কর্তব্য
অনেক রাত্রে কে যেন এসে হোটেলে উঠল। অন্ধকারে ঘরের ভিতর সে নড়াচড়া করছে, আমার পাশের ফাঁকা বিছানাটায় শোবার জন্য তৈরী হচ্ছে।
আধঘুমন্ত অবস্থায় শুনতে পাচ্ছি নতুন লোকটি তার জমে যাওয়া বর্ষাতি চুল্লীর কাছে ঝুলিয়ে দেবার চেষ্টা করল, ব্রীফকেসটা—নাকি ফীল্ড ব্যাগ—বালিশের তলে ঢুকিয়ে দিয়ে বিছানায় বসে মোটা বুটগুলো খুলতে সুরু করল।
বর্ষাতি আর বুটজোড়ায় কড়া হিমের গন্ধ। হিমে বোধ হয় একেবারে জারিয়ে গেছে, তামাকের গন্ধে লোকের জামাকাপড় যেমন হয়।
পুরোপুরি জেগে গেলাম। বিরক্তির সঙ্গে মনে পড়ল তিনদিন ধরে চলেছে জানুয়ারীর সেই সাংঘাতিক বরফঝড়।
পাহাড়ের গ্রামগুলোয় গাড়ি ঘোড়া হাঁটাচলা সব বন্ধ।
আমার প্রতিবেশী শুয়ে পড়ল। তার শরীরের ভারে করুণ আর্তনাদ তুলে ঝুলে পড়ল বিছানাটা।
সবকিছু তারপর নিশ্চুপ। আমার চোখে ঘুম নেই। শুয়ে শুয়ে ঝড়ের শব্দ শুনছি, যে ঝড় মাঝরাত্তিরে আমার এই নতুন পড়শীকে এখানে নিয়ে এসেছে। লোকটি নিশ্চয়ই কোন কাজে এসেছে।
তারপর ভাবতে সুরু করলাম ছোট্ট সাধারণ একটি কথা ‘কর্তব্য’ অথচ তার কী অসীম শক্তি। এই একটি কথা, ইচ্ছা ও সময়ের কথা না ভেবে লোককে কাজে উদ্বুদ্ধ করে, দুর্বলকে শক্তি জোগায়, শান্তশিষ্ট লোককে একরোখা করে তোলে। একটা আদেশ দেওয়া হল, অমনি লোকেরা হয় হোঁটে নয় গাড়ি চড়ে বেরিয়ে পড়ল কোথায় কে জানে। একেক সময় এমন সব বাধা বিঘ্ন জয় করে, নিজের ইচ্ছায় বেড়াতে বেরলে লোকে যা কক্ষনো পারত না।
এই সব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
যখন ঘুম ভাঙল তখন পুরোবেলা হয়ে গেছে। ঘরের ভিতর আমি আর নবাগত লোকটি ছাড়া আর কেউ নেই।
লোকটি তখন খাটের ধারে বসে মগের চায়ে চুমুক দিচ্ছিল—মিলিসিয়ার এক কট্টর মেজর, মাথাটা পরিষ্কার করে কামান, ভুরুদুটো লালচে।
চোখাচোখি হল। দুজনেই হাসলাম। দুজনেই কেমন একটু যেন অস্বস্তি অনুভব করলাম। দুজনেই দুজনকে অনেক দিন থেকেই দেখে এসেছি, কিন্তু কখনো আলাপ হয়নি।
‘জগৎটা ছোট!’ বলে মেজর তার ফোলা বসন্তের দাগওয়ালা হাতটা বাড়িয়ে দিল। ‘আমার নাম স্তেপান্যুক, ইভান রোমানভিচ।’
স্তেপান্যুককে দেখে মনে হল, যারা বুদ্ধির দীপ্তির জোরে বা হঠাৎ দৈবক্রমে উপরে ওঠে সে তাদের দলের নয়। সে হচ্ছে তাদেরই দলে যারা বহুবছর ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে তবে উপরে ওঠে। এ জাতের লোক খুব বিশ্বস্ততার সঙ্গে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাজ করে চলে, এদের কাজে বুদ্ধির পরিচয়ও পাওয়া যায়, কিন্তু সূক্ষ্ম অনুভূতি জিনিসটা এদের কাছ থেকে কেউ আশা করে না।
‘এখানে বেশ কয়দিন থাকবেন?’
‘না, যাবার পথে এলাম,’ স্তেপান্যুক বলল, ‘সপ্তাহ খানেক হল এই জেলায় এসেছি। আর একটা গ্রামে এখনো যাওয়া বাকি আছে।’
যে গ্রামের নাম করল সেটা আমি যেদিকে যাব সেইদিকেই পড়ে। কিন্তু ঝড়ে আমি আটকা পড়ে গেছি।
স্নেগোভেৎসে হয়ত আরো কয়েকদিন থেকে যেতে হবে, এই আশংকা জানালে পর স্তেপান্যুক বলল, ‘আপনার কথা স্বতন্ত্র। আপনার সময় আপনার নিজের হাতে। অথচ আমার হাতে মাত্র দুটি দিন আছে। আজকেই ওখানে যাবার চেষ্টা করব।’
‘কী করে যাবেন?’
‘কাঠবওয়া গাড়ি ওদিকে যাবে। কাল রাত্রেই ওদের সঙ্গে ব্যবস্থা করে নিয়েছি।’
‘তবে আমিও আপনার সঙ্গে যাব।’
‘আচ্ছা,’ মেজর রাজী হয়ে বলল। ‘সঙ্গী পেলে হিমও গরম হয়ে ওঠে।’
চা শেষ করে মেজর উঠে পড়ল গাড়ির তদারকীতে।
দাড়ি কামান আর জামাকাপড় পরা সারতে সারতেই মেজর ফিরে এল। দুঘণ্টার মধ্যেই একসার কাঠবওয়া গাড়ি রওনা হবে। ড্রাইভাররা হোটেলের সামনে এসে হর্ণ দেবে বলেছে।
মেজর আর আমি ঠিক করলাম এই ঘরেই বসে থাকব। কারণ স্নেগোভেৎসের চায়ের ঘরের কথা মনে করে দুজনেরই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসার জোগাড়।
‘সত্যিই, চায়ের ঘরটা মোটেই তেমন ভাল নয়,’
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments