কিরিল চামার
অনেক কাল আগে কিয়েভে ছিল এক প্রিন্স। আর কিয়েভের কাছেই থাকত নাগ। প্রতি বছর নাগকে ভেট দিতে হত: হয় কোনো নওল কুমার, নয় কুমারী। তারপরে তো একদিন প্রিন্সের মেয়েকে পাঠাবার পালা এল। করবার কিছু, নেই: প্রজারা পাঠিয়েছে, প্রিন্সকেও পাঠাতে হয়। নিজের মেয়েকে তাই নাগের কাছে ভেট পাঠাল প্রিন্স।
আর মেয়েটি এত সুন্দরী, এত মিষ্টি যে কাহিনীতে বলবার নয়, কলম, দিয়ে লিখবার নয়।
নাগ তার প্রেমে পড়ে গেল। একদিন মেয়েটি তাকে সোহাগ দেখিয়ে শুধাল: ‘আচ্ছা, দুনিয়ায় এমন লোক আছে যে তোমায় হারাতে পারে?’
নাগ বললে, ‘আছে, তেমন একজন আছে কিয়েভে, নিপার নদীর পাড়ে। বাড়িতে যখন আঁচ দেয়, ধোঁয়ায় আকাশ যায় ছেয়ে, আর নদীতে যখন চামড়া ভেজাবার জন্যে বেরয়, সে তো চামড়ার কাজ করে, চামার, তখন একটা নয়, একসঙ্গে নিয়ে যায় বারোটা গরুর চামড়া। নিপারের জলে চামড়া ফুলে ওঠে। আমি একবার চামড়া টেনে ধরেছিলাম, ওর তাতে কিছু, এসে যায় না: এমন টান দেয় যে আমাকে সমেতই পাড়ে টেনে তোলে আর-কি। কেবল এই লোকটাকেই আমি ভয় পাই।’
কন্যে কেবলি ভাবে কী করে এই খবরটা বাড়ি পাঠানো যায়, মুক্তি পেয়ে যাওয়া যায় বাবার কাছে। তার আশেপাশে জনপ্রাণী নেই, কেবল একটি পায়রা ছাড়া। সুখের দিনে কিয়েভে থাকতে তাকে সে পুষেছিল। অনেক ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত চিঠি লিখল বাবাকে: ‘হেন তেন সব লিখে তারপর জানায়, তোমাদের ওখানে, বাবা, কিয়েভে একটি লোক আছে, নাম তার কিরিল, লোকে ডাকে কিরিল চামার বলে। বুড়ো লোকেদের দিয়ে ওকে বলে পাঠাও, নাগের সঙ্গে লড়ে আমায়, এই অভাগিনীকে সে কি বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিতে চায় না? আমার আপনার লোক, বাবা আমার, মিনতি করো ওর কাছে, কথা বার্তা বলে, ধনদৌলত দিয়ে। চলনে বলনে কোনো ঘাট হলে সে যেন মনে পুষে না রাখে, রাগ না করে। তোমার জন্যে, ওর জন্যে আমি সারা জীবন প্রার্থনা করব ভগবানের কাছে।’
এইসব লিখে পায়রার ডানার তলে চিঠিটা বেঁধে পায়রাকে উড়িয়ে দিল জানলা দিয়ে। মেঘের কোলে উড়ে গিয়ে পায়রা পৌঁছল প্রিন্সের আঙিনায়। ছেলেমেয়েরা দেখতে পেল পায়রাকে।
চোঁচাতে লাগল, ‘বাবা, বাবা, দেখ, দেখ, দিদির কাছ থেকে পায়রা এসেছে।’
প্রিন্সের প্রথমটা আনন্দ হয়েছিল, তারপর ভেবেচিন্তে দেখে মন খারাপ হয়ে গেল: ‘হতচ্ছাড়া পাষণ্ডটা আমার খুকিকে বুঝি মেরেই ফেলেছে।’ তাহলেও পায়রাকে হাতছানি দিয়ে ডাকল, দেখে তার ডানার নিচে চিঠি।
সেটা নিয়ে সে পড়ল: হেন, তেন, যাসব লিখেছে মেয়ে। অমনি সে তলব করল সমস্ত পাত্রমিত্র, মণ্ডলদের: ‘এমন কেউ কি আছে, লোকে যাকে কিরিল চামার বলে ডাকে?’
‘আছে প্রিন্স, থাকে নিপার পাড়ে।’
‘কী করে ওর মন পাওয়া যায় যাতে রাগ না করে, সব কথা শোনে?’ নানান সলাপরামর্শ করল তারা, তারপর পাঠাল সবচেয়ে বুড়ো লোকদের। এল তারা তার কুটিরে, ভয়ে ভয়ে দরজা একটু ফাঁক করেই একেবারে আঁতকে উঠল। দেখে: তাদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে মেঝের ওপর বসে আছে খোদ চামার, হাত দিয়ে বারোটা চামড়া ডলছে। যারা এসেছিল, তাদের একজন ‘খ্যাক’ করে কেসে ফেলল৷
চমকে উঠল চামার, বারোটা চামড়াই ‘ফড়ড়, ফড়ড়’ করে ফেটে গেল। ফিরে চাইল চামার, ওরা একেবারে হাঁটু গেড়ে বসে। মাথা নোয়ায়, বলে, এই হয়েছে, সেই হয়েছে, প্রিন্স তোমার কাছে মিনতি করে পাঠিয়েছে। ও একেবারে চেয়েও দেখতে চায় না, কানেও তুলতে চায় না: রেগে আগুন কেননা বারোটা চামড়া ফেড়ে গেল ওদের জন্যে।
ওরা আবার মিনতি শুরু করল, সাধাসাধি করল, হাতে পায়ে ধরল। ও শুনতেই চায় না। সাধ্যিসাধনা করে করে শেষ পর্যন্ত চলে গেল মাথা নিচু করে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments