মানুষের জন্ম
১৮৯২ সালের ঘটনা। দুর্ভিক্ষের বৎসর জায়গাটা হল সুহুম আর ওচেম্চিরির মাঝামাঝি, কোদার নদীর ধারে, সমুদ্রের এত কাছে যে পাহাড়ী ঝরণার স্বচ্ছ জলের আনন্দ-উচ্ছল কলধ্বনির ভিতরও সমুদ্রের বজ্রগম্ভীর কল্লোল স্পষ্ট শোনা যায়।
করৎকালের দিন। কোদরের সাদা ফেনাগুলিতে চক্চকে নুয়ে-পড়া হলদে চেরি-লরেলের পাতা দেখে মনে হয় চঞ্চল সরপুঁটির ঝাঁক খেলা করে বেড়াচ্ছে। আমি নদীতীরের একটি টিলার উপর বসেছিলাম এবং মনে মনে এই কথাই ভাবছিলাম যে, গাংচিল ও করমর্যান্ট’রাও সেই চেরিপাতাগুলিকে নিশ্চয়ই মাছ মনে করেছে, সেইজন্যেই তারা ডান দিকের গাছগুলোর পিছনে যেখানে সমুদ্রের কল্লোল শোনা যাচ্ছে সেখানে প্রাণপণে চেঁচামিচি করেছে।
মাথার উপর বাদামগাছের শাখা-প্রশাখাগুলিতে সোনালী রঙ ধরেছে; আমার পায়ের তলায় মানুষের কটা করতলের মত রাশিকৃত পাতা ছড়িয়ে আছে। নদীর ওপারে হর্ণবীম গাছের ডালপালাগুলি একেবারে নেড়া হয়ে পড়েছে। দেখে মনে হয় যে, ছেঁড়া জলের মত তার ডালপালাগুলো শূন্যে ঝুলে আছে। ল্লা আর হলদে রঙের পাহাড়ী কাঠঠোকরা যেন এই জলের ফাঁদে পড়ে তার কালো ঠোঁটের আঘাতে হর্ণবীমের বল্কল ভেদ করে অবিশ্রান্ত আঘাত করে চলেছে, আর সেই আঘাতে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কীটপতঙ্গগুলিকে ধরবার জন্যে চারিদিক থেকে ছোট ছোট পাখীরা—সুদূর উত্তরের অতিথি—এসে জমেছে।
বাঁ দিকে পাহাড়ের মাথায় জমেছে ধোঁয়াটে জলভরা মেঘ; তারই ছায়া পড়ছে সবুজ পাদদেশে, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি মরা বক্স গাছ; বুড়ো বীচ ও লীন্ডেন গাছগুলির কোটরে আছে সেই মৌচাকের মধু যার মাদকতা পুরাকালে একদিন শক্তিশালী রোমের পদাতিক বাহিনীকেও জয় করে মহান পম্পিউসের সৈন্যদের পতনের কারণ প্রায় হয়েছিলো। মৌমাছিরা এই মধু লরেল আর আজালিয়ার ফুল থেকে সংগ্রহ করে, আর হা—ঘরেরা সেই মধু কোটার থেকে বের করে গম থেকে তৈরি পাতলা লাভান রুটিতে মাখিয়ে খায়। আমিও বাদামতলায় পাথরের উপর বসে বসে ঠিক তাই করছিলাম। একটা ক্রুব্ধ মৌমাছি আমার গায়ে দারুণ হুল ফোটিয়েছে। আমি কেট্লিভরা মধুতে রুটি ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাচ্ছিলাম আর শরতের অলস সূর্যের লীলা তারিফ করছিলাম।
শরৎকালের ককেসাস পর্বত দেখে মনে হয় যেন মহা মহা ঋষিদের গড়া এক একটি মূল্যবান গির্জা—সে ঋষিরা আবার সর্বদা মহাপাপীও। বিবেকের তীক্ষè চক্ষু থেকে তাদের অতীত পাপ গোপন করবার জন্যে তারা প্রচুর সোনা-দানা, নীলকান্তমণি, পান্না দিয়ে মন্দির তৈরী করিয়েছে; পাহাড়ের গায়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে সমরখন্দ শেমাহার তুর্কীদের তৈরী সূক্ষ্ম রেশমের কাজ করার বহুমূল্য গালিচা। তারা সারা দুনিয়া লুটপাট করে সবকিছু এনেছে এইখাসে,সূর্যের কাছে, যেন তাকে বলে গেছে;
‘তোমার—তোমার লোক-জগৎ থেকে এনেছি—তোমারই জন্যেং!’
... দেখেছি দাড়িওয়ালা, পক্বকেশ দৈত্যেরা বড় বড় চোখে আনন্দ-চঞ্চল শিশুর প্রসন্নতা নিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসছে পৃথিবীর শোভাবর্ধন করবার জন্যে। তারা দুহাতে বিচিত্র বর্ণের হীরামুক্ত ছড়াচ্ছে, পাহাড়ের মাথায় পরিয়ে দিচ্ছে স্তরে স্তরে রূপোর পুরু আবরণ। ঢালু ঢিপিগুলিকে ঢেকে রেখেছে নানা বৃক্ষের জীবন্ত বসন। তাদের করস্পর্শে ধরিত্রীর এ অঞ্চল এক অলৌকিক সৌন্দর্য ধারণ করেছে।
এই পৃথিবীতে মানুষ হয়ে জন্মানো বড় মজার! কত আশ্চর্য জিনিস দেখতে পাওয়া যায়! সৌন্দর্যের শান্ত ভাবাবেশে মনে যে বেদনা জাগে, এ আনন্দ তারই সামিল!
একথা সত্যি যে, জীবনে দুঃখের মুহূর্তও থাকে: উষ্ণ বিদ্বেষে বুকের ভিতরটাহ জলে যায়, দুঃখ যেন বুকের রক্ত শুষে নেয়, কিন্তু সে দুঃখের দিনও কাটে। আবার, ওই সূর্যও মানুষের দিকে চেয়ে প্রায় দুঃখে ম্লান হয়ে যায়—মানুষের জন্যে সে এক কঠোর পরিশ্রম করছে, তবু—মানুষ কৃতকার্য হতে পারল না!...
অবশ্য, ভাললোক যে নেই, এমন নয়, কিন্তু তাদের আরো সংশোধন দরকার কিংবা, হয়তো আরো ভালো হয় যদি তাদের আবার গোড়া থেকে তৈরি করা যায়।
...আমার বাঁ দিকের ঝোপগুলোর উপর দেখা গেল, কয়েকটি কালোমাথা নড়াচড়া করছে! সমুদ্রের গর্জন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments