গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি

লেখক: বদরুদ্দীন উমর

জীবিকা অর্জন, জীবনযাপন এবং জীবন উপভোগ-এ তিনটি কাজ করতে গিয়ে মানুষের মাঝে যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যে অভ্যাস, আচরণ দেখা যায় তার সমষ্টি হচ্ছে একটি সমাজের সংস্কৃতি। সংস্কৃতিকে কোনো একটা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আটকিয়ে রাখা ঠিক নয়। কাব্য, সাহিত্য, চিত্র, সঙ্গীত সংস্কৃতিতে যেমন থাকবে, তেমন থাকবে মানুষের সাথে মানুষের আচরণগত দিক। এ আচরণই সংস্কৃতির বড় রূপ।

সামন্ত, বুর্জোয়া, সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্তরেরও আবার স্থানিক-কালিক পার্থক্য আছে। চীন, রাশিয়া, কোরিয়াতে সমাজতন্ত্রের মিল ছিল, আবার গরমিলও ছিল। কিন্তু মূল কথাটা হচ্ছে, প্রত্যেক জায়গায় মানুষ তার জীবিকা অর্জন, জীবন-যাপন এবং জীবন উপভোগের জন্য যা কিছু করে তার সমষ্টিই হচ্ছে সংস্কৃতি। বাণিজ্যবিপ্লব, শিল্পবিপ্লব এগুলির প্রতিফলন সমস্ত জায়গাতে হচ্ছিল। ভাষা, ধর্মচিন্তা, সাহিত্য এমনকি বৈজ্ঞানিক চিন্তার ক্ষেত্রেও প্রতিফলন ঘটেছিল। পুরো সমাজের সংস্কৃতির বিকাশ সর্বত্র দেখা গেছে।

আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক বিকাশ কিভাবে হবে তার চিন্তা করলে আমাদের শিল্প, ভূমি, প্রশাসন, শিক্ষা, রাজনৈতিক দল, অর্থনৈতিক বিকাশ ইত্যাদির অবস্থা দেখতে হবে। আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবস্থা যে কত নাজুক তার একটা উদাহরণ, আজকের পত্রিকায় দেখলাম যে, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের এক সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বক্তৃতা শুরুর আগে 'বিসমিল্লাহ' বলতে হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান সংকট হলো শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাসটি হচ্ছে অত্যন্ত পশ্চাদপদ, অবৈজ্ঞানিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। শিক্ষার পরিবেশ নেই শিক্ষাঙ্গনগুলোতে। শিক্ষা ও শিক্ষা উপকরণের সংকটতো আছেই। শিক্ষা আজকে একটা পণ্যে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছে। তথাকথিত শিক্ষিত মুর্খরাই শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে মেরুদণ্ডহীন জাতি গঠিত হচ্ছে।

এদেশে জনসাধারণ যুক্তিতর্কের বিচার করে না। পরমত সহিষ্ণুতা নেই, চিন্তায় অত্যন্ত পশ্চাদপদ। অতএব এখানে বিপ্লবী চিন্তার সংকট মারাত্মক। সংগ্রাম-আন্দোলনেরও নানা রকম অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে। কতিপয় লোকেরা বিলাসবহুল জীবন-যাপন করছে। বাজার করার জন্য সপরিবারে দেশের বাইরে যাচ্ছে। ভ্রমণ ও অবকাশ যাপনে কোটি টাকা ব্যয় করছে। অথচ তাদের সংস্কৃতির মান অত্যন্ত নিম্ন। মানবতা বোধের ধার ধারে না। আত্মকেন্দ্রিকতার ভূত তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। রাতারাতি লুটপাট করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত এরা। এটাকে লুটপাটের সংস্কৃতি বলা যায়। এই নব্য ধনিক শ্রেণী বা বাঙালি মধ্যবিত্তের সংস্কৃতির বিকাশের সংকট বোঝা যাবে কীভাবে ঐ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা লক্ষ্য করলে।

এদেশে তারপরও কিছু অনুকূল পরিবেশ বিরাজমান। এখানে ভাষাগত ও আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নেই বললে চলে। সাম্প্রদায়িকতা যা আছে তা চাপানো। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতাকে চালানো হয় ভারত বিরোধিতাকে ইস্যু করে। ভারত বিরোধিতা করা হয় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি থেকে, ক্ষেত্র বিশেষে বিপ্লবী বা প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। পাশাপাশি ভারতের সমস্ত জায়গায় উঁচু ব্রাহ্মণ বংশের লোককে অধিষ্ঠিত দেখা যায়। বর্ণবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ সেখানে প্রকট। সে তুলনায় আমরা সাম্প্রদায়িকতা দোষে কম দুষ্ট। বাংলাদেশে যদি সাংস্কৃতির বিকাশ কিভাবে হয়েছে দেখতে চান, তাহলে প্রথমেই রাজনীতিকে দেখতে হবে। আজ এদেশের আওয়ামীলীগের অঙ্গীকার আর জামাতের রাজনৈতিক অঙ্গীকারে অনেকখানি মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি। অথচ আমাদের বুদ্ধিজীবিদের এ বিষয়ে বিশেষ সচেতনতা লক্ষ করা যায় না।

বিজ্ঞানচেতনা, জানুয়ারি–ডিসেম্বর ১৯৯৮

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice