১৮৯৪–১৯৫০
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক। তিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখে খ্যাতি অর্জন ক...
See more >>-
চাকুরি গেল। এত করিয়াও কৃষ্ণলাল চাকুরি রাখিতে পারিল না। সকাল হইতে রাত দশটা পর্যন্ত (ডাউন খুলনা প্যাসেঞ্জার, ১০-৪৫ কলিকাতা টাইম) টিনের সুটকেস হাতে শিয়ালদ হইতে বারাসত এবং বারাসত হইতে শিয়ালদ পর্যন্ত ‘তাঁতের মাকু’র মতো যাতায়াত করিয়া ও ক্রমাগত “দত্তপুকুরের বাতের তেল, দত্তপুকুরের বাতের তেল—বাত, বেদনা, ফুলো, কাটা ঘা, পোড়া-ঘা, দাঁত কনকনানি, এককথায় যতরকম ব্যথা, শূলানি, কামড়ানো আছে—সব এক নিমেষে চলে যাবে—আজ চব্বিশ বছর এই লাইনে, ওষুধটি প্রত্যেক ভদ্রলোক ব্যবহার করছেন, সকলেই এর গুণ জানেন—” বলিয়া চিৎকার করিয়াও চাকুরি রাখা গেল না।
সেদিন বসু মহাশয় (ইন্ডিয়ান সিন্ডিকেটের মালিক নৃত্যগোপাল বসু) কৃষ্ণলালকে ডাক দিয়া বলিলেন—পাল মশায়, কাল রাত্রের ক্যাশ জমা দেননি কেন?
-
ওর ভালো নাম বোধ হয় ছিল নিস্তারিণী। ওর যৌবন বয়সে গ্রামের মধ্যে অমন সুন্দরী বউ ব্রাহ্মণপাড়ার মধ্যেও ছিল না। ওরা জাতে যুগী, হরিনাথ ছিল স্বামীর নাম। ভদ্রলোকের পাড়ায় ডাকনাম ছিল ‘হরে যুগী’।
নিস্তারিণীর স্বামী হরি যুগীর গ্রামের উত্তর মাঠে কলাবাগান ছিল বড়ো। কাঁচকলা ও পাকাকলা হাটে বিক্রি করে কিছু জমিয়ে নিয়ে ছোটো একটা মনিহারি জিনিসের ব্যাবসা করে। রেশমি চুড়ি ছ-গাছা এক পয়সা, দু-হাত কার এক পয়সা—ইত্যাদি। প্রসঙ্গক্রমে মনে হল, ‘কার’ মানে ফিতে বটে, কিন্তু ‘কার’ কী ভাষা? ইংরেজিতে এমন কোনো শব্দ নেই, হিন্দি বা উর্দুতে নেই, অথচ ‘কার’ কথাটা ইংরেজি শব্দ বলে আমরা সকলেই ধরে নিয়ে থাকি! যাক সে। হরি
-
আইনস্টাইন কেন যে দার্জিলিং যাইতে যাইতে রানাঘাটে নামিয়াছিলেন বা সেখানে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল হলে ‘On…ইত্যাদি ইত্যাদি’ সম্বন্ধে বক্তৃতা করিতে উৎসুক হইয়াছিলেন—এ কথা বলিতে পারিব না। আমি ঠিক সেইসময়ে উপস্থিত ছিলাম না। কাজেই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ আমি আপনাদের নিকট সরবরাহ করিতে অপারগ, তবে আমি যেরূপ অপরের নিকট হইতে শুনিয়াছি সেরূপ বলিতে পারি।
আসল কথা, নাৎসি জার্মানি হইতে নির্বাসিত হওয়ার পর হইতে বোধ হয় আইনস্টাইনের কিছু অর্থাভাব ঘটিয়াছিল, বক্তৃতা দিয়া কিছু উপার্জন করার উদ্দেশ্যে তাঁর ভারতবর্ষে আগমন। বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়া বেড়োইতেছিলেনও এ কথা সকলেই জানেন, আমি নূতন করিয়া তাহা বলিব না।
কৃষ্ণনগর কলেজের তদানীন্তন গণিতের অধ্যাপক রায়বাহাদুর নীলাম্বর চট্টোপাধ্যায় একজন উপযুক্ত লোক ছিলেন।
-
ইচু মণ্ডলের আজ বেজায় সর্দি হয়েছে। ভাদ্রমাসের বর্ষণমুখর শীতল প্রভাত। তালি দেওয়া কাঁথা, ওর বউ, তার নাম নিমি, শেষরাত্রে গায়ে দিয়ে দিয়েছিল। এমন সর্দি হয়েছে যেন মনে হচ্ছে সমস্ত শরীর ভারী। ইচু শুয়েই পা দিয়ে চালের হাঁড়িটা নেড়ে দেখলে, সেটা ওর পায়ের তলার দিকেই থাকে, হাঁড়িটাতে সামান্য কিছু চাল আছে মনে হল তার।
ইচু বললে—আজ আর জনে যাব না। একটু পানি দে দিকি।
ওর বউ বললে—জনে যাবে না তবে চলবে কিসি?
—কেন, চাল তো রয়েছে তোর হাঁড়িতি, সজনে শাক-মাক সেদ্দ কর আর ভাত। নুন আছে।
—এটটু অমনি পড়ে আছে মালাটার তলায়।
—তবে আর কী? পানি দে—নামাজ করি। ইচু জল দিয়ে
-
মধুমতী নদীর ওপরেই সেকালের প্রকাণ্ড কোঠাবাড়িটা।
রাধামোহন নদীর দিকের বারান্দাতে বসে একটা বই হাতে নিয়ে পড়বার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু বই-এ মন বসাতে পারলে না।
কেমন সুন্দর ছোট্ট গ্রাম্য নদীটি, ওপারে বাঁশবন, আমবন—বহুকালের। ফলের বাগান যেন প্রাচীন অরণ্যে পরিণত হয়েছে। একা এতবড়ো বাড়িতে থাকতে বেশ লাগে। খুব নির্জন, পড়াশোনো করবার পক্ষে কিংবা লেখা-টেখার পক্ষে বেশ জায়গাটি। তাদের পৈতৃক বসতবাটী বটে, তবে কতকাল ধরে তারা কেউ এখানে আসেনি, কেউ বাস করেনি।
রাধামোহনের বাবা শ্যামাকান্ত চক্রবর্তী তাঁর বাল্যবয়সে এ গ্রাম ছেড়ে চলে যান। মেদিনীপুরে তাঁর মামারবাড়ি। সেখানে থেকে লেখাপড়া শিখে মেদিনীপুরে ওকালতি করে বিস্তর অর্থ উপার্জন করেন এবং সেখানে বড়ো বাড়িঘর তৈরি
-
সাহেবের নাম এন. এ. ফারমুর। নীলগঞ্জের নীল কুঠিয়াল সাহেবদের বর্তমান বংশধর। আমি বাল্যকাল হইতেই সাহেবকে চিনি। যখন স্কুলে পড়ি, সাহেবদের কুঠিতে একবার বেড়াইতে যাই। ফারমুর সাহেবকে এদেশের লোক ফালমন সাহেব বলিয়া ডাকে। আমার বাল্যকালে ফালমন সাহেবের বয়স ছিল কত? পঞ্চাশ হইবে মনে হয়। সাহেবদের কুঠিতে যাইয়া দেখিতাম সাহেব দুধ দোয়াইতেছেন। অনেকগুলি বড়ো বড়ো গাই ছিল কুঠিতে, বিশ ত্রিশ সের দুধ হইত। নৌকো করিয়া প্রতিদিন ওই দুধ মহকুমার শহরে প্রেরিত হইত। আমাকে বড়ো ভালোবাসিতেন। আমাকে দেখিয়া বলিতেন—সকাল বেলাতেই এসে জুটলে? খাবা কিছু?
—খাব।
—কী খাবা? দুধ?
—যা দেবেন।
—ও মতি, ছেলেটিকে গুড় দিয়ে মুড়ি দাও আর দু-উড়কি দুধ দাও।আমি এই মাত্তর
-
সুহাসিনী মাসিমাকে আমি দেখিনি। কিন্তু খুব ছোটো বয়সে যখনই মামারবাড়ি যেতুম, তখন সকলের মুখে মুখে থাকত সুহাসিনী মাসিমার নাম।
—সুহাস কী চমৎকার বোনে! এই বয়েসে কী সুন্দর বুনুনির হাত!
—সুহাসিনী বললে, এসো দিদি বসো। বেশ মেয়ে সুহাসিনী।
—সেবার সুহাসিনীকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ালুম পূর্ণিমার দিন।
—সুহাসিনী ওসব অন্যায্য দেখতে পারে না, তাই জন্যে তো মায়ের সঙ্গে বনে না।
সুহাসিনী গ্রামের সকলের যেন চোখের মণি। সুহাসিনী মাসিমা সম্বন্ধে কথা বলবার সময় সবারই অর্থাৎ আমার বুড়ি দিদিমার, গনু দিদিমার, মাসিমাদের, মায়ের, মামাদের গলার সুর বদলে যেত, চোখে কীরকম একটা আলাদা ভাব দেখা যেত। আর একটা কথা, রূপের কথা উঠলে সকলেই বলত আগে সুহাসিনী
-
নবীনবাবু ঘুম হইতে উঠিয়া কয়লা চাকরকে ডাকাডাকি করিতেছেন শুনিতে পাইয়াও আবার চাদর মুড়ি দিয়া পাশ ফিরিয়া শুইয়া এবং তার একটু পরে বোধ হয় ঘুমাইয়াও পড়িয়াছি। জানালার ফাঁক দিয়া পাশের আতাগাছের ডাল যখন দেয়ালের গায়ে অনেকখানি রোদের মধ্যে ছায়া সৃষ্টি করিয়াছে, তখন কয়লার ডাকে তন্দ্রা ভাঙিল।
—বাবুজি, চা তৈয়ার!
—চা? এখানে নিয়ে আয়, বিছানায়।
নবীনবাবু বোধ হয় প্রাতভ্রমণ সারিয়া আমার ঘরের পাশের সরু করিডোর দিয়া গটগট করিয়া চলিয়া গেলেন, আমার আলস্যের প্রতি কটাক্ষ করিয়াই বেশ জোরে জোরে পা ফেলিয়া গেলেন। চা-পান বিছানায় বসিয়াই শেষ করিয়া উঠিব-উঠিব ভাবিতেছি, এমন সময় নবীনবাবু তাড়াতাড়ি আসিয়া আমার বিছানার পাশের দিকের জানালায় দাঁড়াইয়া বলিলেন—উঠুন মশাই, যোধপুরী
-
বুধো মণ্ডলের মায়ের হাতে টাকা আছে সবাই বলে। বুধো মণ্ডলের অবস্থা ভালো, ধানের গোলা দু-তিনটে। এত বড়ো যে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ গেল গত বছর, কত লোক না-খেয়ে মারা গেল, বুধো মণ্ডলের গায়ে এতটুকু আঁচ লাগেনি। বরং ধানের গোলা থেকে অনেককে ধান কর্জ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
সবাই বলে, বুধোর টাকা বা ধান সবই ওই মায়ের। বুধোর নিজের কিছুই নেই। বুড়ির দাপটে বুধো মণ্ডলকে চুপ করে থাকতে হয়, যদিও তার বয়েস হল এই সাতচল্লিশ। ওর মার বয়স বাহাত্তর ছাড়িয়ে গিয়েছে। আমি কিন্তু অত্যন্ত বাল্যকাল থেকে ওকে যেমন দেখে এসেছি, এখনও (অনেককাল পরে দেশে এসে আবার বাস করছি কিনা) ঠিক তেমনি আছে। তবে মাথায়
-
পনেরো-ষোলো বছর আগেকার কথা। পটলডাঙা স্ট্রিটে এক বেঞ্চিপাতা চায়ের দোকানে রামতারণবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ শুরু হয়। এক পয়সা দামের এক পেয়ালা চাঃ; গোলদিঘি বেড়িয়ে এসে সস্তায় চা-পান সারতে দোকানটাতে ঢুকলাম। আমার দরের আরওঃপাঁচ-ছ-টি খরিদ্দার অত সকালেও সেখানে জমায়েত হত এক পয়সার এক পেয়ালা চা খেতে। এই দলের মধ্যে অনেকেই ২৫/২নং মেস-বাড়ির অধিবাসী; একমাত্র রামতারণবাবুই ছিলেন গৃহস্থ লোক, যিনি ভাড়াটে বাড়িতে বাস করেন, মেসে নয়। সেইজন্যেই তাঁর সঙ্গে আলাপের প্রবৃত্তিটা আমার হয়তো অত বেশি ছিল। তখন থাকি মেসে, গৃহস্থবাড়ির মধ্যে একটা নতুন জগৎ দেখতাম।
রামতারণবাবুর সঙ্গে এই ধরনের দেখাশোনা প্রায় তিন-চার মাস ধরে হল। অবিশ্যি চায়ের দোকানে যেমন আলাপ হওয়া সম্ভব
-
সন্ধ্যার কিছু আগে নীরেন ট্রেন হইতে নামিল। তাহার জানা ছিল না এমন একটা ছোট্ট স্টেশন তাদের দেশের। কখনো সে বাংলা দেশে আসে নাই ইতিপূর্বে এক কলিকাতা ছাড়া।
নীরেনের দাদামশাই রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ গাঙ্গুলী তাহাকে বলিয়া দিয়াছিলেন বাংলা দেশের পল্লিগ্রামে গিয়া সে যেন জল না-ফুটাইয়া খায় না, মশারি ছাড়া শোয় না, নদীর জলে না-স্নান করিয়া তোলা জলে স্নান করে। নীরেনের স্বাস্থ্যটি বেশ চমৎকার, ডাম্বেল মুগুর ভাঁজিয়া শরীরটাকে সে শক্ত করিয়া তুলিয়াছে, বড়োলোকের দৌহিত্র, অভাব-অনটন কাহাকে বলে জানে না। মনে নীরেনের বিপুল উৎসাহ। চোখের স্বপ্ন এখনও কাঁচা, সবুজ।
একটা লোক প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে দাঁড়াইয়া প্ল্যাটফর্মে সাজানো দূর্বাঘাসের ওপর গোরু ছাড়িয়া দিয়া গোরুর দড়ি হাতে
-
সকালবেলা।
একজন কাঁচা-পাকা দাড়িওয়ালা মুসলমান আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললে —সালাম বাবু।
—কে তুমি?
—আমার নাম বারিক মণ্ডল, বাড়ি চালদী। আপনার কাছে এটু আলাম—
—কেন?
—ধানি জমি কিনবেন? পঞ্চাশের মন্বন্তর তখনো উগ্র হয়ে ওঠেনি, দিকে দিকে ওর আগমনবার্তা অল্পে অল্পে ঘোষিত হচ্ছে। একটা ব্যাপার শেষ না-হয়ে গেলে বোঝা যায় না সেটা কত বড়ো হল। সবাই ভাবছে, এ দুর্দিনের অভাব-অনটন শিগগির কেটে যাবে। এ সময়ে ধানের জমি কেনা মন্দ নয়, সামনেই শ্রাবণ মাস, জলবৃষ্টিও বেশ হচ্ছে, কিনেই ধান রোয়া হতে পারে এবারই। চালের দাম পঁচিশ টাকা মণ, তাও সহজপ্রাপ্য নয়। কলকাতা থেকে বোমার ভয়ে পালিয়ে এসে বাড়ি বসে আছি। হয়তো কলকাতা
-
সিংভূম-জেলার বন-জঙ্গল ও পাহাড়শ্রেণী ভারতবর্ষের মধ্যে সত্যিই অতি অপূর্ব্ব। বেঙ্গল-নাগপুর-রেলপথ হওয়ার আগে এই অঞ্চলে যাবার কোনো সহজ উপায় ছিল না, কেউ যেতোও না সে সময়—যা একটু আধটু যেতো—এবং যে ভাবে যেতো—তার কিছুটা আমরা বুঝতে পারি সঞ্জীবচন্দ্রের ‘পালামৌ’ পড়ে। সিংভূম জেলার ভেতরকার পাহাড় জঙ্গলের কথা ছেড়ে দিই—বাংলাদেশের প্রত্যন্ত সীমায় অবস্থিত মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলার অনেকস্থান জনহীন অরণ্যসঙ্কুল থাকার দরুণ ‘ঝাড়খণ্ড’ অর্থাৎ বনময় দেশ বলে অভিহিত হোত। এ সব লোক প্রাণ হাতে করে যেতো ঐ সব বনের দেশে। কিন্তু না গিয়ে উপায় ছিল না—যেতেই হোত।
ওই দেশের মধ্যে দিয়ে ছিল পুরী যাওয়ার রাস্তা। মেদিনীপুর জেলার বর্তমান ঝাড়গ্রাম মহকুমার মধ্যে দিয়ে এই পুরোনো
-
আমি কেমন করে লেখক হলাম, এ আমার জীবনের, আমার নিজের কাছেই, একটা অদ্ভুত ঘটনা। অবশ্য একথা ঠিক, নিজের জীবনের অতি তুচ্ছতম অভিজ্ঞতাও নিজের কাছে অতি অপূর্ব। তা যদি না হত, তবে লেখক জাতটারই সৃষ্টি হত না। নিজের অভিজ্ঞতাতে এরা মুগ্ধ হয়ে যায়—আকাশ প্রতিদিনের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে কত কল্পনাকে রচনা করছে যুগে যুগে—তারই তুলে কত শত শতাব্দী ধরে মানুষ নানা তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজের দিন কাটিয়ে চলেছে, মানুষের জন্ম-মৃত্যু, আশা-নৈরাশ্য, হর্ষ-বিবাদ, ঋতুর পরিবর্তন, বনপুষ্পের আবির্ভাব ও তিরোভাব—কত ছোটো-বড়ো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে পৃথিবীতে-কে এসব দেখে, এসব দেখে মুগ্ধ হয়?
এক শ্রেণির মানুষ আছে যাদের চোখে কল্পনা সব সময়েই মোহ-অঞ্জন মাখিয়ে দিয়ে
-
মতিলাল ছেলেকে বললে—বোসো বাবা, গোলমাল করো না। হিসেব দেখছি—
ছেলে বাবার কোঁচার প্রান্ত ধরে টেনে বললে—ও বাবা, খেলা করবি আয়—
—না, এখন টানিসনে—আমার কাজ আছে—
—ও বাবা, খেলা কববি আয়—ঘোয়া খেলা কববি আয়—
—আঃ জ্বালালে—চল দেখি—
মতিলাল হিসাবের খাতা বন্ধ করে ছেলের পিছু পিছু চলল। ছেলে তার কোঁচার কাপড় ধরে টেনে নিয়ে চলল কোথায় তা সেই জানে।
—কোথায় রে?
—ওভেনে হাত তুলে খোকা একটা অনির্দেশ্য অস্পষ্ট ইঙ্গিত করে—ভালো বোঝা যায়। অবশেষে দেখা যায়, ভাঁড়ারঘরের পেছনে যে ছোটো রোয়াক আছে, বর্ষার জলে সেটা বেজায় পেছল, শ্যাওলা জমে বিপজ্জনক ভাবে মসৃণ—সেখানে নিয়ে এসে দাঁড় করালে মতিলালকে—
—এখানে কী রে?
—আউভাজা খা, আউভাজা
-
আমার স্ত্রী আমাকে কেবলই খোঁচাইতেছিলেন।
পূর্ববঙ্গে বাড়ি। এই সময় জমি না-কিনিলে পশ্চিমবঙ্গে ইহার পরে আর জমি পাওয়া যাইবে কি? কলিকাতায় জমি ও বাড়ি করিবার পয়সা আমাদের হাতে নাই, কিন্তু পনেরোই আগস্টের পরে কলিকাতার কাছেই বা কোথায় জমি মিলিবে? যা করিবার এইবেলা করিতে হয়।
সুতরাং চারিদিকে জমি দেখিয়া বেড়াই। দমদম, ইছাপুর, কাশীপুর, খড়দহ, ঢাকুরিয়া ইত্যাদি স্থানে। রোজ কাগজে দেখিতেছিলাম জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন। পূর্ববঙ্গ হইতে যেসব হিন্দুরা আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া চলিয়া আসিতেছেন, তাঁহাদের অসহায় ও উদভ্রান্ত অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করিতে বাড়ি ও জমির মালিকেরা একটুও বিলম্ব করেন নাই। এক বৎসর আগে যে জমি পঞ্চাশ টাকা বিঘা দরেও বিক্রয় হইত না, সেইসব পাড়াগাঁয়ের জমির
-
মার্টিন কোম্পানির ছোটো লাইন।
গাড়ি ছাড়বার সময় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে, এখনও ছাড়বার ঘণ্টা পড়েনি। এ নিয়ে গাড়ির লোকজনের মধ্যে নানারকম মতামত চলেছে।
—মশাই বড়গেছে নেমে যাবো, প্রায় পাঁচমাইল; চারটে বাজে— এখনও গাড়ি ছাড়বার নামটি নেই— কখন বাড়ি পৌঁছব ভাবুন তো?
—এদের কাণ্ডই এইরকম, আসুন না সবাই মিলে একটু কাগজে লেখালেখি করি। সেদিন বড়গেছে ইস্টিশনে দুটো ট্রেনের লোক এক ট্রেনে পুরলে, দাঁড়াবার পর্যন্ত জায়গা নেই; তাও কদমতলায় এল এক ঘণ্টা লেট।
—ওই আপিসের সময়টা একটু টাইম মতো যায়, তার পর সব গাড়িরই সমান দশা—
—আঃ, কী ভুল যে করেছি মশাই এই লাইনে বাড়ি করে! রিটায়ার করলাম, কোথায় বাড়ি করি, কোথায় বাড়ি
-
সামান্য জিনিস। আনা তিনেক দামের কলাই-করা চায়ের ডিশ-পেয়ালা।
যেদিন প্রথম আমাদের বাড়ি ওটা ঢুকল, সেদিনের কথা আমার বেশ মনে আছে। শীতকাল, সকাল সকাল খাওয়া-দাওয়া সেরে লেপের মধ্যে যাওয়ার চেষ্টা করছি, এমন সময় কাকার গলার স্বর শুনে দালানের দিকে গেলাম। কাকা গিয়েছিলেন দোকান নিয়ে কুলবেড়ের মেলায়। নিশ্চয় ভালো বিক্রি-সিক্রি হয়েছে।
উঠানে দু-খানা গোরুর গাড়ি। কৃষাণ হরু মাইতি একটা লেপ তোশকের বান্ডিল নামাচ্ছে। একটা নতুন ধামায় একরাশ সংসারের জিনিস— বেলুন, বেড়ি, খুন্তি, ঝাঁঝরি, হাতা, খান কতক নতুন মাদুর, গোটা দুই কাঁঠাল কাঠের নতুন জলচৌকি, এক বোঝা পালং শাকের গোড়া, দু-ভাঁড় খেজুর-গুড়, আরও সব কী-কী।
কাকা আমায় দেখে বললেন— নিরু, একটা লণ্ঠন নিয়ে
-
কী বাদামই হত শ্রীশ পরামানিকের বাগানে। রাস্তার ধারে বড়ো বাগনটা। অনেক দিনের প্রাচীন গাছপালায় ভরতি। নিবিড় অন্ধকার বাগানের মধ্যে— দিনের বেলাতেই।
একটু দূরে আমাদের উচ্চ প্রাইমারি পাঠশালা। রাখাল মাস্টারের স্কুল। একটা বড়ো তুঁত গাছ আছে স্কুলের প্রাঙ্গণে। সেজন্যে আমরা বলি ‘তুঁততলার স্কুল’।
দু-জন মাস্টার আমাদের স্কুলে। একজন হলেন হীরালাল চক্রবর্তী। স্কুলের পাশেই এঁর একটা হাঁড়ির দোকান আছে, তাই এঁর নাম ‘হাঁড়ি-বেচা-মাস্টার’।
মাস্টার তো নয়, সাক্ষাৎ যম। বেতের বহর দেখলে পিলে চমকে যায় আমাদের। টিফিনের সময় মাস্টারমশায়রা দু-জনই ঘুমুতেন। আমরা নিজের ইচ্ছেমতো মাঠে-বাগানে বেড়িয়ে ঘণ্টা খানেক পরেও এসে হয়তো দেখি তখনও মাস্টারমশায়দের ঘুম ভাঙেনি। সুতরাং তখনও আমাদের টিফিন শেষ হল না।
-
অনেকদিন পর সতীশের সঙ্গে দেখা। বেচারা হন্তদন্ত হয়ে ভিড় ঠেলে বিকাল বেলা বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের বাঁ-দিকের ফুটপাথ দিয়ে উত্তর মুখে চলেছিল। সমস্ত আপিসের সবেমাত্র ছুটি হয়েছে। শীতকাল। আধো-অন্ধকার আধো-আলোয় পথ ছেয়ে ছিল। ক্লান্ত দেহে ছ্যাকরা গাড়ির মতো ধীরে ধীরে পথ ভেদ করে চলেছিলাম। সহসা সতীশকে দেখে ওর জামাটা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলাম— আরে সতীশ যে!
সতীশ সবিস্ময়ে আমার পানে চেয়ে বলে উঠল— খগেন! মাই গড! আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম!
বললাম— তার প্রমাণ আমাকে ধাক্কা দিয়েই তুমি চলে গেছিলে আর একটু হলে! ভাগ্যিস ডাকলাম!
—সরি! আমি একটু বিশেষ ব্যস্ত।
—তা সে বুঝতেই পারছি। তা, কোথায় চলেছ শুনি?
—তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে।
-
কয়েক বছর পূর্বে এ-ঘটনা ঘটেছে, তাই এখন মাঝে মাঝে আমার মনে হয় ব্যাপারটা আগাগোড়া মিথ্যে; আমারই কোনোপ্রকার শারীরিক অসুস্থতার দরুন হয়তো চোখের ভুল দেখে থাকব বা ওইরকম কিছু। কিন্তু আমার মন বলে, তা নয়; ঘটনাটি মিথ্যে ও অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেবার কোনো কারণ ঘটেনি। আমার তখনকারের অভিজ্ঞতাই সত্যি, এখন যা ভাবছি তা-ই মিথ্যে।
ঘটনাটি খুলে বলা দরকার।
প্রসঙ্গক্রমে গোড়াতেই এ-কথা বলে রাখি যে, গত দশ বৎসরের মধ্যে আমার শরীরে কোনো রোগবালাই নেই। আমার মন বা মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ সুস্থ আছে এবং যে-সময়ের কথা বলছি, এখন থেকে বছর চারেক আগে, সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। আমার স্কুলমাস্টারের জীবনে অত্যাশ্চর্য বা অবিশ্বাস্য ধরনের কখনো কিছু
-
রোহিণী রায় আমাদের গ্রামের জমিদার ছিলেন শুনেছিলাম।
আমাদের পাড়ায় তাঁদের মস্ত দোতলা বাড়ি। তিন-চার শরিকে ভাগ হয়ে এক একখানা ঘরে বাস করে এক-এক শরিক— এই অবস্থা। ধানের জোতজমি যা আছে, তাতে একটা গোলাও ভরে না। রোহিণী রায়ের বর্তমান বংশধরগণ পেটপুরে দু-বেলা খেতেও পান না।
আমি আর নন্তু রোহিণী রায়ের চণ্ডীমণ্ডপে, বেণীমাধব রায়ের পাঠশালায় রোজ পড়তে যাই। রোহিণী রায়ের চণ্ডীমণ্ডপের অবস্থাও ওদের বাড়ির মতোই।
মস্ত বড়ো চণ্ডীমণ্ডপের এধারে-ওধারে টানা রোয়াকে চুন-সুরকি খসে পড়চে, চালের খড় উড়ে যাচ্ছে, দেওয়াল ফেটে গিয়েছিল ১৩০৪ সালের বড়ো ভূমিকম্পে। এখন যদিও ১৩১৮ সাল হল, এই চোদ্দো-পনেরো বছর সে দেওয়াল যেমন তেমনি রয়েছে। সেকেলে চওড়া মজবুত মাটির
-
উপেন ভটচাজের পুত্রবধূ বেশ সুন্দরী। একটিমাত্র ছোটো ছেলে নিয়ে অত বড়ো পুরোনো সেকেলে ভাঙা বাড়ির মধ্যে একাই থাকে। স্বামীর পরিচয়ে বউটি এ গ্রামে পরিচিতা নয়, অমুকের পুত্রবধূ এই তার একমাত্র পরিচয়। কারণ এই যে স্বামী ভবতারণ ভটচাজ ভবঘুরে লোক। গাঁজা খেয়ে মদ খেয়ে বাপের যথাসর্বস্ব উড়িয়ে দিয়েছে, এখন কোথায় যেন সামান্য মাইনেতে চাকরি করে, শনিবারে শনিবারে বাড়ি আসে, কোনো শনিবারে আসেই না। শ্বশুর উপেন ভটচাজ গ্রামের জমিদার মজুমদারদের ঠাকুরবাড়িতে নিত্যপূজা করেন। সেখানেই থাকেন, সেখানেই খান। বড়ো-একটা বাড়ি আসেন না তিনিও। ভালো খেতে পান বলে ঠাকুরবাড়িতেই পড়ে থাকেন, নইলে সকালের বাল্যভোগের লুচি ও হালুয়া, পায়েস, দই ও বৈকালির ফলমূল বারোভূতে লুটে
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.






















