সূর্যালোক
একটু ঘুম এলেই গলায় শ্লেষ্মা ঘন হয়ে ওঠে। আবার কালুর ঘুম ভেঙে গেল, একটা বিদ্ঘুটে আওয়াজ করে সে চোখ মেলে তাকালে অন্ধকারের পানে। কেমন ঘুটঘুটে ঘন অন্ধকার, তাকালে মনে হয় যেন চোখই নেই, কোটর দুটো শূন্য—ওই অন্ধকারের মতো কালো।
মশার আওয়াজ তীক্ষ্ণতম হয়ে উঠেছে, ওদের রাজ্যে যেন হিংস্র-উল্লাসের বন্যা এসেছে। কিন্তু তবু ঘুমোতে হবে, ঘুমোতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আবার গলা বেয়ে শ্লেষ্মা ঠেলে উঠে শ্বসনে ব্যাঘাত জন্মায়। কালু এবার ওপাশ ফিরে শুল। কিন্তু পা-দুটো টেনেছে কী অমনি তাতে কী যেন ঠেকল, ঠাণ্ডা আর কিছু নরম।
—কে ওখানে, কে?
কে কখন পায়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছে, কুষ্ঠরোগী না ক্ষয়কাশরোগী—খোদা জানেন। কোনো উত্তর নেই দেখে আবার কালু হুমকি দিয়ে উঠল। তারপর নিস্তব্ধতা : এবং সে-নিস্তব্ধতার মধ্যে এবার একটা গলা ঘড়ঘড় করে উঠল।
—কোন শালা লাথি মারছে?
—আমি শালা, তুমি কে?
—চোপ!
ঝুনো পোড়ো বাড়ির অন্ধকার বারান্দায় এবার দুটি মানুষ ঘেয়ো-কুকুরের মতো ঘেউ-ঘেউ করে উঠল : কেমন একটা উত্তাপে তাদের মাথা গরম হয়ে উঠেছে। নাকদুটি ক্রুদ্ধ কুকুরের নাকের মতো ফুলে উঠল, আর দাঁতগুলো হয়তো নেকড়ের দাঁতের মতো হিংস হয়ে উঠেছে; এবং তারা দুজনেই উঠে সোজা হয়ে বসে উন্মুখ অধীরতায় পরস্পরের আবছা মূর্তির পানে চেয়ে ফুলতে থাকল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হল না, কেউ কারো গায়ে হাত তুললে না। আবার তারা নীরবে শুয়ে পড়ল, যদিও এবার একটু তফাতে। তারপর চুপচাপ।
মেঝেটা স্যাঁতস্যাঁতে, আর কালো রাত্রিময় কেমন একটা ভাপসা গরম, ভাদ্রের ভাপসা গরম। আকাশের স্তব্ধ কালো মেঘের পানে চেয়ে মনে অস্বস্তি লাগে : ওই ঝুলে-পড়া ভারি-হয়ে থাকা মেঘগুলো যদি সরিয়ে দেয়া যেত...
এবং রাত্রির কাব্য মিছে হয়ে মুছে গেল সূর্যালোকে।
কালুর পেট জ্বলছে। ক্ষুধা একটা অদ্ভুত জ্বালা। এবং এ-জ্বালা হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল বলেই হয়তো সে মুখ তুলে তাকাল লোকটার পানে, একটা নিষ্ঠুরতম ক্রোধে ভেতরটা জ্বলে উঠল দাউ-দাউ করে। কিন্তু ওধার থেকে সাড়া না পেয়ে আবার সে শান্ত হয়ে আস্তে মাথা নাবাল।
রাত্রি হয়তো গভীর, হয়তো-বা শেষ হতে চলেছে, কিন্তু ঘন কালো মেঘে আকাশটা নিশ্ছিদ্র বলে তা জানবার উপায় নেই। মনটা শান্ত হয়েছিল বটে, কিন্তু কালো জমাট আকাশের পানে তাকিয়ে আবার কালুর অন্তর ফণা খাড়া করে দাঁড়াল, বিষ যেন ঠোঁটের প্রান্তে ঝুলছে। কিন্তু মেঘকে নয়, পাশে শুয়ে-থাকা লোকটাকে ছোবল মারবার জন্যে প্রাণে আবার দুরন্ত বাসনা জাগল। তার ওপর ক্রোধ থেকে-থেকে উত্তাল হয়ে উঠছে সে মানুষ বলেই, আবার সে মানুষ বলেই ক্রুদ্ধ মন সংযত হয়ে উঠছে। সে মানুষ, তাই তাকে বাধা দেবে, নির্বিবাদে আঘাত সহ্য করবে না। ওই যে-দেহটি এখন নিশ্চল হয়ে রয়েছে—হয়তো ঘুমে হয়তো-বা ভাবনায়, সে-দেহটি আঘাত পেয়ে এক সময়ে সিংহের মতো গর্জে উঠবে, প্রচণ্ডভাবে বাধা দেবে বিপক্ষের জ্বলন্ত বাসনায়।
তেমনি নীরবতা। কেমন একটা সোঁদালো গন্ধ আসছে, হয়তো এই মেঝে থেকে, অথবা বারান্দার শেষে যে-ঝোপঝাড় ঘন হয়ে রয়েছে—সেখান থেকে আসছে সে-গন্ধ। কোথেকে আসছে সেকথা জানবার তাগিদ নেই কালুর, শুধু সে-সোঁদালো গন্ধে যে ঈষৎ ঝাঁঝ রয়েছে, সে-ঝাঁঝ তার শান্ত নাকে লাগছে ভালো—
দেহ হতে ঝাঁঝালো অনুভূতি জাগছে, তাই হয়তো এই ঈষৎ ঝাঁঝালো গন্ধ তার নাকে লাগছে ভালো। তারপর কালুর মনে কোনো কথা নেই, হঠাৎ কেমন গোঁয়ারের মতো সে-মন স্তব্ধ হয়ে গেল, এবং মস্তিষ্কের যে-কারখানা, সে-কারখানার সদর দরজায় গ্যাট হয়ে বসল কোনো চিন্তা তাতে ঢুকতে দেবে না। তাতে কী লাভ সে জানে না, কিন্তু তবু বাধা দেবে, বাধা দেবে তার স্বচ্ছন্দ গতিময়তায়। মস্তিষ্ক-কারখানাকে নিষ্কর্মা বসিয়ে রেখে তার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments