আমার জেলজীবনের কথা

হেমন্তের অপরাহ্ণ। নির্মেঘ আকাশে অপূর্ব প্রশান্তি। হলদে রোদে কী এক মিষ্টি আমেজ।

এমন অপরাহ্ণে গারদের মধ্যে মন হাঁপিয়ে ওঠে।

কেরোসিনের কাঠের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বারান্দায় বসলাম। শেফালিতলায় জমা ফুলগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। মরশুমি ফুলের নূতন চারাগুলো মাটির সাথে মিশে রয়েছে। কতগুলো দাঁড়কাক ড্রেনে নেমে প্রচণ্ড সোরগোল বাধিয়ে তুলেছে।

আমাদের পশ্চিমদিকে হাজতের তিনতলা দালান। হঠাৎ সেদিক থেকে চিৎকার ভেসে আসে। চোখ ফিরিয়ে দেখি কতগুলো লোক কিসের উপর বেশ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। যারা দাঁড়িয়ে আছে ঊর্ধ্বলোকে ঘুসি ছুড়ছে। গেট-পাহারা ছুটে এল। সিপাহি ছুটে এল। ডানে বাঁয়ে বেদম প্রহার চলল।

এক নিমিষে সমস্ত চিৎকার থেমে গেল। হাজতিরা যে যার জায়গায় গিয়ে ভিজে বিড়ালের মতো বসে পড়ল। যে-লোকটাকে কেন্দ্র করেএত হট্টগোল অবশেষে তাকে টেনে তোলা হল। । দেখলাম তার জামাকাপড় গিয়েছে ছিঁড়ে। মুখটা রক্তাক্ত। কোমরে দোয়াল-আঁটা মেট সেই অবস্থাতেই তার উপর আর-এক চোট হাতসুখ করে নিল। বেচারা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মেটের পায়ে লুটিয়ে পড়ল।

কারাগারের সাধারণ কয়েদিদের জীবনেরিক কথায় দিতে গেলে বলতে হয়-'ডাইল আইল, ফাইল।' 'ডইিল খায়। ডাইলের সাথে আইল খায়। আর 'আইলের সাথে প্রহারটা প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক। ফাইলটা খাদ্যবস্তু নয়। কিন্তু কয়েদিজীবনের দুর্বিষহ অভিশাপ।

এই ডাইল-ফাইলের পাল্লায় পড়েছিলাম একবারই। ১৯৪৮ সালের মে মাসে ময়মনসিংহ জেলে।

সেই আমার প্রথম কারাপ্রবেশ। কায়দাকানুন কিছুই জানি না। এটুকু শুনে রেখেছিলাম যে, জায়গাটা তেমন ভয়ংকর কিছু না। তবে রাজনৈতিক কয়েদিদের মর্যাদাটা নিজেরই আদায় করে নিতে হয়।

প্রথমেই গিয়ে পড়লাম ফাইলের পাল্লায়। জোড়া জোড়া করে পায়ের গোড়ালির উপর বসে পড়তে হবে। তারপর জমাদার বা সিপাহি এক দুই করে গুনে যাবে। ছাত্রসম্মেলন করতে এসে আমরা ৭ জন ছাত্র ধরা পড়েছিলাম। আমরা বললাম-সে কী? গুনতেই যদি হবে তো ওরকম হাঁটু গেড়ে বসতে হবে কেন? দাঁড়িয়ে আছি, গোনা-গুনতি যা করার করে নাও। আমাদের চোখা-চোখা কথা শুনে অথবা নেহায়েত ভদ্র চেহারাগুলো দেখে জমাদার আর বিশেষ উচ্চবাচ্চ করল না। গেইটে গুনতির পালা শেষ করে জেলের ভিতরে এসে ডাইলের পাল্লায় পড়লাম।

সময়টা ছিল সন্ধ্যা। ঘরের ভিতর ঢুকতে ঢুকতে রাত হয়ে গিয়েছে। লোহার থালে করে আমাদের ভাত দেওয়া হল। ভাতের একপাশে একপ্রকার না-তরল না-শক্ত কালো রঙের পদার্থ। স্পর্শ করার প্রবৃত্তি হল না। তবু কৌতূহলবশত আঙুল ঠেকিয়ে বুঝলুম ওটা ডাল। লোহার থালাগুলো হঠাৎ কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার বলে ভুল হয়। একে তো ঘরে ঢুকেই বমি আসার উপক্রম। পেচ্ছাব, পায়খানা, গায়ের ঘাম, ময়লা কম্বল আর অনেকগুলো মানুষের ঠাসাঠাসি ও তপ্ত নিশ্বাস মিলিয়ে ঘরের মধ্যে যে-বিশেষ দুর্গন্ধটি তার বিশেষ কোনো নামকরণ অথবা বিবরণ সম্ভব নয়।

ঐ গুমোট দুর্গন্ধে লোহার থালাভর্তি ঠাণ্ডা ভাতগুলো সামনে দিয়ে সেদিন চোখে পানি এসেছিল। আর তখুনি মনে পড়েছিল মায়ের কথা দেশের বাড়ি সোজা ময়মনসিংহ এসেছিলাম। আসার দিন পুকুর থেকে একটা বড় রুইমাছ তোলা হয়েছিল। সেই মাছের আস্ত মাথাটি আমার মা বসে বসে খাইয়েছিলেন আর নানা উপদেশ দিচ্ছিলেন, আমার যেন সুমতি হয়।

অনাহারেই প্রথম দিনের ডাইলের ফাইল শেষ হল।

ক্লান্ত ছিলাম। দুর্গন্ধটাও কিছুক্ষণ পর গা-সওয়া হয়ে এসেছিল। কিন্তু ঘুমুতে পারনি গুনতির ঠেলায়। ৭ ৭ বন্দিতে মিলে সারারাত বসে বসে গল্প করেই কাটিয়ে দিলাম। ভোররাত্রের দিকে একটু চোখ বন্ধ হয়ে এল। কিন্তু দুড়ুম দাড়ুম শব্দে তক্ষুনি জেগে উঠলাম।

অসময়ে ঘুম ভাঙানোর কৈফিয়ত চেয়ে যে জবাব পেলুম তার মর্মার্থ উপলব্ধি করে প্রমাদ গনলুম, অর্থাৎ আবার ফাইল করতে হবে, গনতি দিতে হবে।

বললুম-রাত শেষ হতে তো অনেক দেরি। এখুনি আবার গনতি কেন? ওয়ার্ড পাহারা অনেকক্ষণ ধরে আমাদের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বুঝল

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice