বেশ, আধাআধি চেরা যাক।’
ভরত পাখি রাজি হল। ভাঙার জন্যে দানায় কামড় দিয়েই-না মূষিকা সেটা মুখে করে পালাল গর্তে। ভরত পাখি তখন জিগির দিলে, মূষিকা রানীর সঙ্গে লড়াইয়ে জড়ো করল বনের সব পাখি, রানী জড়ো করল সব পশুদের, যুদ্ধ বাধল।
লড়াই চলল সারা দিন, সন্ধেয় জিরিয়ে নেবার জন্যে থামল সবাই। মূষিকা রানী তাকিয়ে দেখে, ডাঁশেরা
-
এক-যে ছিল রাখাল ছেলে, একেবারে ছোটোটি থেকে কেবল ভেড়াই চরায়, আর কিছুই করত না, কিছুই জানত না। একদিন আকাশ থেকে পড়ল পাথর, আর পাথর বলতে পাথর—আট মন ভারি। পাথরটা নিয়ে মজা করতে ভালো লাগত রাখাল ছেলের: কখনো সেটা বাঁধত তার পাঁচনবাড়ির সঙ্গে, কখনো আকাশে ছড়ে দিয়ে নিজে ঘুমিয়ে নিত, ঘুম ভেঙে দেখত পাথর তখনো আকাশে, মাটিতে পড়ে নি, আর যেই পড়ত, দেবে যেত মাটিতে।
মা বকাবকি করত: ‘অমন নুড়িপাথর নিয়ে খেলতে হয়? গায়ে আঁচড় লাগবে।’
ও সেসব খেয়ালই করে না।
এখন রাখাল ছেলে যেখানে থাকত, সে রাজ্যের রাজার পেছনে লাগল এক নাগ, এগল রাজধানীর দিকে; মন তিরিশেক ওজনের এক-একটা পাথর
-
অনেক কাল আগে কিয়েভে ছিল এক প্রিন্স। আর কিয়েভের কাছেই থাকত নাগ। প্রতি বছর নাগকে ভেট দিতে হত: হয় কোনো নওল কুমার, নয় কুমারী। তারপরে তো একদিন প্রিন্সের মেয়েকে পাঠাবার পালা এল। করবার কিছু, নেই: প্রজারা পাঠিয়েছে, প্রিন্সকেও পাঠাতে হয়। নিজের মেয়েকে তাই নাগের কাছে ভেট পাঠাল প্রিন্স।
আর মেয়েটি এত সুন্দরী, এত মিষ্টি যে কাহিনীতে বলবার নয়, কলম, দিয়ে লিখবার নয়।
নাগ তার প্রেমে পড়ে গেল। একদিন মেয়েটি তাকে সোহাগ দেখিয়ে শুধাল: ‘আচ্ছা, দুনিয়ায় এমন লোক আছে যে তোমায় হারাতে পারে?’
নাগ বললে, ‘আছে, তেমন একজন আছে কিয়েভে, নিপার নদীর পাড়ে। বাড়িতে যখন আঁচ দেয়, ধোঁয়ায় আকাশ যায় ছেয়ে,
-
সে অনেকদিন আগেকার কথা, আমাদের বাপ-ঠাকুর্দার তখন হয়ত জন্মই হয় নি, সেই সেকালে বৌয়ের সঙ্গে নিজেদের মতো থাকত এক গরিব মানুষ ৷
তাদের ছিল একটি ছেলে, এমন সে টিংটিঙে মরকুটে যে বলবার নয়। কিছু একটা যে করবে, তা করে না, সারা দিন কাটায় চুল্লির ওপরকার মাচায়। মা যদি মাচায় খেতে দেয় খায়, না দেয় তো না খেয়েই পড়ে থাকে, আঙুলে কুটোটি নাড়ে না।
মা-বাপে বলে: ‘তোকে নিয়ে কী করি বাছা, তোকে নিয়েই আমাদের জ্বালা। সব ছেলেমেয়েই তো তাদের মা-বাপের কত কাজ করে দেয়, আর তুই কেবল রুটির ভুট্টিনাশ করিস!’
দঃখু করে, দুঃখু করে, শেষে বুড়ি একদিন বললে: ‘কী তুমি ভাবছ
-
ছিল একজন লোক। তার ছয় ছেলে, একটি মেয়ে।
গেল তারা জমি চষতে, বোনকে বললে যেন খাবার নিয়ে যায়। বোন বললে: ‘কিন্তু কোথায় তোমরা চষবে? আমি তো জানি না।’
ওরা বললে: ‘যেখানে চষব, বাড়ি থেকে সে জায়গাটা পর্যন্ত ফালের দাগ দিয়ে যাব। তুই সেই দাগ ধরে চলে যাবি।’
এই বলে চলে গেল তারা।
এখন সেই মাঠের কাছে বনে এক নাগ থাকত ৷
দাগটা সে বুজিয়ে দিতে শুরু করল। আর নিজে তার বদলে আরেকটা দাগ টেনে নিয়ে গেল তার নিজের পুরী পর্যন্ত।
মেয়েটি এদিকে ভাইদের জন্যে খাবার নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল সেই দাগ ধরে।
যেতে যেতে যেতে গিয়ে পৌঁছল একেবারে নাগের আঙিনায়।
-
সে অনেককাল আগের কথা, ভয়ংকর এক নাগ হানা দিতে লাগল এক বসতিতে। সবাইকে সে খেয়ে উজাড় করল, রইল শুধু এক বুড়ো।
নাগ ঠিক করল, ‘তা এটাকে কাল খাওয়া যাবে।’
এইসময় কাঙাল এক ছোকরা যাচ্ছিল বসতি দিয়ে। গিয়ে তো উঠল সেই বুড়োর কাছে, রাত কাটাতে চাইল সেখানে।
বুড়ো শুধায়, ‘জীবনে তোর ঘেন্না ধরে গেল নাকি?
‘কেন?’ বলে সেই কাঙাল ছোকরা।
বুড়ো তখন তাকে বলতে লাগল যে নাগ সেখানকার সবাইকে খেয়ে উজাড় করেছে, কাল তাকে খাবার কথা ভাবছে।
ছোকরা বললে, ‘ও কিছু, না, নিজেই গলায় ঠেকে মরবে।’
সকালে তো উড়ে এল নাগ, ছোকরাকে দেখে ভারি তার আনন্দ : “মন্দ নয় তো! ছিল
-
অনেক কাল আগে ছিল এক রাজা আর রানী।
বয়সকালে তাদের ছেলেপুলে হয় নি, তবে বুড়ো বয়সে হল একটি ছেলে। তাকে দেখে দেখে আর আনন্দ ধরে না।
যখন সে বড়ো হয়ে উঠল, ঠিক করল তার বিয়ে দেবে। ছেলে কিন্তু বলে: ‘যতদিন না আমায় এমন একটা ঘোড়া দিচ্ছ যা আগুন খায়, শিখায় চুমুক দেয়, ছুটলে বিশ যোজন অবধি মাটি কাঁপে, ওকগাছের পাতা ঝরে পড়ে, ততদিন বিয়ে করব না।’
রাজা তার মহাবীরদের ডেকে জিগ্যেস করতে লাগল: ‘হয়ত তোমাদের কেউ জানো, কেউ শুনেছ কোথায় এমন ঘোড়া যা আগুন খায়, শিখায় চুমুক দেয়, ছুটলে বিশ যোজন অবধি মাটি কাঁপে, ওকগাছের পাতা ঝরে পড়ে?’
সবাই বললে
-
এক-যে ছিল বুড়ো আর বুড়ি। বড়ো গরিব তারা। বুড়ি একদিন বললে: ‘তুমি বুড়ো বনে গিয়ে কিছু লাইম কাঠ কেটে আনলেও তো পার। আঁচ দেবার মতো তো কিছু থাকবে।’
বুড়ো বললে, ‘বেশ।’ কুড়ুল নিয়ে চলে গেল বনে।
বুড়ো তো এল বনে। একটা লাইম গাছ বেছে নিয়ে কাটবার জন্যে যেই কুড়ল হাঁকিয়েছে, হঠাৎ শোনে মানুষের ভাষায় লাইম বলছে: ‘হেই গো, ভালো মানুষ, কেটো না আমায়, তোমার বিপদে কাজে লাগব।’
ভয়ে বুড়োর হাত থেকে কুড়ুল খসে পড়ল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবল কিছুক্ষণ, তারপর ফিরে গেল বাড়ি।
বাড়ি এসে বললে কী ঘটেছিল। বুড়ি কিন্তু বলে: ‘আহ্ কী বোকা তুমি? এক্ষুনি লাইম গাছের কাছে গিয়ে বলো
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.