বংশের জের

মাত্র দু-বছরের কথা, কেন মনে থাকবে না। দিনেরবেলা মেঘ করেছিল, কিন্তু সারাদিনেও একটু বৃষ্টি হয় নি। বিকেলের দিকে রামধনু উঠেছিল। ছেলেমেয়েরা ছায়াপথে সূর্যের ঝিকিমিকি হলদে আলো দেখে লাফায়, ফানুস দেখে হররা তোলে, রামধনু দেখে-তো নাচবেই। তারা নেচেছিল উঠানে দাঁড়িয়ে একযোগে হররা তুলেছিল। আনিসা বউ হলে কী হবে, সে-ও পেছনে উঠানে বেরিয়ে খানিক চেঁচামেচি করেছিল। ঘরে মুরুদ্ধি অনেক। তাঁরা ভারিক্কি লোক। পুরুষদের মধ্যে গোরাবিবি লম্বায় ততটা না হলেও প্রস্থে অনেক। তা বলে তাঁরা কেউ যে কানপাতলা লোক নন, তা নয়। কাজেই আনিসার শাস্তি হয়েছিল।

তবে সেই প্রথম শাস্তি। শুধু যে শাস্তি পেয়ে আসামি খালাস তা নয়। সে-দিন থেকে তাকে ঢুকতে হল শ্বাসরুদ্ধ-করা ঘেরাটোপে, আর পড়ল আদাড়ের জঞ্জালের পর্যায়ে। তাছাড়া চারধারে সকলের সদা সতর্ক দৃষ্টি।

দুলার নাম কমর। তবে কমর নাম হলেও সে যেমন বদনের আদলে বা রঙে চাঁদের কাছাকাছিও যায় না, তেমনি নতুন দুলা হলেও তার মধ্যে নাই দয়া মায়া-মহব্বতের লেশমাত্র। কিন্তু তা হলে কী হবে। বউ নাচন দিয়ে বাপের বাড়ি যেতে পারে না কারণ ধবালপুরের জমিদারদের মতো ইদানীং আভিজাত্যের পলেস্তারা দেয়া ফোতো নবাব নয় তারা। এককালে এদেশে কত এক হাজারী দু-হাজারী পঞ্চ-হাজারী আমির-ওমরাহ ছিল, কত ধ্বংস হয়ে গেছে জীবিতকালেই। জীবিতকালে যারা যায় নি তারা নির্ঘাত গেছে মৃত্যুর পর। দুস্থ পরিবারবর্গের মধ্যে এমন কেউ থাকে নি যারা বংশপ্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে পারবে। সেই ছিল সেদিনকার নিয়ম, দিল্লির হুকুম। কিন্তু দেশের কানুনকে ফাঁকি দিয়ে টিমটিমে বংশপ্রদীপ পাকেপ্রকারে জ্বালিয়ে রেখে কেউ-কেউ কালের স্রোতে এখনো ভেসে আছে। কত ঝড় গেছে তবু সেকেলে মস্ত ভারি লোহার সিন্দুকটিও পার করে নিয়ে এসেছে নিরাপদে। তবে এত করেও অনেকের সিন্দুকের ভেতরটা ফক্কা মেরেছে, কারো কারো আবার মারে নি। দশম নি ডালা তুললে এখনো সেখানে দু-চারটে আশরাফি বা বিচিত্র কারুকার্যময় হরফের লেখা ফরমান দৃষ্টিগোচর হবে। কারো বা ফরমান ছাড়াও আছে বংশানুক্রমে স্তরে স্তরে লিপিবদ্ধ করা বংশ-ইতিহাস, তার মূলের আর ঘোরালো শাখা-প্রশাখার বিস্তারিত কাহিনী। কার ছেলে সুবেহদারের কাছ থেকে রুপালি কাজ করা সের-আপাহ্ পুরস্কার লাভ করেছিল, কে কবে দিল্লির সৈন্যদের হাতে ওসমান খানের মৃত্যুর সময় সম্রাটের প্রতিনিধির সাহায্যার্থে মহলগিরি, পিয়ারা আর ডিঙির বাহিনী সাজিয়ে ব্রহ্মপুত্রের তীরে নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছিল গোটা একটি কৃষ্ণপক্ষের রাত, কে প্রাদেশিকতার শত্রু ছিল বলে বার ভূঁইঞাদের বিরুদ্ধে লড়েছে সেনাপতি ইহতিমাম খানের সঙ্গে, কে লোকদের আফিং আর ভাং খাইয়ে রাতারাতি খাল খনন করেছে নৌবাহিনীর গতিপথ সুগম করবার জন্য, কার সোনালি পিকদান ছিল, কোন বুজর্গ মানুষের দোয়ায় কে দুইডজন সন্তান লাভ করেছে। কার বৈঠকখানা সজ্জিত ছিল মুসলিমপট্টমের রংদার কাপড়ে, শুধু কোতরা গুড়ের জন্য কার ঘরে ছিল একশোটা ভাঁড়। বংশবৃক্ষ অঙ্কনের সময় আগাছার মতো এমনি অজস্র তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এদের তালিকায়। তা সংরক্ষিত আছে সে সিন্দুকেই। অবশ্য ধবালপুরের চৌধুরীদের বাড়িতেও এমনি একটা সিন্দুক আছে। কিন্তু সেটা কবেকার তা গবেষণার বিষয়। ঘরেরই হোক, এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে তার ভেতরে ফক্কা। চুরিচামারির বা হাতবেহাতির মোহর থাকতে পারে, কিন্তু নেই বংশতালিকা। সেখানেই এরা তাদের ওপর দীর্ঘ দূরত্বে টেক্কা মারে।


এক সময়ে মুখে আলো পড়াতে জেগে উঠে দেখে, লণ্ঠন হাতে তুলে ধরে কমর তাকে চেয়ে-চেয়ে দেখছে। এত কাছে তার মুখ যে, তার উষ্ণ নিশ্বাস আনিসার গাল যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে। তারপর কমরের চোখ দেখে হঠাৎ ভয় পেল সে। রক্তাক্ত, দুটো সাদা পাথর যেন তার চোখ।


এবং সে-জন্যই যুগ যুগ ধরে অতীব মন্দ পড়তার মধ্যেও গোরাবিবির গৌরমুখে অহঙ্কারের ধার, এত বাছাছোঁয়া, এত জাতবিচার। সে জন্যেই

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

৯৯

এক মাস

৯৯

৩০

মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

এ সপ্তাহের জরিপ

Readers Opinion

Editors Choice