বারিক অপেরা পার্টি
সকালবেলা।
একজন কাঁচা-পাকা দাড়িওয়ালা মুসলমান আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললে —সালাম বাবু।
—কে তুমি?
—আমার নাম বারিক মণ্ডল, বাড়ি চালদী। আপনার কাছে এটু আলাম—
—কেন?
—ধানি জমি কিনবেন? পঞ্চাশের মন্বন্তর তখনো উগ্র হয়ে ওঠেনি, দিকে দিকে ওর আগমনবার্তা অল্পে অল্পে ঘোষিত হচ্ছে। একটা ব্যাপার শেষ না-হয়ে গেলে বোঝা যায় না সেটা কত বড়ো হল। সবাই ভাবছে, এ দুর্দিনের অভাব-অনটন শিগগির কেটে যাবে। এ সময়ে ধানের জমি কেনা মন্দ নয়, সামনেই শ্রাবণ মাস, জলবৃষ্টিও বেশ হচ্ছে, কিনেই ধান রোয়া হতে পারে এবারই। চালের দাম পঁচিশ টাকা মণ, তাও সহজপ্রাপ্য নয়। কলকাতা থেকে বোমার ভয়ে পালিয়ে এসে বাড়ি বসে আছি। হয়তো কলকাতা শহর জাপানি বোমার ঘায়ে ছত্রাকার হয়ে যাবে, দেশেই থাকতে হবে বরাবর। দেশে ধানি জমির নিতান্ত অভাব, যা আছে তা নিয়ে কাড়াকাড়ি চলচে।
বললাম—জমি কোথায়? কতটা?
—চালদীর মাঠে। তা বলি আপনার কাছেই যাই, ওঁর জমির যদি দরকার থাকে। সাত বিঘে জমি বাবু। বিক্রি করবে আমাদের গাঁয়ের সোনাই মণ্ডল।
—তুমি তার কেউ হও?
—না বাবু। ওর মধ্যে দু-বিঘে ভিটে জমি আছে, সে জমিটুকুতে আমি খাজনা দিয়ে বাস করি। জমিটা কিনলে আমি আপনার ভিটের প্রজা হব। দু-টাকা করে খাজনা করি। ধানের জমিটা আপনাকে সস্তায় করে দোব বাবু। আমাকে ধানের জমিগুলো কিন্তু ভাগে দিতে হবে। আর যদি আপনি নিজে চাষ করেন তো আলাদা কথা—
কলকাতা থেকে নতুন এসে বহুদিন পরে দেশে বসেছি, জমিজমার ব্যাপার তত বুঝিনে। ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝবার চেষ্টা করলাম। চালদীর বারিক মণ্ডল আমার কাছে এসেচে কিছু জমি বেচতে। ওর জমি নয়, সোনাই মণ্ডলের জমি। ও এসেছে কেন, এতে ওর স্বার্থ কী? না, ও আগে থেকেই এই জমার অন্তর্ভুক্ত দু-বিঘে জমিতে বাস করে, জমি নিলে ও আমার প্রজা হবে এবং আমি ওকে ধানের জমির ভাগীদার করব। বেশ কথা। বারিকের চেষ্টায় ও আমার ইচ্ছায় তিনদিনের মধ্যে জমি কেনা হয়ে গেল।
রেজেষ্ট্রি অফিসে যে দলটি জমি রেজেষ্ট্রি করতে গিয়েছিল বারিক মুসলমান দেখলুম তার মোড়ল। মহা ফুর্তিবাজ লোক সে। আধ-বুড়ো লোক হলে কী হয়। দাড়ি নেড়ে নেড়ে পান খাচ্চে, বিড়ি খাচ্চে, বেগুনি খাচ্চে, ফুলুরি খাচ্চে। রেজেস্ট্রি শেষ হয়ে গেলে বারিক আমায় ডেকে বললে—বাবু, এটুখানি দোকানে চলুন।
—কোন দোকান?
—জল খাবেন এট্টু।
জল খাওয়ানোর প্রথা আছে এদেশে, যে জমি কেনে, সে-ই মনের ফুর্তিতে সাক্ষী ও শনাক্তকারীকে মিষ্টিমুখ করায়। যে জমি বেচে সে তো রিক্ত হয়ে গেল, সে খাওয়াবে কেন? এ কথা তো এদেশে নেই। কিন্তু বারিকের আনাড়ি ধরনের বিনীত গ্রাম্য অনুরোধ এড়াতে না-পেরে খাবারের দোকানে বসলাম।
—দ্যাও, ও দোকানি বাবুরি (অর্থাৎ বাবুকে) নিমকি, সেঙ্গারা, সন্দেশ দ্যাও। আর ওই যে হ্যাদে গোল গোল তোমার, ওকী কী বলে, ওই দ্যাও একপোয়া নুচি খাবেন বাবু? হ্যাদে বাবুরি নুচি দ্যাও আটখানা—ভাজা নেই? তা ভেজে দ্যাও—
দেড় টাকা খরচ গেল শুধু আমার পিছু। খাবার খরচ গেল টাকাচারেক। বারিক মহাফুর্তিতে এক টাকার খাবার নিজেই খেলে।
সন্ধ্যা হয়ে গেল। সবাই মিলে অন্ধকারে বাড়ির দিকে রওনা হই। বারিক অন্ধকার পথে গান জুড়ে দিলে চেঁচিয়ে—
‘ওগো হরি বংশীধারী শ্যাম লটবর—‘
সোনাই মণ্ডল বাজার থেকে বড়ো দেখে দুটো ইলিশ মাছ কিনেচে, কারণ আজ তার হাতে কড়কড়ে আড়াইশো টাকা। জমি ওরা নাকি খুব সস্তায় দিয়েছে আমাকে। দলিল-লেখক আমাকে আড়ালে বলেছিল—আড়াইশো টাকায় সাত-আট বিঘের জমি কিনেছেন, তার মধ্যে পাঁচ বিঘে আমন ধানের জমি। সাব রেজিস্ট্রারবাবু এ দলিল এখন মঞ্জুর করলে হয়, দামটা কম বলে মনে হচ্ছে কিনা—
যা হোক,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments