শেষ লেখা
গৃহপ্রাঙ্গণে ভবনশিখী পাখা মেলে নেচে বেড়াচ্ছে অতিমুক্তলতার পাশে পাশে। কাল রাত্রে প্রমোদগৃহে যে জাতিপুষ্পের সুগন্ধি মাল্য ব্যবহৃত হয়েছিল, সেটা বাতায়ন-বলভিতে প্রলম্বিত। বোধ হয় পরিত্যক্ত। আর সেটির কী দরকার!
অতিমুক্তলতার ফাঁকে ফাঁকে দূরের নীল শৈলশ্রেণির তুষার-মুকুট চোখে পড়ে। মাসটা চৈত্র, কিন্তু বেশ শীত।
সুন্দরী ভদ্রা প্রাঙ্গণ উত্তীর্ণ হয়ে বহির্ঘারের কাছে এসে তরুণ স্বামীর দিকে অপাঙ্গ দৃষ্টিতে চেয়ে বললে, রও, তুমি কখন ফিরবে বলে যাও।
নন্দকে অত্যন্ত অনিচ্ছায় যেতে হচ্ছে গৃহ ছেড়ে। তিনি যেতে আদৌ ইচ্ছুক নন। নবপরিণীতা সুন্দরী বধূ প্রাসাদ-অলিন্দে আলুলায়িত-কুন্তল অবস্থায় দণ্ডায়মানা, শাক্যবংশের প্রাসাদ একাই যেন আলো করেছে এই প্রভাতকালে, নবোদিত সূর্যের আলো ম্লান হয়েছে না ওর মুখের সপ্রেম চাহনির আলোয়!
রাজকুমার নন্দ একবার চারিদিকে চেয়ে দেখলেন। উপায় নেই, যেতেই হবে। কাল জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ভগবান জিন তথাগত ন্যগ্রোধারাম বিহার থেকে শাক্যদের প্রাসাদের কনিষ্ঠ নন্দের আলয়ে ভিক্ষা করতে এসেছিলেন।
দাদা কতকাল পরে আবার শাক্যদের প্রাসাদ আলো করেছেন ফিরে এসে। মহাপ্রজাপতি গৌতমী যদিও নন্দকে অঙ্কে পেয়েছিলেন প্রৌঢ় বয়সে, তবুও শাক্যকুলগৌরব ভগবান বুদ্ধকে তিনিই মানুষ করেছিলেন তাঁর মাতার মৃত্যুর পর থেকে। কুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করে যাওয়ার পরে তাঁর দুঃখের সীমা ছিল না। নন্দকে কোলে পেয়েছিলেন, তাই—নয়তো বাঁচতেই পারতেন না। সুন্দর, সুঠাম, সুশীল নন্দ। তাঁর চোখের পুতুল, তাঁর কতদিনের স্বপ্ন।
মহাপ্রজাপতি গৌতমীর কৈশোরকালের নাম ছিল মায়া। যখন তিনি প্রথমে শাক্যরাজপ্রাসাদে আসেন নববধূরূপে, তার আগেই তাঁর কনিষ্ঠা ভগ্নী মহামায়ার বিবাহ হয়েছিল এখানে। যখন মহামায়ার কোনো পুত্রসন্তান হল না অনেকদিন পর্যন্ত, তখন প্রজারা রাজা শুদ্ধোধনকে পুনরায় বিবাহ দিলে মহামায়ার বড়োদিদি মায়ার সঙ্গে। তারপর মহামায়ার কোলে এলেন সিদ্ধার্থ। তার কতদিন পরে মায়া পেলেন আয়ুষ্মন নন্দকে নিজের ক্রোড়ে।
সেই নন্দ!
কপিলাবস্তু নগরীর সমাজস্থান, চতুষ্পথ, হট্ট, ক্রীড়াস্থান অন্ধকার করে যেদিন রাজকুমার সিদ্ধার্থ গভীর নিশীথে গৃহত্যাগ করে চলে গেলেন, সেদিন এই নন্দই ছিলেন রাজা শুদ্ধোধনের ও মায়ার একমাত্র ভরসা। নন্দ তখন বালক, দাদা গৃহত্যাগ করাতে তিনি কেঁদে আকুল হয়েছিলেন। বড়ো ভালোবাসতেন তিনি দাদাকে। কপিলাবস্তুর রাজভবন, প্রাচীর, গোপুর ও চত্বর হাহাকারে ভরে গিয়েছিল সেদিন।
ইতিমধ্যে আয়ুষ্মন রাজকুমার নন্দ যৌবনাবস্থায় উপনীত হয়েছেন, জ্যেষ্ঠের গুণগান ও যশ সৌরভ সুদূর কাশী, রাজগৃহ ও পাটলিপুত্র থেকে বাতাসে বহন করে এনেছে কপিলাবস্তুর চতুষ্পথে। ভগবান জিন দেবতা, তিনি মহাবাণী প্রচার করেছেন দিকে দিকে। রাজগৃহের নৃপতি ও শ্ৰেষ্ঠীদের শিরোভূষণ তাঁর সেই দাদার পদপ্রান্তে আনমিত হয়েছে—এ কথাও কত লোকের মুখে মুখে এসে পৌঁছেচে এখানে।
কতকাল পরে সেই তাঁর দাদা প্রত্যাগমন করেছেন কপিলাবস্তুতে। আজ কত আনন্দের দিন শাক্যকুলের! অবশ্য তিনি প্রাসাদে আসেননি, ন্যগ্রোধারাম বিহারে শিষ্যপরিবৃত হয়ে বাস করছেন। কাল সন্ধ্যায় এসেছিলেন কনিষ্ঠ ভ্রাতা আয়ুষ্মন নন্দের আলয়ে ভিক্ষা করতে। ভ্রাতৃবধূ কল্যাণী ভদ্রা অত্যন্ত আদর করে তাকে অন্ন পরিবেশন করেছিলেন, অতিসুস্বাদু অন্ন। যাবার সময় অনেকগুলো সুপক্ক ফল দিয়েছিলেন সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্যে। ভগবান তথাগত কনিষ্ঠকে আদেশ করে গেলেন—এ ফলগুলো তুমি কাল সকালে নিশ্চয়ই আমার কাছে নিয়ে আসবে। তুমি নিজে এসো। অন্য কারও হাতে পাঠিয়ো না।
তাই আজ রাজকুমার নন্দ সেই ফলগুলি একটি বেতসলতায় প্রস্তুত আধারে রক্ষা করে আধারটি হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে চললেন।
সুন্দরী ভদ্রাকে ছেড়ে নন্দ একদণ্ডও থাকতে পারেন না কোথাও! মাত্র সম্বৎসর অতীত হয়েছে নন্দ বিবাহ করেছেন। নবপরিণীতা কিশোরী পত্নীকে চোখের আড়াল করার সাধ্য নেই নন্দের। দুজনে মিলে একসঙ্গে অঞ্জন, অভ্যঞ্জন, স্নান, গাত্রসংবাহন, আমিষ ও মধু সেবন, চিত্রকর্ম, মাল্যধারণ, ছন্দন-অনুলেপন এইসব চলছে। এই কয়দিনের প্রতিদিনই নন্দ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মহাগুরু ভগবান তথাগত জিনকে দর্শন করতে গিয়েছেন—কিন্তু না, বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি। সর্বদা ভদ্রার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments