বুড়ো হাজরা কথা কয়

সকালবেলা পাঁচুদাসী বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল।

সারাদিন নৌকো বেয়েছে মাঝি, সন্ধ্যায় বনগাঁ ইস্টিশানে এসে পৌঁছায়। কতদূরে যেতে হবে তা সে জানত না। কত জলকচুরির দামের ওপর পানকৌড়ি বসে থাকা, ঝিরঝিরে-হাওয়ায়-দোলা বাঁশবনের তলা দিয়ে দিয়ে নৌকো বেয়ে আসা; জলকচুরির নীল ফুলের শোভায় গলুসি-বদ্দিপুরের চর আলো করে রেখেছে; কত বন্যে-বুড়োর গাছে গাছে ঠাণ্ডা নদীজলের আমেজে বকের দল, পানকৌড়ির দল বসে ঠিক যেন ঝিমুচ্চে।

পাঁচুদাসীর স্বামী উদ্ধব দাস বেশ জোয়ান-মদ্দ লোক। বৈষ্ণব কবিতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই ওর—শক্ত হাত-পা, এই লম্বা এই চওড়া বুক, এই হাতের গুলি, এই বাবরি চুল। জাতে কাপালী, বন-জঙ্গল উড়িয়ে তরিতরকারির আবাদ করে সোনা ফলায়। দক্ষিণ অঞ্চল থেকে ওরা এসে এখানে বাস করচে আজকাল সেইসব গাঁয়ে, যেখানে দশ বছর আগেও ছিল কাঁটাবন, ঝোপজঙ্গল। যা-হোক দু পয়সা রোজগারও করে, বিশেষ করে আজকাল যুদ্ধের দরুন তরিতরকারির যা দাম।

উদ্ধব বললে স্ত্রীকে—চিঁড়ে কতগুলো আনলি?

পাঁচুদাসী বেশ শক্ত-সমর্থ মেয়েমানুষ। একহারা, লম্বা, শ্যামলা, উনিশ-কুড়ি বয়েস, মুখের ভাবে বেশ একটা কাঁচা লাবণ্য মাখানো—অথচ একা সংসারের সব কাজ মুখ বুজে করে যাবে, চার-পাঁচটা হালের গোরুর ডাবায় জল তুলবে কুয়ো থেকে, বাইরের বড়ো গোয়াল পরিষ্কার করবে, দশ গণ্ডা বিচালির আঁটি কাটবে— তারপরে আবার রান্নাবাড়া করবে—স্বামীর মাঠের পান্তাভাত, গরমভাত, জনমজুরের ভাত—এসো-জন, বসো-জন, গেরস্থর সবই তো থাকে। রাতদুপুরে লোক-কুটুম্ব এলে পাকি আড়াই-সেরা কাঠার এক কাঠা ডবল-নাগরা চালের ভাত বড়ো তোলো হাঁড়িটায় চড়িয়ে দেয় একনিমেষে। দেখতে নরম-সরম হলেও লোহার মতো শক্ত হাত-পা।

পাঁচুদাসী একটা ছোটো থলে নৌকোর খোল থেকে টেনে বার করে হাতে আন্দাজ করে বললে—কাঠা দুই

—ওতেই হবে!

—আমি তো উপোস। শুধু তুমি আর মাঝি ছোঁড়া খাবে—

—তেঁতুল এনেছিস তো?

—হুঁ-উ-উ।

স্বামীর দিকে বঙ্কিমকটাক্ষে চেয়ে বলে—যত পারো—

তারপর আবার নৌকো চলল উলুটি বাড়োর কিনারায় কিনারায়, নদীর ঠাণ্ডা শ্যামল জলধারা যেখানে ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলেচে ভাটার টানে সাতভেয়েতলার বড়ো বটগাছের দিকে। উদ্ধব দাস তামাক খাবার জন্যে চকমকি ঠুকচে, মাঝিকে বলচে—ইদিকি এবার বাগুনের বীজপাতা দেওয়া হয়নি দেখচি—হ্যাঁরে, এ খেতটা কি জেড়ো কুমড়োর?

মাঝি বললে—জেড়ো কুমড়ো না-হলে কী অত বড়োডা হয়—দ্যাখচো না?

—চত্তির মাসের শেষ—এখনো খেতে শীতের কুমড়ো কাটেনি—কেমনধারা চাষা এরা?…তামুক খাবা?

মাঝি ছোঁড়া ঘাড় নেড়ে বললে—খাইনে।

—তোর দাদা মনিন্দর তো খায়।

—খায় না! বলে হুঁকো শোষে! দাদা খায় বলে কী আমাকেও খেতে হবে?

—না তাই বলছি।

—কী চর এডা? আর কদ্দূর?

—চর পোলতা। আর দু-খানা বাঁক।

—বাঁকের মুড়োয়, না-বাঁকের মাজায়?

—এক্কেবারে ও মুড়োয়—

—তাহলে এখনও দেড় ঘণ্টা দু-ঘণ্টা—

পাঁচুদাসী দেখতে দেখতে যাচ্ছে, বেশ ভালো লাগছে ওর। বাড়ি থেকে কত দিন একটু বেরুনো হয়নি, শুধুই গোয়াল পরিষ্কার, ক্ষার কাচা, বাসন মাজা, তোলো তোলো ধানসিদ্ধ, গোরুর ডাবায় জল তোলা…এ যেন মুক্ত দিনের লীলায়িত অবকাশ। দিনশেষের হলদে রোদে আকাশ কেমনতরো হয়ে উঠছে, নৌকোর গলুইয়ে চলমান নদীর ছলছল রাগিণীর ছন্দ বাজচে, গলালম্বা কী পাখি শ্যাওলার মধ্যে জেলেদের পাতা তেঁতুল ডালের হুড়ির ওপর বসে নৌকোর দিকে চেয়ে আছে, নলখাগড়ার বনের গত শীতকালের তিতপল্লার ফল শুকিয়ে শুকিয়ে ঝুলচে, ভুস ভুস করে শুশুক ডুবচে উঠচে জলে নৌকোর এপাশে-ওপাশে।

—হ্যাঁগো, ওগুলো কী, শুশুক না কচ্ছপ?

—শুশোক—

—আহা-হা, শুশোক বুঝি?—শুশুক তো বলে। বাঙাল কোথাকার!

পাঁচুদাসী নাগরিকতার আভিজাত্যে ঘাড় বেঁকিয়ে হাসির ঝিলিক দিয়ে স্বামীর দিকে চায়।

—নাও, নাও, ওই হল, শুশুকই হল—

—খিদে পেয়েছে?

—পাইনি? সে তুই বুঝচিসনে? তোকে বলতে হবে?

ঠিক ঠিক। পাঁচুদাসীর ভুল হয়ে গিয়েছে। ওর বড়ো খিদে, জোয়ান মরদ পুরুষ, ভূতের মতো খাটে দিন-রাত, মাটির সঙ্গে কাজকারবার। একটি কাঠা তার

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice