উহ্
সে অনেকদিন আগেকার কথা, আমাদের বাপ-ঠাকুর্দার তখন হয়ত জন্মই হয় নি, সেই সেকালে বৌয়ের সঙ্গে নিজেদের মতো থাকত এক গরিব মানুষ ৷
তাদের ছিল একটি ছেলে, এমন সে টিংটিঙে মরকুটে যে বলবার নয়। কিছু একটা যে করবে, তা করে না, সারা দিন কাটায় চুল্লির ওপরকার মাচায়। মা যদি মাচায় খেতে দেয় খায়, না দেয় তো না খেয়েই পড়ে থাকে, আঙুলে কুটোটি নাড়ে না।
মা-বাপে বলে: ‘তোকে নিয়ে কী করি বাছা, তোকে নিয়েই আমাদের জ্বালা। সব ছেলেমেয়েই তো তাদের মা-বাপের কত কাজ করে দেয়, আর তুই কেবল রুটির ভুট্টিনাশ করিস!’
দঃখু করে, দুঃখু করে, শেষে বুড়ি একদিন বললে: ‘কী তুমি ভাবছ গো? ছেলের বয়স হল, কোনো কাজকম্ম জানে না। কোথাও ওকে একটা শিক্ষানবিশিতে বা কাজে ঢোকালে তো পারো। পরের ঘরে হয়ত কিছু, একটা শিখে উঠবে।’
বাপ ওকে দিল খেতমজুরিতে।
তিন দিন থাকল সেখানে, তারপর পালাল। এসে উঠল চুল্লির ওপরকার মাচায়, বসে বসে কাটায় সেখানে।
বাপ তাকে মেরে ধরে নিয়ে গেল দর্জির কাছে, তালিম নিক।
সেখান থেকেও সে পালাল। দেওয়া হল কামারের কাছে, মুচির কাছে, কোনোই ফল হল না: ফের পালায়, তারপর ঐ মাচায়। কী করা যায়?
বুড়ো বললে, ‘তুই অমুক, তুই তমুক, তোকে নিয়ে যাব এমন রাজ্যে যেখান থেকে পালাতে পারবি না।’
চলল তারা, চলল কতদিন কে জানে, এল এক অন্ধকার, নিঝুম বনে ৷ হয়রান হয়ে পড়েছিল, দেখে আধপোড়া এক গাছের গুঁড়ি। বুড়ো গুঁড়ির ওপর বসে বললে: ‘উহ্, ভারি জেরবার হয়ে পড়েছি।’
যেই না বলা, অমনি হঠাৎ কে জানে কোথা থেকে হাজির এক ক্ষুদে বুড়ো, একেবারে কোঁচকানো চামড়া, হাঁটু অবধি লম্বা সবুজ দাড়ি।
‘কী চাই হে মনিষ্যি?’
বুড়ো অবাক: কোত্থেকে এল এই বিদঘুটেটা? জিগ্যেস করলে: ‘আমি তোমায় ডেকেছিলাম? সে কী? ’
“ডাকো নি মানে? বসলে গুঁড়ির ওপর, বললে ‘উহ্!’”
“আরে আমি যে ভয়ানক হয়রান হয়ে পড়েছিলাম। তাই বলেছিলাম ‘উহ্!’ কিন্তু তুমি কে?”
‘আমি বনের রাজা উহ্। তুমি চলেছ কোথায়?’
‘যাচ্ছি ছেলেকে কোনো কাজে ঢোকাতে কিংবা তালিমে দিতে। সুজন লোকেদের কাছে। হয়ত এটা সেটা করতে শিখবে, জ্ঞানগম্যি হবে। আর দেশে যেখানেই খাটতে দিই পালিয়ে আসে, সারা দিন মাচায় বসে থাকে।’
‘দাও ওকে আমার কাছে, জ্ঞানগম্যি শেখাব। শুধু কড়ার থাকবে: এক বছর বাদে ছেলের খোঁজে আসবে। ওকে চিনতে পারলে বাড়ি নিয়ে যাবে, না পারলে আরো এক বছর খাটবে আমার কাছে।’
বুড়ো বললে, ‘বেশ।’
হাতে হাতে চাপড় মেরে চুক্তি হল। বুড়ো বাড়ি চলে গেল, ছেলে রইল উহের কাছে।
ছোকরাকে উহ্ নিয়ে গেল নিজের সঙ্গে, অন্য জগতে, মাটির নিচে সোজা পাতালে: তুলল নিজের সবুজ কুঠিতে। সে কুঠিতে সবই সবুজ: দেয়াল সবুজ, বসার চৌকি সবুজ, উহের গিন্নিও সবুজ, ছেলেমেয়েরা সবুজ, চাকরবাকরেরাও সবুজ।
ছোঁড়াটাকে বসিয়ে উহ্, চাকরবাকরদের হকুম দিলে ওকে খাওয়াতে। দিল তাকে বাঁধাকপির সবুজ সুপ আর সবুজে জল। খাওয়া দাওয়া সারল সে।
উহ্, বললে, ‘এবার কাজে যা: কাঠ ফেড়ে ঘরে আনবি।’
গেল ছোঁড়া। রইল পড়ে তার কাঠ ফাড়া, ঘাসের ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
উহ্, এসে দেখে সে ঘুমচ্ছে।
অমনি চাকরবাকরদের ডাকল উহ, হুকুম দিলে কাঠ গাদি করতে, তার ওপর ছোঁড়াকে শুইয়ে আগুন ধরিয়ে দিল।
পুড়ে গেল ছোঁড়া!
ছাইগুলো বাতাসে উড়িয়ে দিল উহ্, একটা পোড়াকাঠ পড়ল ছাই থেকে। তার ওপর জীয়ন জল ছিটিয়ে দিল উহ্—ফের ছোঁড়া বেঁচে উঠল যেন কিছুই হয় নি।
হুকুম দিল তাকে কাঠ ফেড়ে সাজিয়ে রাখতে।
ফের সে ঘুমিয়ে পড়ল ৷
উহ্ আগুন ধরাল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments