বিরজা হোম ও তার বাধা

ভৈরব চক্রবর্তীর মুখে এই গল্পটি শোনা। অনেকদিন আগেকার কথা। বোয়ালে-কদরপুর (খুলনা) হাই স্কুলে আমি তখন শিক্ষক। নতুন, কলেজ থেকে বার হয়ে সেখানে গিয়েছি।

ভৈরব চক্রবর্তী ওই গ্রামের একজন নিষ্ঠাবান সেকেলে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। সকলেই শ্রদ্ধা করত, মানত। এক প্রহর ধরে জপ আহ্নিক করতেন, শূদ্রযাজক ব্রাহ্মণের জল স্পর্শ করতেন না, মাসে একবার বিরজা হোম করতেন, টিকিতে ফুল বাঁধা থাকত দুপুরের পরে। স্বপাক ছাড়া কারও বাড়িতে কখনো খেতেন না। শিষ্য করতে নারাজ ছিলেন, বলতেন শিষ্যদের কাছে পয়সা নিয়ে খাওয়া খাঁটি ব্রাহ্মণের পক্ষে মহাপাপ। আর একটি কথা, ভৈরব চক্রবর্তী ভালো সংস্কৃত জানতেন, কিন্তু কোনো ইস্কুলে পণ্ডিতি করেননি। টোল করাও পছন্দ করতেন না। ওতে নাকি গভর্মেন্টের দেয় বৃত্তির দিকে বড়ো মন চলে যায়। টোল ইন্সপেক্টরের খোশামোদ করতে হয়। তবে দু-টি ছাত্রকে নিজের বাড়িতে খেতে দিয়ে ব্যাকরণ শেখাতেন।

বর্ষা সে-বার নামে নামে করেও নামছিল না। দিনে-রাতে গুমোটের দরুন আমরা কেউ ঘুমুতে পারছিলাম না। হঠাৎ সেদিন একটু মেঘ দেখা দিল পূব-উত্তর কোণে। বেলা তিনটে। স্কুল খুলেছে গ্রীষ্মের ছুটির পরে। কিন্তু এত দুর্দান্ত গরম যে, পুনরায় সকালে স্কুল করার জন্য ছেলেরা তদবির করছে, মাস্টারদেরও উস্কানি তাতে আছে বারো আনা। হেডমাস্টার অফিসঘরে বসে আছেন। গোপীবাবু ইতিহাসের মাস্টার, গিয়ে উত্তেজিতভাবে বললেন— স্যার মেঘ করেছে—

মুরলী মুখুজ্যে (এই নামেই তিনি ও-অঞ্চলের ছাত্রদের মধ্যে কুখ্যাত) গম্ভীর স্বরে বললেন— কীসের মেঘ?

—আজ্ঞে, মেঘ যাকে বলে।

—কী হয়েছে তাতে?

—আজ্ঞে, বৃষ্টি হবে। স্কুলের ছুটি দিলে ভালো হত। ছেলেরা অনেক দূর যাবে, ছাতি আনেনি অনেকে।

—বৃষ্টি হবে না ও-মেঘে।

খাস ইন্দ্রদেবের অফিসের হেড কেরানিও এতটা আত্মপ্রত্যয়ের সুরে এ-কথা বলতে দ্বিধা করত বোধ হয়। কিন্তু সকলেই জানে মুরলী মুখুজ্যের পাণ্ডিত্যের সীমাপরিসীমা নেই, আবহাওয়া তত্ত্বটি তাঁর নখদর্পণে। গোপীবাবু দমে গিয়ে বললেন— বৃষ্টি হবে না!

—না।

—কেন স্যার? বেশ মেঘ করে এসেছে তো?

—মেঘের আপনি কী বোঝেন? ওকে বলে তাতমেঘা। ও মেঘে বৃষ্টি হবে না।

আমিও পাশের শিক্ষকদের বিশ্রামকক্ষ থেকে জানলা দিয়ে মেঘটা দেখেছিলাম এবং আসন্ন বৃষ্টির সম্ভাবনাতে পুলকিত হয়েও উঠেছিলাম। মুরলী মুখুজ্যের নির্ঘাত রায় শুনে আমি তাড়াতাড়ি বাইরে এসে বললাম— বৃষ্টি হবে বলে কিন্তু মনে হচ্ছে।

মুরলী মুখুজ্যে বললেন— তাতমেঘা। মেঘ হলেই বৃষ্টি হয় না।

—কোন মেঘে বৃষ্টি হয়?

—এখন বৃষ্টি হবে আলট্রোস্ট্রটোস মেঘে। যাকে বলে শিট-ক্লাউড।

—ও!

—তা ছাড়া হাওয়া বইছে দক্ষিণ থেকে। মনসুনের আগে হাওয়া ঘুরে যাবে পুবে।

—ও!

আর কোনো কথা বলতে আমাদের সাহস হল না। কিন্তু ইন্দ্রদেব সেদিন বড়োই অপদস্থ করলেন আবহাওয়া-তত্ত্ববিদ মুরলী মুখুজ্যেকে। মিনিট পনেরোর মধ্যেই মেঘের চেহারা ঘন কালো হয়ে উঠল। মেঘের চাদর ঢাকা পড়ল আরও ঘন আর-একখানা মেঘের চাদরে। তারপর স্কুলের ছুটি হওয়ার সামান্য কিছু আগেই ঝম-ঝম করে মুষলধারে বর্ষা নামল। পুরো দু-টি ঘণ্টা খাল-বিল-নালা-ডোবা ভাসিয়ে রাম বৃষ্টি হওয়ার পরে বেলা সাড়ে-পাঁচটার সময় আকাশ ধরে গেল। ছেলেরা তখনও পর্যন্ত স্কুলেই আটকে ছিল। কোথায় আর যাবে! সবাই আমরা আটকে পড়েছিলাম।

গোপীবাবু জয়গর্বে উৎফুল্ল হয়ে মুরলী মুখুজ্যেকে গিয়ে বললেন— দেখলেন স্যার, তখন বললাম বৃষ্টি আসবে, তখন ছুটিটা দিয়ে দিলে আর এমন হত না।

মুরলীবাবু বললেন— অমন হয়ে থাকে। ইতিহাস পড়ান, হায়ার ম্যাথামেটিকস পড়ালে বুঝতেন। জগতে স্পেস অ্যান্ড টাইম নিয়ে অনেক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। এডওয়ার্ড গার্নেটের প্রবন্ধ পড়ে দেখবেন এ বছরের ম্যাথামেটিক্যাল গেজেট-এ! বুঝলেন?

—সেটা কী?

—’অ্যালিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ড’ পড়েছেন তো? অঙ্কশাস্ত্রে অ্যালিস (থ্রু) দা লুকিং গ্লাসের পরীক্ষা আর কী। পড়ে দেখুন।

গোপীবাবু চলে গেলেন। অঙ্কশাস্ত্রের কথা উঠলেই স্বভাবত তিনি সংকুচিত হয়ে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion