বঙ্গসাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে বঙ্গসাহিত্য সম্বন্ধে দুটি বক্তৃতা লিখতে অনুরোধ করেছেন। আমিও তাতে স্বীকৃত হয়েছি।

বঙ্গসাহিত্য সম্বন্ধে অসংখ্য সন্দেহ এবং তর্কের অবসর আছে। প্রথম কথা হচ্ছে, সাহিত্য আমরা কা'কে বলি?—প্রসিদ্ধ ইতালীয় দার্শনিক Benedetto Croce একটি পুস্তিকা লিখেছেন, তা'তে তিনি প্রথমেই এই প্রশ্নটি করেছেন—Che cosa e arte? অর্থাৎ Art বস্তুটি কি? এবং উত্তরে যা বলেছেন, তা' সকলেই জানে; কিন্তু তাঁর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধিকাংশ লোকেই ভুল করে। এর পর তিনি Art-এর আটদশ রকম ব্যাখ্যার উল্লেখ করেছেন; ও অবলীলাক্রমে প্রত্যেকটি খণ্ডন করেছেন। এবং শেষে আর্ট বলতে কি বোঝায়, সে বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছেন।

বলা বাহুল্য এটি একটি দার্শনিক প্রশ্ন। আমি সাহিত্য সম্বন্ধে অনুরূপ প্রশ্ন তুলবও না, তার কোন উত্তরও দেব না। কারণ আমি ধরে নিচ্ছি যে, সাহিত্য কা'কে বলে, তা' আপনার। সকলেই জানেন। এ'তে আমার বক্তব্য সহজেই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসবে।

এ বক্তৃতায় বাচালতা করবার বিশেষ সুযোগও নেই। কারণ বাঙ্গল। সাহিত্য বিপুল নয়। আমি পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্বের "বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস" সকলকে একবার পড়ে দেখতে অনুরোধ করি। তা'তেই দেখতে পাবেন যে, বাঙ্গলা সাহিত্যের দেহ কতদূর কৃশ। ইংরাজী সাহিত্য, ফরাসী সাহিত্য, ইতালীয় সাহিত্যের তুলনায় বঙ্গসাহিত্যের বয়স অতি অল্প। পণ্ডিতমশায় আমাদের সাহিত্যের আদ্যকাল, মধ্যকাল ও ইদানীন্তনকাল আলোচনা করেছেন। কৃত্তিবাস হচেছন তাঁর মতে বাঙ্গলার একজন আদি লেখক। আর বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কালের মুখ্য লেখক।

আমি বঙ্গসাহিত্যকে দুই যুগে বিভক্ত করি। এক নবাবী আমলের সাহিত্য; আর এক ইংরাজী আমলের সাহিত্য। নবাবী আমলের পিছনে যাবার জো নেই। কিছুকাল পূর্ব্বে দোহাকোষ ও চর্যাপদ নামক দু'খানি পুস্তিকা নেপালে আবিষ্কৃত হয়েছে। এর একখানি দোহাকোষ-বিশেষজ্ঞদের মতে বাঙ্গলা ভাষায় লিখিত নয়। যদি ধরে নেওয়া যায় যে দু'খানির ভাষাই বাঙ্গলা, তাহলেও এ পদাবলীকে কোনমতেই সাহিত্য বলা চলে না। দ্বিতীয়তঃ, এগুলি যে কবে রচিত হয়েছিল, তাও ঠিক জানা নেই। সুতরাং আমি বর্তমান বক্তৃতার শুধু নবাবী ও ইংরাজী আমলের সাহিত্যেরই মোটামুটি পরিচয় দেব।

সাহিত্যমাত্রই কোন-না-কোন ভাষায় রচিত হয়। সুতরাং সাহিত্য সম্বন্ধে আলোচনার অন্তরে ভাষার আলোচন। থাকে। নীরব কবি বলে' কোন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। এখন এই বাঙ্গলা ভাঘার উৎপত্তি সম্বন্ধে অনেকেরই কৌতূহল আছে। এবং পাঠকের সে কৌতূহল চরিতার্থ কর'তে পারেন philologistরা। বাঙ্গলা ভাষা সংস্কৃতের বংশধর নূয়। মাগধী প্রাকৃত কালক্রমে অল্পবিস্তর রূপান্তরিত হয়ে বাঙ্গলা ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঙ্গলা ভাষার বর্তমান রূপ কি, তা' এখন বলা যাক্।

কতকগুলি শব্দসমষ্টিকে ভাষা বলা যায় না। সে শব্দসমষ্টির পরস্পর যোগের নিয়মই ভাষার মূল কথা। ভাষা মাত্রেরই অন্তরে অন্য ভাষার নানা শব্দ আছে। আমাদের বাঙ্গলা ভাষাও নানা পরভাষার শব্দ অঙ্গীকার করেছে। প্রাচীন পণ্ডিতগণ বল্বেন যে, বাদলা ভাষার অন্তরে বহু তৎসম, তদ্ভব ও দেশী শব্দ আছে। তৎসম হচ্ছে অবিকৃত সংস্কৃত শব্দ, যথা "বিবাহ"। তদ্ভব হচ্ছে সংস্কৃত হ'তে উৎপন্ন শব্দ, যথা "বিয়ে"। আর দেশী শব্দ হচ্ছে "চুড়ি কুলো ডালা” প্রভৃতি। এতদ্ব্যতীত আমাদের ভাষায় নানা বিদেশী শব্দ আছে, যথা পাশী, আরবী, পর্তুগীজ, ফরাসী, ওলন্দাজী, ইংরেজী ইত্যাদি; -অর্থাৎ আমাদের দেশ যাঁরা যাঁরা ভিন্ন সমরে অংশতঃ অধিকার করেছেন, তাঁদের ভাষার শব্দ।

এই সব বিদেশী শব্দ বাঙ্গলায় এমনি মিশে গেছে যে, সেগুলি কোন ভাষা থেকে গৃহীত তা' অনেক সময় বোঝা যায় না। এর ফলে বাঙ্গলা ভাষার ঐশ্বর্য্য-বৃদ্ধি হয়েছে। এ সব শব্দকে স্বভাষা থেকে এখন বহিষ্কৃত করবার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। এবং আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতে ইংরেজী শব্দ আরো বেশী পরিমাণে আমাদের ভাষায় ঢুকে যাবে। লেখায় আমরা কোন শব্দ কোথায় ব্যবহার করব, তা' লেখকের রুচির উপর নির্ভর করে।

আমাদের ভাষার মূলধন

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice