গোয়েবলসের পুনরাগমন
‘...পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ হলেন গণহত্যার নীরব দর্শক...।’
—প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদে, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১
কোনো পাকিস্তানী কোনো বাঙালির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে না, কিংবা কোনো বিদেশি তা' করতে গেলে তাকে অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন এরূপ উক্তি করেছিলেন। কেউ কী এই অপরিহার্য প্রশ্ন উত্থাপন করেছে অথবা আপনারা জানেন কী, এসব কী ঘটেছে? ১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের আগে ঐ ধরনের অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে। শুধু আমারই বলি কেন, এ ধরনের অভিজ্ঞতা পশ্চিম পাকিস্তানী আরো ক'জনেরও হয়েছে। এঁদের মধ্যে বেশ ক'জন উঁচুদরের রাজনীতিবিদ রয়েছেন, যাঁরা ২৫ মার্চের রাতে পূর্ব বাংলায় সামরিক বর্বরতম অত্যাচার সংঘটনের পর বিদেশে গিয়েছেন তাদের সকলকেই ঐ নারকীয় ঘটনার জন্য প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তাঁরা হয় নেতিবাচক কিংবা ইতিবাচক উত্তর দিয়ে থাকবেন। কিন্তু একে পুরোপুরি আপাত বিরোধী সত্য বলা চলে না। পাকিস্তানে এসব ঘটনা এভাবেই ঘটেছে। এ বিষয়ে প্রচারণার জন্য যে উদ্ভাবনী ও কল্পনাপ্রবণ ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে তার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ। এজন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে 'প্রোপাগান্ডা বিভাগ' বলা যেতে পারে।
এসব প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক বলা যায়, তার কারণ, ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের আগ পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় কী ঘটেছে সে সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব এলাকার নারকীয় ঘটনার কোনো কিছুই জানতে পারেনি।
২৫ মার্চ সামরিক কর্তৃপক্ষ সংবাদের ওপর কড়া সেন্সর জারি করেছিল। জুলাই মাসের শেষের দিকে যথারীতি সেন্সর তুলে নেওয়া হয়। এই সময়ে পূর্ব বাংলায় প্রকাশিত বাংলা পত্রপত্রিকাগুলোসহ পাকিস্তানের কোনো সংবাদপত্রই পূর্ব বাংলায় সামরিক বর্বরতার কোনো খবর তো দূরের কথা, ঘটনার সঙ্গে সামান্য সত্যতা আছে এমন খবরও প্রকাশ করেনি। সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশও ছিল ঐরূপ। ঘটনার প্রথম দু'মাসের শেষের দিকে সংবাদপত্রে যেসব খবর প্রকাশিত হতো, তা খুব সতর্কতার সঙ্গে কাটছাঁট করে সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক তথ্য অফিসাররা সেসবের ইস্তেহার তৈরি করে দিতেন। পত্রিকাগুলো পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনের পরে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার ওপর জোর দিয়েছিল। এবং প্রচার করতো যে, 'ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী' এবং সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী অভিযান চালাচ্ছেন। শেষোক্ত সংবাদগুলো সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি লাইন পড়লেও দেশে কী ঘটছে তার প্রকৃত চিত্রের কোনো বিন্দুমাত্র চিহ্ন খুঁজে পাওয়া ছিল অসম্ভব। সেসব সংবাদে ঢাকা ও চট্টগ্রামে নারকীয় সামরিক অভিযানে তখন পর্যন্ত পঞ্চাশ হাজার হত্যার লেশমাত্র উল্লেখ থাকতো না। কিংবা সংবাদ মাধ্যমে এই কথার উল্লেখ থাকতো না যে, শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের ঐ দুটি স্থানে কর্তৃত্ব বজায় রাখা ছাড়া প্রদেশের বাকি অংশ বাঙালিদের প্রতিরোধের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাকিস্তানিরা জানতো না যে, পাকিস্ত ান বিমান বাহিনী বাঙালি প্রতিরোধ সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে প্রত্যহ নিয়মিত বিমান হামলা চালাচ্ছে। কিংবা তারা একথাও জানতো না যে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী আনসার ও মুজাহিদের মত পূর্ব বাংলার যাবতীয় সামরিক ইউনিটে বিদ্রোহ করেছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে যারা শরণার্থী হয়ে গিয়েছে তারা তাদেরকে বাঙালিদের নৃশংসতার কাহিনী শুনিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে নারকীয় গণহত্যা চালাচ্ছে তার কোনো সংবাদই তারা দেয়নি। এমন কি সংবাদপত্রেও তারা দেয়নি। এমন কি সংবাদপত্রের ভালো জানাশুনা সাংবাদিক ছাড়া প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে বিশ্বস্ততার সঙ্গে কিছু বলাও হয়নি। আমাদেরকে উচ্চপদস্থ বেসামরিক কর্মকর্তা ও আন্তঃবাহিনী গণসংযোগ কর্মকর্তা শুধু কিছু ব্যবস্থা কতিপয় বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট দলের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে-এতটুকু বলা হয়েছে, এছাড়া বাস্তব ঘটনার কোনো সূত্রের আর কোনো তথ্য দেয়া হয়নি।
সুচতুরভাবে তৈরি ইস্তেহারগুলোতে জালিয়াতি করে সরকারি মালিকানাধীন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments