বাংলাদেশি সমাজে কলোনিয়ালিটির বহুমাত্রিক প্রভাব : শাসক শ্রেণি ও রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস মূলত রাজনৈতিক মুক্তির ইতিহাস। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা মাত্রই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না। প্রায় দুইশ বছরের লড়াই-সংগ্রাম আর আত্মদানের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে এবং ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হলেও ঔপনিবেশিকতার প্রভাব এখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। এই প্রভাব সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও চিন্তার গভীরে সক্রিয় রয়েছে—যা সমকালীন তাত্ত্বিক পরিভাষায় কলোনিয়ালিটি (Coloniality) বা ঔপনিবেশিকতা নামে পরিচিত। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কলোনিয়ালিটিকে বোঝা যায় একটি ঐতিহাসিক উৎপাদন সম্পর্ক, শ্রেণি শোষণ ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধারাবাহিক রূপ হিসেবে। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যক্ষ অবসান ঘটলেও তার উৎপাদন সম্পর্ক, জ্ঞান কাঠামো ও ক্ষমতার বিন্যাস নতুন রূপে টিকে থাকে। বাংলাদেশে এই কলোনিয়ালিটি মূলত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শ্রেণি আধিপত্যের মাধ্যমে পুনরুৎপাদিত হচ্ছে যার প্রভাব মূলত পাঁচটি মানদণ্ডে বিশ্লেষণযোগ্য।
১. জ্ঞানের কলোনিয়ালিটি: শিক্ষা, গবেষণা ও ভাষা
বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানের কলোনিয়ালিটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এখানে শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও ইউরোপীয় তত্ত্ব, ইতিহাস ও দর্শনকে ‘সার্বজনীন’ হিসেবে পড়ানো হয়, অথচ উপমহাদেশীয় বা বাঙালি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জ্ঞান, ইতিহাস ও সংগ্রাম প্রান্তিক থাকে বা উপেক্ষিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি বা দর্শনের পাঠ্যক্রমে মার্কস, ওয়েবার পড়ানো হলেও বাংলার কৃষক বিদ্রোহ, টঙ্ক-তেভাগা-নানকার আন্দোলন বা শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও নিজস্ব জ্ঞান উৎপাদন খুব সীমিতভাবে স্থান পায়। ইংরেজি ভাষাকে জ্ঞানের প্রধান বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, ফলে শ্রমজীবী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী জ্ঞান উৎপাদন থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। ইংরেজি জার্নালে প্রকাশ ছাড়া গবেষণাকে “আন্তর্জাতিক মানের” বলা হয় না, আবার বাংলা ভাষায় গবেষণা করলে একাডেমিক মর্যাদা কমে যায়।
মার্কসবাদী বিশ্লেষণে এটি হলো জ্ঞান উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর এক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ—যা সাংস্কৃতিক পুঁজির মাধ্যমে শ্রেণি আধিপত্যকে পুনরুৎপাদন করে। মার্কসের মতে, সব যুগের শাসক শ্রেণির চিন্তাই ‘শাসক চিন্তা’। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় জ্ঞানব্যবস্থা ছিল শাসক শ্রেণির হাতিয়ার। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে সেই জ্ঞান কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। মার্কসবাদী বিশ্লেষণে এটি হলো জ্ঞান উৎপাদনের উপায়এলিট শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। ফলে শ্রমজীবী মানুষ জ্ঞানভোক্তা হলেও জ্ঞান-উৎপাদক নয়।
২. ক্ষমতার কলোনিয়ালিটি: রাষ্ট্র, আমলাতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা
বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, আইন ও শাসন কাঠামো মূলত ব্রিটিশ আমলের উত্তরাধিকার। জেলা প্রশাসক, পুলিশ, ভূমি প্রশাসন—সবই ঔপনিবেশিক শাসনের কাঠামো ও আইন অনুযায়ী গঠিত এবং পরিচালিত। ভূমি অফিসে সাধারণ কৃষকের হয়রানি, শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের দমন-পীড়ন বা প্রশাসনের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার অভাব এখানে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। রাষ্ট্রযন্ত্র আজও এখানে জনগণের নয়, বরং এক ক্ষুদ্র এলিট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। এই শ্রেণিটি ঐতিহাসিকভাবে জমিদার, মধ্যস্বত্বভোগী, আমলাতান্ত্রিক লুটেরা ব্যবসায়ী ও ঔপনিবেশিক সুবিধাভোগীদের উত্তরসূরি। ফলে রাষ্ট্র একটি শ্রেণি আধিপত্যের যন্ত্র হিসেবে এখানে কাজ করছে—যা মার্কস ও এঙ্গেলস রাষ্ট্র বিষয়ে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বাংলাদেশে এখন বিদেশি শাসন না থাকলেও ঔপনিবেশিক ক্ষমতার কাঠামো দেশীয় শাসক শ্রেণির হাতে টিকে আছে। আনিবাল কুইহানো যে “কলোনিয়ালিটি অব পাওয়ার”-এর কথা বলেন, মার্কসবাদে তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শ্রেণিগত চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত। মার্কসবাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র হলো শাসক শ্রেণির স্বার্থরক্ষার যন্ত্র। ফলে কলোনিয়াল ক্ষমতার কাঠামো দেশিয় শাসক শ্রেণির হাতে নতুনভাবে বৈধতা পাচ্ছে। আর এই বৈধতার বলেই শাসক শ্রেণির আনুকূল্যে লুটেরা রাজনৈতিক, লুটেরা ব্যবসায়ী এবং লুটেরা সামরিক-বেসামরিক আমলাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র। যারা সবাই মিলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করছে, গণসংষ্কৃতি ও ঐতিয্য বিনষ্ট করছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করছে, অর্থনীতি দুর্বল করছে এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments