স্বাধীনতা আন্দোলন ও সাম্যবাদের কবি—কাজী নজরুল ইসলাম
যে কোনো মুক্তি আন্দোলন, গণ আন্দোলন বা শ্রেণী আন্দোলনের পেছনে তার অনুকূল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পটভূমি থাকলে তা উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। অবশ্য সকল ক্ষেত্রে যে তার অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে তা নয়। সময় সময় বর্হিজগতের আন্দোলনের তরঙ্গও তার উপরে এসে ঘা মারে। ফরাসী রাষ্ট্রবিপ্লব, ইতালী ও আয়ারল্যাণ্ডের মুক্তি আন্দোলন এবং সর্বশেষে রুশিয়ার সর্বহারা বিপ্লব, ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিলো।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে সর্বভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তার প্রাথমিক প্রেরণা লাভ করেছিলো, এ বিষয়ে কোনো মতদ্বৈধতা নেই। বাংলাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাথমিক অধ্যায়গুলিতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনুকূল ক্ষেত্র তৈরী হয়ে উঠেছিলো, একথা অবশ্যই বলা চলে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা থেকেই রবীন্দ্রনাথ, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ প্রমুখ বহু কবির, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতায় নতুন ঊষালগ্নে বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছিলো।[১]
দ্বিতীয় অধ্যায়ে এক নতুন ও অভিনব ভূমিকা নিয়ে দেখা দিলেন চারণ কবি মুকুন্দদাস। তিনি তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শ প্রচারের জন্য যে মাধ্যমটির সৃষ্টি করলেন তার নাম ‘মুকুন্দ দাশের যাত্রা’। প্রচলিত যাত্রাভিনয়ের মতই তা শিক্ষিত ও অশিক্ষিত নির্বিশেষে হাজার হাজার জনসাধারণের মনকে আকর্ষণ করতে পেরেছিলো। কিন্তু প্রচলিত যাত্রাভিনয় থেকে তাঁর প্রয়োগ পদ্ধতি ছিলো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এ তাঁর নিজস্ব আবিস্কার। মুকুন্দদাসের দল যে কোনো যাত্রাই অভিনয় করুন না কেন, মুকুন্দদাস নিজেই সেই অভিনয়ের কেন্দ্রীয় ভূমিকা গ্রহণ করতেন। তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠে উন্মাদনা সৃষ্টিকারী গান, মৃদু নৃত্যভঙ্গী এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শ সম্পর্কে দীর্ঘ একটানা বক্তৃতা, এদের সবকিছুই শ্রোতা বা দর্শকদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াতো।
তৃতীয় অধ্যায়টি বিশেষভাবে কবি নজরুল ইসলামের অধ্যায়। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্রে ধূমকেতুর মতই নেমে এসেছিলেন। তাঁর এই আর্বিভাবের জন্য কেউ যেন প্রস্তুত ছিলোনা। রবীন্দ্রনাথের মতোই তাঁর অসংখ্য গান, কবিতা ও গদ্যরচনা অজস্র ধারায় নেমে এসেছে। তাঁর নানা জাতীয় গানের মোট সংখ্যা তিন হাজার। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তিতে লিখিত রচনাগুলি এই প্রসঙ্গে আমাদের মূল আলোচ্য। তাঁর গানগুলি জনসাধারণের মধ্যে প্রচণ্ড আলোড়নের সৃষ্টি করে তুলেছিলো। রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে তারা তাঁর ক্ষিপ্র, তীক্ষè হাতিয়ার রূপে কাজ করে এসেছে। তাদের সেই ভূমিকা আজও অব্যাহত আছে।
বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান। মুসলমান সমাজে কাজী পরিবার অভিজাত পরিবার বলেই গণ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অথবা সৌভাগ্যবশত অভাব অনটনক্লিষ্ট এক দরিদ্র পরিবারে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়েই তাঁকে বড় হয়ে উঠতে হয়েছিলো। তা না হলে তাঁকে বালক বয়সেই ‘লেটোর’ দলে গান গাইতে অথবা আসানসোলের রুটির দোকানে ছোকরা মজুরের কাজ করতে যেতে হতো না।
বাস্তব জীবনের এইরূপ কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি শোষিত মেহনতি মানুষের ব্যথা-বেদনা ও লাঞ্ছনাকে গভীরভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন। আর এই অনুভূতির মধ্য দিয়েই তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা ও গানগুলি শতদলের মত বিকশিত হয়ে উঠেছিলো। এই গভীর আকর্ষণের ফলেই তিনি মধ্যবিত্ত সমাজের ঘনিষ্ট সংস্পর্শের মধ্যে থেকেও মাটির মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে পারেননি। যে কারণেই হোক তিনি স্কুলের দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র জীবন-যাপনের সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জ্ঞানের সীমা শিক্ষায়তনের সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিলোনা। হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের ধর্মমত ও ইতিহাস তিনি সমানভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ফার্সী ভাষার উপরেও তাঁর যথেষ্ট অধিকার ছিলো। তাঁর বহু কবিতার মধ্যে এর অজস্র দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে।
সৈনিক জীবনে কাজী নজরুল ইসলাম
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। এই যুদ্ধে সৈনিক হিসাবে যোগ দেয়ার জন্য বহু তরুণ বাঙালীর মনে গভীর আগ্রহের ভাব দেখা দিয়েছিলো। কিন্তু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments