হিঙের কচুরি
আমাদের বাসা ছিল হরিবাবুর খোলার বাড়ির একটা ঘরে। অনেকগুলো পরিবার একসঙ্গে বাড়িটাতে বাস করত। এক ঘরে একজন চুড়িওয়ালা ও তার স্ত্রী বাস করত। চুড়িওয়ালার নাম ছিল কেশব। আমি তাকে ‘কেশবকাকা’ বলে ডাকতাম।
সকালে যখন কলে জল আসত, তখন সবাই মিলে ঘড়া কলসি টিন বালতি নিয়ে গিয়ে হাজির হত কলতলায় এবং ভাড়াটেদের মধ্যে ঝগড়া বকুনি শুরু হত জল ভরতির ব্যাপার নিয়ে।
বাবা বলতেন মাকে, এ বাসায় আর থাকা চলে না। ইতর লোকের মতো কাণ্ড এদের! এখান থেকে উঠে যাব শিগগির।
কিন্তু যাওয়া হত না কেন, তা আমি বলতে পারব না। এখন মনে হয় আমরা গরিব বলে, বাবার হাতে পয়সা ছিল না বলেই।
আমাদের বাসার সামনে পথের ওপারে একটা চালের আড়ত, তার পাশে একটা গুড়ের আড়ত, গুড়ের আড়তের সামনে রাস্তায় একটা কল। কলে অনেক লোক একসঙ্গে ঝগড়া চেঁচামেচি করে জল নেয়। মেয়েমানুষে মেয়েমানুষে মারামারি পর্যন্ত হতে দেখেছিলাম একদিন।
এইরকম করে কেটেছিল সে-বাসায় বছরখানেক, এক আষাঢ় থেকে আর এক আষাঢ় পর্যন্ত।
আষাঢ় মাসেই দেশের বাড়ি থেকে এসেছিলাম। দেশের বাড়িতে বাঁশবাগানের ধারে ধুতরো ফুলের ঝোপের পাশেই আমি আর কালী দুজনে মিলে একটা কুঁড়ে করেছিলাম। কালীর গায়ে জোর বেশি আমার চেয়ে, সে সকাল থেকে কত বোঝা আসশ্যাওড়ার ডাল আর পাতা যে বয়ে এনেছিল! কী চমৎকার কুঁড়ে করেছিলাম দুজনে মিলে, ঠিক যেন সত্যিকার বাড়ি একখানা। কালী তাই বলত। একটা ময়নাকাঁটা গাছের মোটা ডালে সে পাখির বাসা বেঁধে দিয়েছিল। ও বলত, শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তিতে কিংবা নষ্টচন্দ্রের রাতে রাতচরা কাঠঠোকরা কিংবা তিওড় পাখি ওখানে ডিম পেড়ে যাবে।
এসব সম্ভব হয়নি আমার দেখে আসা, কারণ আষাঢ় মাসেই গ্রাম থেকে চলে এসে কলকাতার এই খোলার বাড়িতে উঠেছি।
আমার কেবল মনে হয় দেশের সেই বাঁশবনের ধারের কুঁড়েখানার কথা, কালী আর আমি কত কষ্ট করে সে-খানা তৈরি করেছিলাম, ময়নাগাছের ডালে বাঁধা সেই পাখির বাসার কথা—নষ্টচন্দ্রের রাতে কাঠঠোকরা পাখি সেখানে ডিম পেড়েছিল কিনা কে জানে?
কলকাতার এ বাড়িতে জায়গা বড্ড কম, লোকের ভিড় বেশি। আমি সামনের টিনের বারান্দাতে সারা সকাল বসে বসে দেখি কলে পাড়ার লোক জল নিতে এসেছে, গুড়ের আড়তের সামনে গুড় নামাচ্ছে গোরুরগাড়ি থেকে, বাঁ-কোণের একটা দোতলা বাড়ির জানলা থেকে একটি বউ আমার মতো তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। এই গলি থেকে বার হয়ে বড়ো রাস্তার মোড়ে একটা হিন্দুস্থানি দোকানদারের ছাতুর দোকান থেকে আমি মাঝে মাঝে ছাতু কিনে আনি। বড়ো রাস্তায় অনেক গাড়িঘোড়া যায়। আমাদের গ্রামে কখনো একখানা ঘোড়ারগাড়ি দেখিনি, দু-চোখ ভরে চেয়ে চেয়ে দেখেও সাধ মেটে না, কিন্তু মা যখন-তখন বড়ো রাস্তায় যেতে দিতেন না, পাছে গাড়ি-ঘোড়া চাপা পড়ি।
আমাদের বাড়ি থেকে কিছু দূরে গলির ও-মোড়ে কতকগুলো সারবন্দি খোলার বাড়ি আমাদেরই মতো। সেখানে আমি মাঝে মাঝে বেড়াতে যাই। তাদের বাড়ি ঘর বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, কত কী জিনিসপত্র আছে,—আয়না, পুতুল, কাচের বাক্স, দেওয়ালে কেমনসব ছবি টাঙানো। এক-এক ঘরে এক-একজন মেয়েমানুষ থাকে। আমি তাদের সকলের ঘরে যাই, বিকেলের দিকে যাই, সকালেও মাঝে মাঝে যাই।
ওই বাড়িগুলোর মধ্যে একটি মেয়ে আছে, তার নাম কুসুম। সে আমাকে খুব ভালোবাসে, আমিও তাকে ভালোবাসি। কুসুমের ঘরেই আমি বেশিক্ষণ সময় থাকি। কুসুম আমার সঙ্গে গল্প করে, আমাদের দেশের কথা জিজ্ঞেস করে। তাদের বাড়ি বর্ধমান বলে কোনো জায়গা আছে সেখানে ছিল। এখন এই ঘরেই থাকে।
কুসুম বলে—তোমায় বড্ড ভালোবাসি, তুমি রোজ আসবে তো?
—আমিও ভালোবাসি৷ রোজ আসিই তো।
—তোমাদের দেশ কোথায়?
—আসসিংডি, যশোর জেলা।
—কলকাতায় আগে কখনো আসেনি বুঝি?
—না।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments