বই
অগ্রন্থিত গল্পাবলি
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র জীবৎকালে তাঁর তৃতীয় কোনো গল্পগ্রন্থ বেরয়নি। সাংবাদিক গবেষক সৈয়দ আবদুল মকসুদ ও অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন অন্তত ৩২টি অগ্রন্থিত গল্প খুঁজে পেয়েছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র। লক্ষ করা যাচ্ছে, এদের সবই প্রায় চল্লিশের দশকে ‘সওগাত’ ও ‘মোহাম্মদী’-তে প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ ‘নয়নচারা’র যুগের রচনা এগুলো। স্বাভাবিক নিয়মে এসব গল্প নিয়ে এক বা একাধিক সংকলন প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ হয়নি।
-
কত গভীর রাতে আফজল রাতের নিঃশব্দতায় কান পেতে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। এবং কখনো- কখনো মনে হয়েছে রাতের উত্তুঙ্গ শিখরে দাঁড়িয়ে তারাময় দেয়ালে হেলান দিয়ে সে চেয়ে রয়েছে নিশ্ছিদ্র অতল অন্ধকারের পানে, তারপর মনটা শূন্য হয়ে উঠে ঐ অন্ধকারের, যে-অনুবন্ধী অন্ধকার চিহ্নশূন্য অথচ অবান্তর নয়, সে অন্ধকারের ক্ষুদ্রতম কণাতম অংশই যথেষ্ট তার সীমাহীনতার প্রমাণ দিতে সে অন্ধকারের মতোই হয়ে উঠেছে।
অথচ তারাময় দেয়ালে হেলান দিয়ে অন্ধকারের পানে সে চেয়ে দেখছে। পেছনে তাহলে বিন্দু-বিন্দু যে-আলোর কণা ছড়িয়ে ছিল, তা কি মহাআলোর বিনয়? থেকে-থেকে কাঁটার মতো বিদ্রোহী মনোভাব খুঁচিয়ে উঠেছে। কী একটা সংগ্রাম। সংগ্রাম!
এবং অনেক রাত ঠেকেছে বিভীষিকাময়।
অথচ সে-বিভীষিকায় নেশা।
শারদীয়
-
ক-দিন হল সামনের বাগান ও লনওয়ালা দোতলা বাড়ির মালিকরা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে। তাদের আগমনে খালি পড়ে থাকা মৃতপ্রায় সে বাড়িটা হঠাৎ প্রাণ পেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠল। শুধু প্রাণ তো নয়, দীপ্ত যৌবনেরও আবির্ভাব ঘটেছে বলা যেতে পারে। রাতারাতি আচমকা পরিবর্তন ঘটে গেল সে-বাড়িটায়। দরজা-জানলায় ঝুলতে লাগল রঙিন পর্দা, মোটা ও ভারি এবং আমেঝে পর্যন্ত ঝোলানো, আবার কোনোটা পাতলা ঝিরঝিরে। সিঁড়ি, রেলিং ও বারান্দার প্রান্তের ওপর-নিচ পূর্ণ হয়ে উঠল নানারঙা ফুল ও পাতাগাছের টবে-টবে। তাছাড়া কখনো পিয়ানোর ও রেডিয়োর আওয়াজে, কখনো উচ্চকলহাসিতে অহরহ মুখর হয়ে উঠল গোটা বাড়িটা।
মালিকদের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে সেলিমা উত্তরের গরাদ-দেয়া কিছু-ভাঙা জানলাটার পাশে কাজের ফাঁকে
-
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি নাবল দেখে কামরুল হাসান পা-দুটো গুটিয়ে বসল, তারপর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে হঠাৎ বললে: বুঝেছ, কালচার জিনিসটার যেন একটা গন্ধ আছে যা নাকে এসে লাগে। আর সে গন্ধ রজনীগন্ধার বা হানাহানার গন্ধ নয়, অনেকটা যেন ভালো পাতিনেবুর গন্ধের মতো। আর রং? রংটাও বসরা গোলাপ, সূর্যমুখী-রক্তজবা ইত্যাদির মতো অমন চোখ-ধাঁধানো জলুস তীব্র গোছের নয়, অনেকটা যেন, চাঁদনিরাতের আকাশের বিচিত্র নীলিমার মতো।
বলে কামরুল চোখ বুজল, বুজে আরেকটা কড়া টান দিলে সিগ্রেটে। আসর আজকে জমল না; অসময়ে হঠাৎ বর্ষার জন্যেই এল না কেউ। তবু কামরুলের ভাগ্য ভালো যে, রাসেল (অর্থাৎ রসুল) এসেছে। রসুলের নাম রাসেল হয়েছে তার ঘোরতর চার্চ-প্রীতি থেকে।
-
একটু ঘুম এলেই গলায় শ্লেষ্মা ঘন হয়ে ওঠে। আবার কালুর ঘুম ভেঙে গেল, একটা বিদ্ঘুটে আওয়াজ করে সে চোখ মেলে তাকালে অন্ধকারের পানে। কেমন ঘুটঘুটে ঘন অন্ধকার, তাকালে মনে হয় যেন চোখই নেই, কোটর দুটো শূন্য—ওই অন্ধকারের মতো কালো।
মশার আওয়াজ তীক্ষ্ণতম হয়ে উঠেছে, ওদের রাজ্যে যেন হিংস্র-উল্লাসের বন্যা এসেছে। কিন্তু তবু ঘুমোতে হবে, ঘুমোতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আবার গলা বেয়ে শ্লেষ্মা ঠেলে উঠে শ্বসনে ব্যাঘাত জন্মায়। কালু এবার ওপাশ ফিরে শুল। কিন্তু পা-দুটো টেনেছে কী অমনি তাতে কী যেন ঠেকল, ঠাণ্ডা আর কিছু নরম।
—কে ওখানে, কে?
কে কখন পায়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছে, কুষ্ঠরোগী না ক্ষয়কাশরোগী—খোদা জানেন। কোনো
-
পদ্মাতে নতুন পানির শোরগোল পড়ে গেছে। পদ্মা নিজেকে বিস্তীর্ণ করেছে, যে জমিগুলো কোনো প্রকারে মাথা জাগিয়ে রোদ পোহানো কুমিরের মতো সূর্যের তলে নিজেকে প্ৰকাশ করেছিল, সে-গুলো আবার ঢেকে দিচ্ছে; কিন্তু ভাসিয়ে নিচ্ছে, আর দু-ধারের দুই দিগন্ত স্পর্শ করবার ব্যাকুলতা নিয়ে সে মুহূর্তে মুহূর্তে নিজের সবল দেহ প্রসারিত করছে, ফুলে-ফুলে গর্জে-গর্জে হিংস্র ঔদার্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ওধারে ঘোলাটে আকাশে কেমন হাওয়া। থেকে থেকে সে হাওয়া এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, মনিরুদ্দিনের ঘাসী নৌকাটা কাত হয়ে ওঠে। হাল ধরছে সে নিজেই, মাঝি দুটো ছইয়ের এধারে উবু হয়ে বসে রাতের রান্নার ব্যবস্থা করছে। ছইয়ের ভেতরে ওদিকটায় দুটি প্রাণী—স্বামী আর স্ত্রী; তারা যাত্রী। কলকাতা থেকে
-
খান সাহেব বদরুদ্দিন সেকেলে মানুষ। যে-যুগে তিনি অধ্যয়ন শেষ করেছেন তখন ডিপুটি মুনসেফ হওয়াটা প্রায় রাজা-বাদশা হওয়ার মতো ছিল মুসলমান সমাজে, এবং কর্তৃপক্ষরা কোনো প্রকারে চলনসই লোক পেলে এসব সরকারি চাকরিতে নিয়ে নিতেন; কাজেই তিনি যে মফস্বল শহরের একপ্রান্তে টিন-তর্জার ঘরে মক্কেলদের আশায় ওকালতি-ব্যবসা ফাঁদলেন তা সে-পথের মোহেও নয়, সরকারি গোলামি না করে স্বাধীন থাকবার প্রেরণায়ও নয়। বস্তুত কোনো পথ ছিল [না] বলেই এবং মেসের বাড়িতে থেকে চৌকিতে মোটা বালিশে তেল চকচকে আশৈশব থলথলে শরীরটা এলিয়ে বার কয়েক চেষ্টার পর আইন পরীক্ষার শেষ-তোরণ অতিক্রম করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি ওকালতির পথ ধরেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত কিন্তু ব্যবসা মন্দ ফাঁদেন নি। মক্কেলরা ক্রমশ
-
স্যাতস্যাতে দিনে মনটাও কেমন ভিজে ভিজে হয়ে ওঠে। কেবল বৃষ্টি আর বৃষ্টি, ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটছে সর্বক্ষণ, তবু মেঘের যেন অন্ত নেই। কাছারির ওধারে বড় পুকুরটা কানায় কানায় টলোমলো; আর ওধারের কাঁচা রাস্তাটায় কাদা ছাড়া কিছু নেই। কখনো একটা কিংবা দুটো জানলা-তোলা গাড়ি যাবে, অথবা একটা-দুটো লোক। কারো ছাতি আছে, কারো নেই। কিন্তু জুতো নেই কারো পায়ে। কাদা আর পানি রাস্তায়, জুতো সেখানে চলে না, খালি পায়েও অতি সাবধানে পা টিপে টিপে চলতে হয়-পিচ্ছিল কাদায় একবার পিছলে গেলে দেহের আর কিছু থাকবে না।
খড়খড়িটা তুলে করিমন পথ দেখছিল। ঘরে আবছা অন্ধকার, তোলা-খড়খড়ি দিয়ে যা বা ম্লান আলো আসছে, সে-আলো তার মুখে
-
মাত্র দু-বছরের কথা, কেন মনে থাকবে না। দিনেরবেলা মেঘ করেছিল, কিন্তু সারাদিনেও একটু বৃষ্টি হয় নি। বিকেলের দিকে রামধনু উঠেছিল। ছেলেমেয়েরা ছায়াপথে সূর্যের ঝিকিমিকি হলদে আলো দেখে লাফায়, ফানুস দেখে হররা তোলে, রামধনু দেখে-তো নাচবেই। তারা নেচেছিল উঠানে দাঁড়িয়ে একযোগে হররা তুলেছিল। আনিসা বউ হলে কী হবে, সে-ও পেছনে উঠানে বেরিয়ে খানিক চেঁচামেচি করেছিল। ঘরে মুরুদ্ধি অনেক। তাঁরা ভারিক্কি লোক। পুরুষদের মধ্যে গোরাবিবি লম্বায় ততটা না হলেও প্রস্থে অনেক। তা বলে তাঁরা কেউ যে কানপাতলা লোক নন, তা নয়। কাজেই আনিসার শাস্তি হয়েছিল।
তবে সেই প্রথম শাস্তি। শুধু যে শাস্তি পেয়ে আসামি খালাস তা নয়। সে-দিন থেকে তাকে ঢুকতে হল
-
ফনুর একটা মস্ত সুবিধা। সেটা হল তার নানিবাড়ি। নানিবাড়ি তো নয় যেন সত্যিকার কেল্লা। গোটাকয়েক আম-জাম-লিচুগাছ আর কেমন জাতছাড়া হলদে রঙের বাঁশঝাড়ের পাশে নানির যে-ক্ষুদ্র বাড়িটি, সেটাই হল তার বিপদ-আপদের রক্ষাদুর্গ; এবং এ-রক্ষাদুর্গ থাকতে তার দুনিয়ায় ভয় নাই কিছুকে—এমন কি বাপের ঠেঙানিকেও না। মাঝে-মাঝে অবশ্য উঁই ফুঁড়ে যেন মছিবত ছোবল তুলে দাঁড়ায়। তখন আথালি পাথালি ছুটেও দিশে পাওয়া যায় না, নানির বাড়ির কেল্লা রীতিমতো চোখে সর্ষে হয়ে ফোটে তখন। এমন মছিবতের সম্মুখীন হলে অন্য কেউ হয়তো ঠাণ্ডা হয়ে যেত, কিন্তু ফনুর পেটে অহরহ শয়তান গুঁতায়, যে-গুঁতুনি আবার নানির বাড়ির কেল্লার নিশ্চিন্ত আরামে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে ওঠে।
কেল্লায় গা-ঢাকা দিয়ে থাকাকালে একদিন
-
চৈত্রের শেষে পল্লবশূন্য গাছে-গাছে নতুন সবুজ কচিপাতা গজিয়ে ওঠবার আগেই সাঈদের মেয়াদ ফুরিয়ে এল। তার অস্থায়ী পোস্টাফিসের চাকরিটির নির্দিষ্ট সময় উতরে গেলে। এবার তার যাবার পালা।
যে-দিন সাঈদ তার কর্মস্থল ত্যাগ করে বাড়ি চলে যাবে, সে-দিন অতি প্রভাতে সে বিছানা ছেড়ে উঠল। উঠে ধীরে-ধীরে জানলার কাছে গিয়ে গরাদ ধরে দাঁড়ালে। তার ঋজু পাতলা দেহে তখনো ঘুমের জড়িমা: তার পদ্মের মতো চোখ দুটি তখনো নিদ্রালস। জানলার নিচেটা নানারকম ফুলের গাছে পরিপূর্ণ; তারই মিষ্টিমধুর গন্ধে সাঈদের নাক ভরে উঠল। বাইরে আকাশে আলো ফুটেছে, কিন্তু সে-আলোতে রক্তাভা নেই: আছে একটা বিস্তৃত পবিত্র সুনির্মল স্নিগ্ধতা। দূরের জিনিস আবছা-আবছা দেখাচ্ছে, যেন পৃথিবীর গায়ে কুয়াশা। আর
-
দূরে সবুজ বনরেখা। সে বনরেখার পেছনে যে নীল পাহাড়গুলো দিগন্তরেখায় ঢেউ তুলে সারি-সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাহাড়িরা বলে সেখানে নাকি একটি স্বচ্ছ জলের গভীর হ্রদ আছে, যার চারিধারে প্রাচীর সৃষ্টি করে ভিড় করে রয়েছে দীর্ঘ ঘন সন্নিবদ্ধ পাইন-বৃক্ষ। ওই সবুজ বনরেখা পেরিয়ে সেই স্বচ্ছ জলের হ্রদের তীরে—জড়াজড়ি-হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘন পাইনের বন ঘেঁষে আজ সকালে এক ঝাঁক নাম-না-জানা হলদে পাখি উড়ে গেল।
হলদে পাখির ঝাঁক উড়ে গেল, সকালের নম্র স্নিগ্ধ সোনালি রোদের ভেতর দিয়ে মনির তা-ই চেয়ে চেয়ে দেখেছে, অলস কান পেতে শুনেছে তাদের পাখার সম্মিলিত অস্ফুট ধ্বনি, আর চলতে-চলতে হোঁচট খেয়েছে। বনের অন্তরালে ওরা মিলিয়ে গেলে পাহাড়ের ওপরে ঝাউগাছটার তলে
-
আজ সন্ধ্যায় উত্তর আকাশের মেঘগুলো নীলাভ হয়ে উঠেছে, আর তাই চেয়ে-চেয়ে দেখে আরশেদ হামেদের স্বচ্ছ চোখও যেন নীলাভ হয়ে উঠল। হাতে তার একটা রক্তজবা, গাঢ় লাল তার রং। পাশের ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা যে-ক্ষীণাঙ্গী মেয়েটি বসে ছিল নীরবে, তার পানে চেয়ে সে বললে: ‘ওই যে নীল মেঘগুলো—স্নেহের মতো নরম কোমল নীলাভ মেঘগুলো, ওইগুলো দেখে হঠাৎ একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল, ভারি দুঃখময় সে ঘটনাটি। শুনবে?... বলছি, আগে এই ফুলটি নাও।’
মেয়েটির সরু-সরু আঙ্গুলগুলো কোমল আর দীর্ঘ, সে-আঙ্গুলগুলো দিয়ে সে হামেদের হাত হতে আস্তে ফুলটি নিলে, নিয়ে মাথা নিচু করে কেমন করে সেটা খোঁপায় গুঁজে দিলে।
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
আর্কাইভ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.