কুয়োর ভেতর সিংহ
বহুকাল আগে নিঝুম বনের মধ্যে দেখা দিল এক সিংহ, এমন সে জাঁদরেল আর ভয়ংকর যে একবার গর্জন করলেই সমস্ত জন্তু-জানোয়ার ভয়ে কাঁপত বেতস পাতার মতো। আর যখন শিকারে বেরত, সামনে যে পড়ত, তাকেই কামড়ে কুটিকুটি করত। বনশুয়োরদের পালে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাইকে মেরে ফেলত, আর খাবার জন্যে রাখত কেবল একটাকে। ভারি ভয় পেয়ে গেল জন্তুরা, ভেবে পায় না কী করে। সবাই জুটল পরামর্শ করতে।
ভালুক তখন বললে: ‘শোনো, মশাইরা, এমন দিন যায় না যে সিংহ গোটা দশেক করে জন্তু না মারে, কখনো কখনো বিশটাও। আর খায় কেবল একটা-দুটো, বাকিগুলো খামকা মরছে, কেননা রোজ সে নতুন নতুন ধরছে, আগের দিনে মারা জন্তু খায় না। তাই ওর কাছে দূত পাঠানো যাক, ওকে বোঝানো হোক...’
নেকড়ে বললে, ‘যাও-না, বোঝাবার চেষ্টা করে দ্যাখো, আমাদের কথা সে কানেই তুলবে না ৷’
‘চেষ্টা করে দেখাই যাক-না, হয়ত লেগে যেতেও পারে,’ জেদ ধরল ভালুক, ‘শুধু, আমাদের মধ্যে কাকে পাঠানো যায়?’
‘তুমিই যাও না ভালুক,’ নেকড়ে বললে, ‘আমাদের মধ্যে তুমিই সবচেয়ে বড়োসড়ো, গায়েও জোর বেশি।’
‘কোথায় জোর! যতই হোক ওর সঙ্গে পারা যাবে না, আমার ওপর যদি ঝাঁপিয়েই পড়ে, তাহলে কী হবে আমার গায়ের জোর দিয়ে? বরং নেকড়ে, তুমিই যাও, আমার চেয়ে তুমি চটপটে।’
‘চটপটে হলাম তো কী হয়েছে? যদি আমার পেছু ধরে, ভাবছ পালাতে পারব ওর হাত থেকে? অন্য কিছু, একটা ভেবে বার করা দরকার, গায়ের জোর বা চটপটে দিয়ে কিছ, হবার নয়।’
তখন হরিণ বললে: ‘কী জানো মশাইরা? চাই যুতসই ধরনধারণ, এমনভাবে কথা পাড়া যাতে সিংহ না চটে যায়।’
‘তা তুমি যখন এতই বুদ্ধিমান, তুমিই যাও হরিণ।’
‘আরে না, আমি ও ভার নিতে পারব না। আমি শুধু বলছিলাম যে সিংহের সঙ্গে এমনি এমনি কথা কওয়া যায় না। ও তো আর আমাদের ভাই-বেরাদর নয়। উচিতমতো এগুতে হবে।’
‘তাহলে কাকে পাঠানো যায়?’
‘শেয়ালিকে পাঠানো হোক। ও খুব সেয়ানা, সিংহের মন জোগাতে পারবে, বোঝাবে কী ব্যাপার।’
‘ঠিক বলেছ!’ খুশি হয়ে উঠল জন্তুরা, ‘চলন-বলন, সে শেয়ালির আছে।’
তলব করা হল শেয়ালির, ভালুক তাকে বললে: ‘শেয়ালি, তোমায় সিংহের কাছে গিয়ে কথা বলতে হবে তার সঙ্গে।’
‘কিন্তু আমি কী অপরাধ করলাম? অন্য কেউ যাক। কেউ যেতে রাজি না থাকলে লটারি করা হোক। যার ভাগ্যে পড়বে, সে যাবে, আপত্তি চলবে না।’
'না শেয়ালি, সেটি হবে না: যদি এমন কারো নাম ওঠে যে কথাই বলতে পারে না, কী হবে তাহলে? ভড়কে গিয়ে আজেবাজে কথা বলতে থাকবে, তাতে আরো চটে যাবে সিংহ। না শেয়ালি, আমরা তোমাকে পাঠাব ঠিক করেছি।’
মন খারাপ হয়ে গেল শেয়ালির, ভেবে পায় না কী করে। না গেলেও মরণ, গেলেও ভগবানই জানেন সে কেমন সৌভাগ্য। অনেক ভেবে ভেবে শেষে বললে: ‘বেশ যাব, কপাল ঠুকে দেখি; এই আমার বরাত…’
অনেকখন বনে ঘুরে বেড়াল শেয়ালি, কেবলি ভয় পায় যেতে। কখনো এদিকে যায়, কখনো ওদিকে যায়, কেবলি ভাবে কেমন করে ঠকানো যায় সিংহকে। মরতে তার ভারি ভয়। হঠাৎ দেখতে পেল একটা কুয়ো। ঠিক করল, ‘রক্তখোর সিংহের মুখে জীবন্ত পড়ার চেয়ে ডুবে মরাই বরং ভালো।’
কুয়োর কাছে গেল শেয়ালি, ঘুরে দেখল তার চারদিকে, শুঁকল, তাকাল কুয়োর মধ্যে—একেবারে গভীর জল। চেয়ে রইল সেদিকে, কুয়ো থেকেও তার দিকে চেয়ে থাকে এক শেয়ালি। প্রথমটা সে ধরতে পারে নি যে ওটা তার ছায়া। মুখ ভেংচাল সে তার জবাবে অন্য শেয়ালিও মুখ ভেংচায়। জিব দেখাল সে, ওটাও জিব দেখায়। ‘আরে, দাঁড়া, দাঁড়া!
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments