ভারতভাগ কি অনিবার্য ছিল?
ভারত সরকারে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়ে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম সাহেব অনুভব করেছিলেন যে সরকারের কার্যকলাপের উপর নজর রাখার জন্য ব্রিটেনের মতো ভারতেরও একটি প্রতিনিধি সভা চাই। No taxation without representation—এই নীতি অনুসারে প্রতিনিধিসভা প্রয়োজন। তিনি সরকারি পদ ছেড়ে দিয়ে ভারতের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে তাঁদের নিয়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরজী, বদরুদ্দিন তৈয়বজী প্রমুখ ভারত বিখ্যাত গুণিজন। এঁদের মতে ব্রিটেনের মতো ভারত একটি নেশন। অতএব ব্রিটেনের মতো ভারতেরও একটি পার্লামেন্ট চাই। সেটি হবে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে যাবতীয় ভারতবাসী দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি সমূহের প্রতিষ্ঠান।
স্যর সৈয়দ আহমদ খান ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন অগ্রগণ্য নেতা। তাঁর সমর্থন চাওয়ায় তিনি বললেন, ভারত একটা নেশনই নয়। তার জন্য একটা পার্লামেন্টের তো কথাই ওঠে না। নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে হিন্দু প্রতিনিধিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন। পরে তাঁরা চাইবেন ইংলন্ডের মতো একটা সরকার গঠন করতে। সেই সরকারে হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে। তাঁদের ভোট বেশি থাকায় তাঁরা যা বলবেন তা-ই হবে। মুসলমানদের তাতে কী লাভ? ব্রিটিশরাজের চেয়ে হিন্দুরাজ কিসে ভালো? মুসলমানরা নির্বাচন চায় না, চায় নমিনেশন। তাঁর আপত্তি থাকায় মুসলমানরা বড় একটা কংগ্রেসে যোগ দিতে রাজি হন না ।
তবে একেবারে যোগ দেন না তা নয়। যাঁরা যোগ দেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না বা ঝীণা। তিনি স্বীকার করতেন যে ভারত একটি নেশন এবং তার জন্য চাই একটা পার্লামেন্ট। কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালে হিন্দুদের মধ্যে একটা পুনরুজ্জীবনাদী আন্দোলন চলছিল। সেই আন্দোলনের দ্বারা আকৃষ্ট হন কংগ্রেসের এক দল সদস্য। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ, বাল গঙ্গাধর টিলক, লালা লাজপত রায়, বিপিনচন্দ্র পাল ও তাঁদের অনুগামিগণ। তাঁদের প্রিয় সঙ্গীত ছিল ‘বন্দেমাতরম’। সেটিকে তাঁরা কংগ্রেসের উদ্বোধনী সঙ্গীত করেন। তাঁদের কর্মপদ্ধতি ক্রমশ সরকার-বিরোধী হয়ে ওঠে। তাঁরা বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে যে কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেন তার মধ্যে ছিল বিলিতী পণ্য ও বিদেশী শিক্ষা পরিহার। তাঁদের কারও কারও প্রশ্রয়ে ছেলেছোকরারা বোমাবাজি শুরু করে দেয় । সরকারকে বাধ্য হয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে এক প্রকার সমঝোতা করতে হয়। কিন্তু সরকার স্বীকার করেন না তারা সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব।
কংগ্রেসের সঙ্গে তাল রাখার জন্য আবশ্যক হয় একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের। তার নাম মুসলিম লিগ নেতারা বলেন, তাঁরা আইনসভার নির্বাচনে রাজি, যদি তাদের দেওয়া হয় স্বতন্ত্র নির্বাচন কেন্দ্র। এইটেই ছিল সরকারের মনের কথা, কিন্তু মুখের কথা মুসলিম লিগ নেতাদের। প্রবর্তিত হয়ে গেল সেপারেট ইলেকটরেট। একজন প্রতিবেশী ভোট দেবেন মুসলিম কেন্দ্র থেকে, আর একজন প্রতিবেশী ভোট দেবেন অমুসলিম কেন্দ্র থেকে। কংগ্রেসকে এটা হজম করতে হল।
কংগ্রেসপন্থী মুসলমানরা নির্বাচন প্রার্থী হলেন মুসলমান কেন্দ্র থেকে আর কংগ্রেসপন্থী হিন্দুরা অমুসলমান কেন্দ্র থেকে। কংগ্রেসপন্থী মুসলমানদের মধ্যে ছিলেন জিন্না সাহেব। কিন্তু মুসলমানদের ভোট পাওয়ার জন্য তাকে হতে হল মুসলিম লিগের সদস্য। তিনি কংগ্রেস-লিগ দুই প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়ে একপ্রকার সেতুবন্ধনের কাজ করেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন, আমি কংগ্রেসে রয়েছি ভারতের জাতীয় স্বার্থের খাতিরে আর মুসলিম লিগে যোগ দিয়েছি মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশেষ স্বার্থের রক্ষার্থে। তাঁর সেতুবন্ধনের ফলে ১৯১৬ সালে লখনৌ শহরে কংগ্রেস ও লিগের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির বিষয় হল weightage অর্থাৎ প্রাপ্য আসনের উপরে বাড়তি আসন। হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলিতে মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট আসনগুলির উপরে আরও বাড়তি আসন দেওয়া হয় হিন্দুর খরচে। আর মুসলিমপ্রধান প্রদেশগুলিতে অমুসলমানদের বাড়তি আসন দেওয়া হয় মুসলমানের খরচে। তাছাড়া কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের দেওয়া হয় শতকরা ত্রিশটি আসন, যদিও তাদের লোকসংখ্যা শতকরা বাইশ। এটা হিন্দুদের ভাগ থেকে কেটে নেওয়া হয় হিন্দুদের সম্মতিতে।
সেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments