দ্বীপ

কালো গভীর চোখের তন্দ্রার মতো ম্লান কোমলতা দ্বীপের সবুজ রঙে নিবিড় হয়ে উঠেছে। এখন অপরাহ্ণ: সাগরের বুকে হাওয়া থেমে গেছে, নারকেলগাছের পাতাগুলো ঝুলে পড়েছে। সৈকতে যে-নীলজল ক্ষীণ হয়ে ভেঙে পড়ছে তার আওয়াজ নম্র হাওয়ার মতো, আর তার হালকা রঙে দূর হতে দেখা বনানীর অস্পষ্টতা। প্রশান্ত মহাসাগরের অতলতা ওপরে উঠে এসেছে, তাই দূরবিস্তৃত জলরাশি যেন বরফের মতো জমাট বেঁধে গেছে, কোথাও কোনো কম্পন নেই, কোনো শব্দও নেই।

এ-বিরাট বিচিত্র মহাসাগরের প্রান্তবর্তী জলে পা ছড়িয়ে বালুর ওপরে শুয়ে ক’টা নগ্নদেহী পুরুষ ও নারী হালকা নীল আকাশের পানে চেয়ে নিশ্চল হয়ে রয়েছে। তাদের দেহের রং ‘কারারা’ মর্মরের মতো শুভ্র; দেহগুলো বাইরের মাটির মতো নরম, ভেতরে পাথরের মতো কঠিন। এখন তাদের শুভ্র দেহগুলোতে লালচে আভা পড়েছে, তাদের নিস্তরঙ্গ চোখগুলো হালকা হলদে হয়ে উঠেছে, কনীনিকাগুলো ধূসর। তাদের চোখ বড়-বড়, গোল ও ‘লাগুনের’ মতো, বাইরে ঘুরে-ঘুরে স্রোত উত্তাল হয়ে উঠলেও সেগুলো স্তব্ধ নিথর; সে চোখের পদ্মগুলো যেন নারকেলগাছের পাতা, তেমনি ঘন, সরু ও দীর্ঘ, এবং তেমনি বাইরের হাওয়ায় দোলে, কাঁপে।

পশ্চিম দিগন্ত ছুঁয়ে লাল সূর্য, পূর্ব দিগন্ত ছুঁয়ে অতি অস্পষ্ট আলো। এরা উঠে পড়ল। দীর্ঘদেহী লোকটি পশ্চিম দিগন্তের পানে তাকাল বলে তার চোখের তারায় গাঢ় লাল সূর্য সূচ্যগ্রের মতো প্রতিফলিত হল; তার চোখের মধ্যে সূর্য প্রতিচ্ছায়া দেখল, দুজনার মধ্যে কথা হয়ে গেল, যে-কথার কোনো ভাব নেই। ক্ষীণাঙ্গী মেয়েটি পেছনে মাথা হেলিয়ে এলোচুল নাড়ল, আর সে-কালো চুলগুলো অন্ধকারের স্রোতের মতো কেঁপে উঠল ৷


ওর শান্ত চোখে এই চাঞ্চল্য তার জীবনে প্রথম, এবং এদের মধ্যেও প্রথম। ওরা কখনো ভয় পায় না, মেয়েটি ভয় পেলে; ওরা কখনো কাঁদে না, মেয়েটি কাঁদলে। ওর অন্তর আর ওদের অন্তরের মতো শূন্য রইল না, সে-শূন্যতায় তারার জন্ম হল। তার নতুন জন্মলাভ ঘটেছে: এতদিন তার দেহ ছিল, মন ছিল না।


তারপর পশ্চিমদিকে মুখ করে ওরা জলের প্রান্তে হাঁটু গেড়ে বসল, সূর্য থেকে তাদের বরাবর যে-রক্তিম পথ সৃষ্টি হয়েছে, সে পথ বেয়ে ওদের নিস্তরঙ্গ চোখের শূন্যদৃষ্টি চলে গেল সূর্যের কাছে, আর সূর্য তাদের কাছে পাঠিয়ে দিল বহ্নিহীন সংযত আগুনের রক্তিমতা। সূর্য তখন আধখানা ডুবল; তখন ওরাও উবু হয়ে মুখ ডুবালে সাগরের জ্বলে। সাগরের জল এগিয়ে এসে তাদের মুখ তাদের চুল ছুঁয়ে পিছিয়ে গিয়ে আবার পরক্ষণেই এগিয়ে আসছে সাগরের ভাষাহীন অতল স্পর্শ নিয়ে, মৃদুভাবে ছলছল করে উঠছে কানের কাছে, শিরশির করে ঘাড় বেয়ে পিঠ বেয়ে নেবে যাচ্ছে। কিছু তারা কইল না, কারণ তারা কথা কইতে জানে না, কোনো ভাবও তাদের অন্তরে জাগল না, কারণ তাদের অন্তরে কোনো ভাব নেই। তাদের অন্তর অসীম শূন্যের মতো শূন্য, এ-বিশাল অতল সাগরের মতো অচেতন। মর্মরের মতো সাদা সক্ৰিয় দেহ তাদের আছে, মন নেই।

মেয়েদের চোখ লাল হয়ে উঠল পুরুষদের ভ্রূ ঝুলে পড়ল। এবার তারা উঠে ফিরে দাঁড়াল পূর্ব দিগন্তের পানে, যে-দিগন্ত পেরিয়ে তখন অস্পষ্ট আঁধার পেছনে নিয়ে ঈষৎ লালচে বৃহৎ চাঁদ উঠেছে। ওদের চোখ আবছা হয়ে এল, ওদের নাকের নিচে ও ভ্রূর আর গলার তলায় কোমল ধূসর ছায়া জমে উঠল, দেহের রেখা অস্পষ্ট হয়ে এল। তাদের নিষ্কম্প চোখের তারা, সে-চোখের গভীরতা, আর সে-গভীরতায় পথ খুঁজছে চাঁদের অস্পষ্ট আলো, এবং সে-আলোয় পথ চিনতে পেরে তাদের দৃষ্টি তাদের অন্তরে গিয়ে পৌঁছছে, যে-অন্তর শূন্যের মতো শূন্য।

সাগরের বুকে চাঁদের রুপালি পথ ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, চাঁদ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, আর চারপাশের ধূসরতা ক্রমে ক্রমে হালকা হয়ে আসছে। কাছের গাছগুলোর পাতায় হঠাৎ অতি ক্ষীণ মর্মরধ্বনি

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

৯৯

এক মাস

৯৯

৩০

মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice