বাংলাদেশ: জাতির অবস্থা
ক. জাতি: একাত্মতা ও প্রতিবেশ
যে জাতির কথা আমরা বলছি তার জনসংখ্যা হচ্ছে আট কোটি। ঈশ্বরের কৃপায় ২০০০ খৃষ্টাব্দে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১৫ কোটিতে। মোট এলাকার পরিমাণ প্রায় ৫৫ হাজার বর্গমাইল এবং আমরা ধরে নিচ্ছি ২০০০ খৃষ্টাব্দেও তা ৫৫ হাজার বর্গ মাইলেই থাকবে। এটি হচ্ছে সম্ভবতঃ বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল ৫৫ হাজার বর্গমাইল। প্রক্রিয়াজাত, অর্ধ প্রক্রিয়াজাত বা অপ্রক্রিয়াজাত সব ধরণের উৎপাদনের পরিমাণ আমাদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে কম মাথাপিছু আয়ের দেশে পরিণত করে রেখেছে। এইসব অবধারিত সত্যের ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যর্থতাই বিভিন্ন মহল কর্তৃক এদেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি বা এ ধরণের জ্বালাময়ী ব্যাঙ্গোক্তি প্রয়োগের সুযোগ এনে দিয়েছে।
যে সব জাতি বর্তমানে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থায় আছে সেইসব জাতি সম্পর্কেও সব সময় এ ধরণের কট্টর সত্যের একটা তালিকা দেওয়া যায়। দেড়শ' বছর আগে জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের বর্তমানের অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে বর্ণিত হত। যে সব তথ্য আমরা বলেছি তা একক বা যৌথভাবে কোন বিশেষ অর্থবহ নয়, বরং তা একই সঙ্গে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে।' আমি এমন কোন সমাজকে জানি না যে উন্নতি করছে বা বর্তমান ভাষার কারুকার্যে "উন্নয়নশীল" তার উন্নয়ন প্রক্রিয়া তার জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া বা স্থির থাকার দ্বার। ব্যাহত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সমাজের পতনের প্রতিফলনই দেখা গেছে জনসংখ্যা কমে যাওয়া বা অনড় থাকার মধ্যে। অবশ্য কোন সমাজে, বিশেষ করে কোন বিচ্ছিন্ন সমাজে, খাদ্য উৎপাদন আর জনসংখ্যার মধ্যকার অনুপাতকে অবহেলা করা নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। কিন্তু একটি সমাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধি করা কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব কাজের চাইতে খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করা শ্রেয়। এক্ষেত্রে গত ১৫০ বছরে উন্নত পশ্চিম ইউরোপের খাদ্যতালিকা কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তা যে কেউ লক্ষ করে দেখতে পারেন। অবশ্য সন্দেহ নেই যে, ভ্রান্ত ও বিপথগামী নীতি নির্ধারণ কাঙ্ক্ষিত ভোগকে ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু যে বিষয়ে আমরা আসার চেষ্টা করছি তা হচ্ছে জাতির অবস্থা বর্ণনার তথ্য হিসেবে ব্যবহার করার পূর্বে আমাদের এ'সব অবধারিত কঠোর সত্যের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।
শুরুতে যে জাতির কথা আমরা বলছি তার ভিত্তি কতখানি দৃঢ়? প্রায় ৭৫ বছর আগে ব্রিটিশ-ভারতের বাঙলাভাষী জনগণ, বিশেষ করে তার বাঙ্ময় অংশটি, একটি অপরিবর্তনীয় সত্যকে পরিবর্তনের ব্রত নিয়েছিল এবং তা পরিবর্তনে অনেকাংশে সফল হয়েছিল। বাঙালাভাষী জনগণের এরপর চিরকাল একসঙ্গে এবং সুখে থাকার কথা ছিল। ৩৫ বছরের মধ্যে যদিও সংখ্যালঘু কিন্তু অধিকতর বাঙ্ময় অংশটি ভারতীয় জাতির বৃহত্তর পরিচয়ে নিজের অধিকার হারানোকেই ভবিষ্যৎ হিসাবে বেছে নিল। আমি জানি না আত্মপরিচয়-ত্যাগে তাঁরা কতখানি সফল হয়েছেন। অবশ্য একটা বৃহত্তর পরিচয়ে নিজেকে বিলিয়ে দেয়াতে গৌরববোধ করার একটা চেতনা এই উপমহাদেশে বরাবরই ছিল। কিন্তু বাঙলাভাষী, জনগোষ্ঠির বৃহত্তর অংশটি যদিও একা পথ চলতে গররাজী ছিল না, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে পাকিস্তানের নতুন জাতীয় রাষ্ট্রে নিজেকে মিশিয়ে দেয়ার পক্ষে রায় দিল, কেবল কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেই। তার এই বৈশিষ্ট্যসমূহই ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিল যার শেষ ফসল হচ্ছে জাতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
বিশ্বের সব উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সম্ভবতঃ সবচেয়ে বেশী সমগোত্রীয়। এমনকি উন্নত জাতিগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে এ রকম ভাগ্যবান জাতি বেশী নেই। আমার জাতির অবস্থার কথা বলতে আমি তার প্রধান এবং সামান্য সব আশীর্বাদগুলোর কথাই বলতে চাই। এই সমগোত্রীয়তা কোন সামান্য আশীর্বাদ নয়। সমগোত্রীয়তা যত গুরুত্বপূর্ণ, আমি বিশ্বাস করি, তার চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমরা সমগোত্রীয়তার এই সত্যকে কিভাবে ব্যবহার করি। এই বিষয়ে আমি পরে আবার ফিরে আসব। আমি যখন সমগোত্রীয়তার কথা বলছি তখন আমি.
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments