খুলনার দুর্ভাগা আধিয়ার চাষী
[সংযোজন]
বঙ্গোপসাগরের কোলে শুয়ে দোল খাচ্ছে খুলনা। খুলনা বুঝি তার আদরিণী কন্যা। দক্ষিণে তার প্রাচীর, সু-উচ্চ সুন্দরী বনের।
সেই খুলনার সংগ্রামী মানুষের ইতিহাস। আবার সে ইতিহাস হচ্ছে খুলনার কৃষকের সংগ্রামের ইতিহাস। সত্যই কি সংগ্রামী কৃষকের পূর্ণ ইতিহাস? না। সংগ্রামী কৃষকের পূর্ণ ইতিহাস লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি কতটুকু জানি যে লিখব? আমি শুধু ছিন্ন বিছিন্ন দুটি একটি পাতা তা কালের ঝোড়ো হাওয়ায় আমার জীবন ধারায় এসে মিশেছে, তা থেকেই কিছু বলতে পারি, তার বেশী নয়।
এরা সংগ্রাম করেছে প্রকৃতির বীভৎস সর্বনাশী শক্তির বিরুদ্ধে। সুন্দরী বনের বাঘে এদের খেয়েছে, সাপে কামড়ে মেরেছে। কর্ম ক্লান্ত মানুষ আর গরু ঘুমিয়ে ছিল উন্মুক্ত প্রান্তরে বা ভঙ্গুর চালা ঘরে শুকনা খড় বিচালী বিছিয়ে,-বিশ্রাম সংগ্রহ করছে আগামী দিনের কর্ম শক্তি। নিশুতি রাতের অন্ধকারে অতি সন্তর্পণে চুপি চুপি কুমীর এসে টেনে নিয়ে গেছে তাদের নদীর অথৈ জলের মধ্যে। রোগ, মহামারীতে মরেছে মশা মাছির মতো। কতো? তার হিসাব কে রেখেছে!
আর নোনা জল? যে রাক্ষুসী মুহূর্তে গ্রাস করে ফেলে কৃষকের রক্ত জল করা সারা বছরের সোনার ফসল? এ জলের আর এক নাম জীবন নয়, এর আর এক নাম বুঝি বা মৃত্যু। জলে জলাকার। জলের মধ্যে তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে গেলেও এক গণ্ডুষ জল তুমি পান করতে পারবে না,-করলে স্বয়ং মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে এসে দাঁড়াবেন তোমার জীবনের দরজায়। যদি মুখ-হাত ধোবার জন্য এক ঝাপটা জল চোখে মুখে দাও—সারা মুখ তোমার জ্বলে পুড়ে যাবে, চোখে নেমে আসবে অমানিশা। বাঁধ ভেঙ্গে সে যদি একবার কৃষকের জমিতে উঠতে পারে শুধু সে বারই যে সমস্ত ফসল গ্রাস করল তা নয়, আগামী দুই তিন বছরের জন্য সে জমি হলো বন্ধ্যা। অনেক বছর পরিশ্রম করে কৃষক তার চালা ঘরের জন্য তৈরী করেছে শক্ত মাটির ভিটা। তার কিনারে কিনারে সযত্নে লাগিয়েছে দুই একটি নারিকেল সুপারীর গাছ। নোনা জল এসেছে বাঁধ ভেংগে বিলে, সেখান থেকেই তার বিষাক্ত নিঃশ্বাসে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে ঐ নধর গাছগুলিকে। তার পর আসবে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, মৃত্যু।
কিন্তু সত্য সত্যই নোনা জলের এই প্রাদুর্ভাব একদিন খুলনায় ছিল না। সেদিন দুধ আর মধুর দেশ বলে পরিচিত ছিল খুলনার দক্ষিণ অঞ্চল। হরিৎ বর্ণের ধানে ভরে যেত সারা অঙ্গে। গোয়ালে ছিল চাষের আর দুধের গরু, ছিল হাঁস, মুরগী ঝাঁকে ঝাঁকে। নদী, খাল, বিলে ছিল প্রচুর মাছ। সারা বছরের মধ্যে তিন চার মাস জমির কাজ করে তারা বাকি কয় মাস কুটুম বাড়ী গিয়ে যাত্রা গান, কৃষ্ণ যাত্রা, জারী গান গেয়ে আর মাছ ধরে দিন কাটাত। মাঝে মাঝে হরি সংকীর্ত্তন, কবি গান বসাত গ্রামের মধ্যে। আবার কোনো কোনো সময় ধর্ম উপদেশ শুনবার জন্য আলেম ও ব্রাক্ষণ পণ্ডিতগণকেও ডেকে নিয়ে আসত গ্রামে। ছিল না খাদ্যের অভাব-অনটন, ছিল না দুঃখ অশান্তি। শান্তি আর সুখ ছিল বাঁধা। তার পরে একদিন আস্তে আস্তে হয়ে গেল এই পটের পরিবর্তন। সে অনেক দিন আগের কথা।
শিবশা ও পশর খুলনার প্রধান দুটি নদ ও নদী, তারা তাদের বিশালতা ও গভীরতা নিয়ে দক্ষিণ অঞ্চল ভেদ করে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। এদের শাখা প্রশাখা শিরা উপশিরার মতো ছড়িয়ে পড়েছে এই এলাকার অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। এই দুটি নদ ও নদী প্রতি বৎসর বর্ষাকালে দুই হাতে ঢেলে দিয়ে যেত জমির প্রাণশক্তি পলি মাটি। যত নদীর জল উঠবে ততই জমি হবে উর্বরা-ফসল হবে বেশী, আরো বেশী। এখানকার বেড়ি বাঁধের কথা কৃষকদের কল্পনাতেও স্থান পায় নাই সে সময়।
তার পরে, আস্তে আস্তে শিবশার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments