যাচাই
গোরুরগাড়ি ঢুকল চাঁদপুর গ্রামের মধ্যে। ননীবালা ছেলেকে বললে—বাবা, চেয়ে দ্যাখো
—ঘুমুইনি মা। চেয়ে আছি—
—এই গাঁয়ের সীমানা। ওই গেল দুলেপাড়া—
—ব্রাহ্মণপাড়া কতদূর?
—আরও আগে।
ননীবালার সারা দেহেমনে একটি অপূর্ব অনুভূতির শিহরণ!
মনে পড়ল আজ ত্রিশ-বত্রিশ বছর পূর্বে একদিন এই গ্রামে নববধূরূপে ঢুকবার সেই দিনটির কথা। তিনি ছিলেন পাশে—আজ যেমন ছেলে সুরেশ তার পাশে বসে রয়েছে। তেমনি মুখচোখ, তেমনি চোখের দৃষ্টি, বয়েসও তাই।
চাঁদপুর গ্রামে ঢুকবার কিছু পরেই কাক-কোকিল ডেকে ভোর হয়ে গেল। সুরেশ গাড়ি থেকে নেমে গাঁয়ের পথের ধুলো তুলে মাথায় দিলে। মাকে বললে—তোমরা কতদিন গাঁ থেকে গিয়েছিলে?
—তোর বয়েস।
—একুশ বছর?
—হ্যাঁ। ওঁর ইস্কুলের চাকরি গেল—আমরা এখানকার মায়া কাটালুম।
—বাবা দুঃখ করেননি?
—আহা! মরবার আগেও প্রায়ই বলতেন—বড়ো বউ, একবার যদি চাঁদপুর যেতে পারতাম ফিরে, তবে বোধহয় কিছুদিন আরো বাঁচতাম। ওখানে এখনো চৈত্র মাসের দুপুরে বুড়িমা কুলচুর শুকুচ্চে রোদুরে। বাঁশবনে কত কোকিল পাপিয়া ডাকচে। আমি গাঁয়ে যাব। শহরের ছোট্ট বাসার মধ্যে উনি চিরকাল হাঁপিয়ে এসেছেন। আর তেমনি গরম সেখানে।
—আমি যদি তখন বড়ো হতাম, বাবাকে বাবার জন্মভূমিতে ঠিক নিয়ে আসতাম বলে দিচ্চি।
সুরেশ ছিপছিপে চেহারার শক্ত হাতপাওয়ালা যুবক। ফুটবল খেলে ভালো। দেশ স্বাধীন হবার পরে রাইফেল ক্লাবে যোগ দিয়ে খুব রাইফেল ছোড়া অভ্যেস করচে। এইবার রেলের শিক্ষানবিশি শেষ করে ভালো চাকুরি একটা পাবে। শিক্ষানবিশির সময়েই ও খেলোয়াড় হিসেবে রেলের উপনিবেশের শহরটির অনেক বড়ো বড়ো অফিসারের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছে। শিক্ষানবিশির ছাত্রও সে ভালো—অঙ্ক বেশ ভালো জানে বলে অঙ্কের টুইশানিতে মাসে আজকাল সত্তর-আশি টাকা রোজগার করে।
স্বামী মারা গিয়েচেন আজ দশ-এগারো বছর। সুরেশ তখন দশ বছরের ছেলে, নীচের ক্লাসে পড়ে। কী আতান্তরেই ফেলে গিয়েছিলেন সেদিন! মনে হয়নি যে আবার একদিন এ ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারা যাবে! রেল উপনিবেশের সকলেই খুব দয়া করলেন। একটা বাসা দেখে দিলেন, কারণ রেলের কোয়াটার ছাড়তে হল, ইনস্টিটিউটের সেক্রেটারি রায় বাহাদুর হরিচরণ বসু নিজে দেখাশোনা করলেন। সুরেশের লেখাপড়া যাতে বন্ধ না-হয়, যাতে এ গরিব অসহায় পরিবারটি অনাহারের পথ থেকে রক্ষা পায়—এ সমস্তই ওখানকার বড়ো বড়ো লোকেরা করলে। সে-সব দিনের কথা ভাবলে জ্ঞান থাকে না। এমন দিনও আসে মানুষের জীবনে!
আজ মনে হচ্চে সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে এসে অদূরে এবার কুলরেখা যেন দেখা দিয়েছে। ওরা সবাই বলে আমাদের দেশ এখন স্বাধীন, আর সে-যুগের মতো কষ্ট করতে হবে না। এখন ছেলেপিলেদের ভালো চাকুরি হবে, চাকুরিতে উন্নতি হবে, আগের মতো অল্প মাইনেতে ঘষটাতে হবে না। না-খেয়ে মরবে না কেউ এ স্বাধীন। ভারতের মাটিতে। অনেক বড়ো বড়ো আশার কথা সে শুনেচে, ছেলে-ছোকরারা কত মিটিং করে, বক্তৃতা দেয়। গান্ধীজির ছবিতে মালা দিয়ে গান করতে করতে শহর ঘুরে বেড়াল এই তো সেদিন। তাঁর মৃত্যুর পরে সেদিন এক বৎসর বুঝি ঘুরল। সুরেশও চমৎকার গান গাইতে পারে। আর একটা গান গায় সুরেশ, গান্ধীজি নাকি বড়ো ভালোবাসতেন। সবাই বলে, রামধুন গান।
রঘুপতি রাঘব রাজারাম
পতিতপাবন সীতারাম।
ভোরের আলো বেশ ফুটেছে। সামনের পুরোনো কোঠাবাড়িটা থেকে একজন বার হয়ে এসে পথের ওপর দাঁড়িয়ে ওদের গোরুরগাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলে। ননীবালা চুপিচুপি বললে—ও সুরেশ, ওই বোধহয় তোর বিনোদ কাকা, ওঁর খুড়তুতো ভাই। আমি চিনেচি। তুই এগিয়ে যা। পরিচয় দিয়ে প্রণাম করবি। ওঁকেই চিঠি দেওয়া হয়েছিল।
মিনিট পনেরো কেটে গেল উভয়ের কথাবার্তায়—সুরেশ আর তার বিনোদ কাকার। তারপর বিনোদ কাকা এগিয়ে এসে ননীবালাকে আদর করে বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেলেন।
বহুদিন পরে গ্রামের বউ গ্রামে ফিরে এসেচে। আজ কুড়ি-একুশ বছর পরে। গ্রামের বউ-ঝি দেখা করতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments